সঠিক সময়ে ধরা পড়লে অন্য ক্যানসারের চেয়ে কিডনি ক্যানসার সারার সম্ভাবনা অনেক বেশি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    গোটা পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার নতুন মানুষের কিডনি ক্যানসার ধরা পড়ে।  তবে সংখ্যাটি অন্যান্য সব ক্যানসারের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ।  সঠিক সময়ে ধরা পড়লে নিরাময়ের সম্ভাবনা অন্যান্য ক্যানসারের চেয়ে অনেক বেশি, বলছেন বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট ডাঃ অমিত ঘোষ।

    প্রশ্নঃ কিডনি ক্যানসারের কথা প্রায়ই শুনি।  এটা আসলে কতটা ভয়ঙ্কর?

    উত্তরঃ আগে বুঝতে হবে কিডনির কার্যকারিতা কী।  আসলে কিডনি হল শরীরের পরিশ্রুতি-যন্ত্র।  মনে রাখবেন, মানুষের শরীরে দুটি কিডনি থাকে।  এরা রক্তের বর্জ্য পদার্থ ও বাড়তি জলকে মূত্রের মাধ্যমে বের করে দেয়।  এদের আয়তন আমাদের হাতের মুঠোর মাপের।  তলপেটের পিছন দিকে মেরুদন্ডের দুপাশে এদের অবস্থান।  কিডনির অনেক কাজ।  তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কিডনি থেকে তৈরি হওয়া কিছু উপাদান মানুষের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও লোহিত রক্ত কোষ উৎপাদনে সাহায্য করে।

    প্রশ্নঃ তা হলে ক্যানসারের উৎপত্তি হয় কী করে?

    উত্তরঃ শরীরের গঠনগত একককে কোষ বলে।  কোষ থেকে কলা ও কলা থেকে বিভিন্ন অঙ্গের সৃষ্টি হয়।  ক্যানসারের সূত্রপাত কিন্তু এই কোষ থেকে।  সাধারণত শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশের প্রয়োজনে কোষ বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের সৃষ্টি হয়।  কোষের বয়স হলে তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয় এবং তখন নতুন কোষ সেই স্থান দখল করে।  মাঝে মধ্যে এই নিয়মিত চক্রের বিঘ্ন ঘটলে সমস্যা শুরু হয়।  সেই সময় শরীরের প্রয়োজন ছাড়াই নতুন নতুন কোষ উৎপাদিত হতে থাকে এবং সময় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বয়স্ক কোষের মৃত্যু হয় না।  ফলে বাড়তি কোষ শরীরে জমতে থাকে।  এই বাড়তি কোষগুলি একসঙ্গে হলেই টিউমার হয়।  সেটা আবার দু’ধরণের হয়।  বিনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট।  মনে রাখতে হবে বিনাইন টিউমার ক্যানসার নয়।  এতে মৃত্যুর ভয় নেই।  এদের শরীর থেকে সরিয়ে দিলে বা চিকিৎসা করলে সাধারণত এরা আর ফেরে না।  অন্যদিকে চরিত্র অনুসারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হল ক্যানসার এবং এরা সাংঘাতিক প্রকৃতির হয়, এমনকি জীবনহানি ঘটায়।  ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকে সরানো গেলেও এদের ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।  এই টিউমার কোষ শরীরের কলা ও অঙ্গকে আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে।  এছাড়া এরা ভেঙে গিয়ে রক্ত প্রবাহে মিশে যায় এবং পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

    প্রশ্নঃ কিডনি ক্যানসার কি ছোঁয়াচে?

    উত্তরঃ
    এই ক্যানসার শুধুমাত্র কিডনি কোষে হয়।  এটা একদমই ছোঁয়াচে নয়।

    প্রশ্নঃ এই ক্যানসার কাদের বেশি হয়? পুরুষ না মহিলাদের?

    উত্তরঃ পুরুষ বা মহিলা উভয়েরই হতে পারে।  মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।  বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।

    প্রশ্নঃ কেন হয় এই ক্যানসার?

    উত্তরঃ কেন হয়, তার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি।  গবেষকরা এটুকুই জেনেছেন যে, কিছু কিডনি কোষের ডি.এন.এ-তে মিউটেশন হলে এই রোগের সূত্রপাত ঘটে।  মিউটেশনের পরে কোষগুলি দ্রুত গতিতে বাড়ে ও ছড়িয়ে পড়ে।  এই টিউমার ছাড়িয়েও আরও অনেকটা অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

    প্রশ্নঃ এর কোনও উপসর্গ নেই?

    উত্তরঃ সংক্রমণ ও কিডনি স্টোনের কারণে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তক্ষরণ হয়।  আসলে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত দেখলেই সন্দেহের তির ক্যানসারের দিকে ঘোরানো হয়।  তবে একটা কথা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বেরোলেই তা যে কিডনি থেকে হচ্ছে – এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার অনেক সমস্যা আছে।  কারণ প্রস্রাবের সাথে এই রক্ত শরীরের অন্য কোনও জায়গা থেকেও আসতে পারে।  তবে এটা ঠিক, কিডনি ক্যানসারের রক্তক্ষরণের আলাদা রকমের বৈশিষ্ট্য আছে।  এখানে ক্ষরণ ডেলার আকারে বেরোয় এবং ডেলাগুলি মোটা দড়ি বা কেঁচোর আকারে বের হতে থাকে।  সম্ভবত কিডনি থেকে প্রস্রাব নালির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়েই রক্তের ডেলাগুলি ওই ধরণের আকৃতি পায়।  ডেলার রঙ সবসময় লাল নয়।  কালচে লালও হতে পারে।

    প্রশ্নঃ অন্য কোনও উপসর্গ আছে কি?

    উত্তরঃ অন্য উপসর্গ হল, পিঠে ঠিক পাঁজরের নীচের দিকে ব্যথা হয়।  এই ব্যথা সহজে যেতে চায় না।  অনেক সময় কিডনি ক্যানসার জ্বরের উপসর্গও নিয়ে আসে।  তলপেটে কিডনি অঞ্চল টুকুর মাংস উঁচু হয়ে ফুলে যায়।  রোগী হাত দিয়ে সেই ফুলে যাওয়াটা অনুভব করতে পারেন।  বহু ক্ষেত্রে কারণহীন জ্বরের অনুসন্ধানেও দেখা গেছে যে ওটা কিডনি ক্যানসার।  আবার অ্যানিমিয়াও এই রোগের উপসর্গ হতে পারে।  ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি এবং ব্যথাও এই রোগের উপসর্গ।  তবে মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলি হওয়ার মানেই ক্যানসার হওয়া নয়।  কারণ কোনও কারণে সংক্রমণ, সিস্ট বা অন্য কোনও সমস্যাতেও এরকম উপসর্গ হতে পারে।  এইসব উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত, যাতে সমস্যাটিকে শনাক্ত করা যায়।  সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিডনি ক্যানসারের উপসর্গে পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত, চল্লিশ শতাংশ ক্ষেত্রে তলপেটের ব্যথা, তিরিশ শতাংশ ক্ষেত্রে কিডনি অঞ্চলে উঁচু মাংসপিন্ড এবং পঁচিশ শতাংশ ক্ষেত্রে মেটাস্ট্যাটিক রোগ (রাতে ঘাম, জ্বর, ক্লান্তি, ওজন হ্রাস প্রভৃতি) দেখা যেতে পারে।


    প্রশ্নঃ সেই নির্ধারণ তবে হবে কী ভাবে
    ?

    উত্তরঃ এখনও অবধি কিডনি ক্যানসার একবারে নিশ্চিত বা শনাক্ত করার মতো কোনও পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়নি।  একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কিডনি ক্যানসার তলপেটের অন্য কোনও সমস্যার পরীক্ষা করতে গিয়ে, সি.টি. স্ক্যান বা আলট্রাসাউন্ড করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।

    প্রশ্নঃ তাহলে এটা কি বেশ ভয়ের ব্যাপার ?

    উত্তরঃ হ্যাঁ, তাই কোনও চিকিৎসক সন্দেহ করলে অনেকগুলি পরীক্ষা করিয়ে থাকেন।  যেমন –

    (১) ক্লিনিক্যাল ও ভৌত পরীক্ষা : এতে রক্তচাপ ও অন্যান্য কিছু পরীক্ষা করা হয়।

    (২) প্রস্রাব পরীক্ষা : রক্ত পরীক্ষা করে নির্গত রক্ত ও অন্যান্য অসুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়।

    (৩) রক্ত পরীক্ষা : কিডনির কার্যকারিতা বুঝতে রক্তের কয়েকটি সাধারণ পরীক্ষা করা হয়।  এই পরীক্ষায় রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মতো কয়েকটি উপাদানের মাত্রা দেখা হয়।  রক্তে উচ্চ মাত্রায় ক্রিয়েটিনিন অনেক সময় কিডনি খারাপ থাকার ইঙ্গিত দেয়।

    (৪) আলট্রাসোনোগ্রাফি : টিউমারের ব্যাপারে একবার সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে একটি আলট্রাসনোগ্রাফি করে দেখা হয়ে থাকে।  এই পরীক্ষায় শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়।  এতে টিউমারের ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়।

    (৫) সি.টি. স্ক্যান : টিউমারের ব্যাপারে একদম নিশ্চিন্ত হতে গেলে সি.টি. স্ক্যানের প্রয়োজন হয়।  এর থেকেই বোঝা যায়, রোগীর টিউমারটি কিডনির ভিতরে রয়েছে, নাকি বাইরে চলে গেছে।

    ওপরের পরীক্ষাগুলি এটুকুই প্রমাণ করতে সাহায্য করে যে, কিডনিতে আদৌ টিউমার আছে কিনা, বা থাকলে কোথায় ও কোনদিকে তা রয়েছে।  মনে রাখতে হবে যে, মানুষের কিডনির সংখ্যা দুটি।  সুতরাং টিউমার ঠিক কোন কিডনিতে রয়েছে প্রাথমিক প্রশ্ন সেটাই হতে পারে।

    প্রশ্নঃ টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট অর্থাৎ ক্যানসার ধর্মী কিনা, সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?

    উত্তরঃ জেনে রাখুন, খুব বিরল ক্ষেত্র ছাড়া কিডনির টিউমার বিনাইন ধর্মী হয় না।  অর্থাৎ কিডনি টিউমার সচরাচর ম্যালিগন্যান্ট প্রকৃতির হয়ে থাকে।

    প্রশ্নঃ কিডনি টিউমার কি অনেক ধরণের হয়?

    উত্তরঃ দু’ধরণের হয়।  অ্যাডিনোকার্সিনোমা ও ট্র্যানজিশনাল।  প্রথমটি হয় কিডনির মাংসল অংশে প্রস্রাব জমা হয়, সেই পেলভিস অঞ্চলে।  এই অঞ্চলটি মূত্রনালি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।  দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে কিছু বলার নেই।

    প্রশ্নঃ তবে এর চিকিৎসা কী?

    উত্তরঃ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে কিডনির ক্যানসারে বিশেষ করে অ্যাডিনোকার্সিনোমাতে রেডিওথেরাপি ঠিকমতো কাজ করে না।  কিছুদিন আগেও কেমোথেরাপিতে তেমন ভাবে সুফল পাওয়া যেত না।  তবে হাল আমলে সদ্য আবিষ্কৃত কিছু কেমোথেরাপিতে আজকাল মোটামুটি কাজ হচ্ছে।  টিউমার গলে যাচ্ছে।  এই রোগের ক্ষেত্রে সি.টি. স্ক্যানে পাওয়া ছবি ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক মূলত অস্ত্রোপচারের সুপারিশ করে থাকেন।  অস্ত্রোপচার করে পুরো কিডনি বাদ দিতে পারলে খুব ভাল ফল পাওয়া যায়।  অ্যাডিনোকার্সিনোমাতে পুরো কিডনি, ফ্যাট-আবরণ, ক্যাপসুল ও সমস্ত লিমফ্‌ নোড কেটে বাদ দেওয়া হয়।  এই অস্ত্রোপচারকে র‍্যাডিকাল নেফ্রোক্টমি বলা হয়।  এটি বেশ বড় অস্ত্রোপচার।

    প্রশ্নঃ কিডনি ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকিগুলি তবে কী কী?

    উত্তরঃ ঝুঁকির অনেকগুলি কারণ রয়েছে।  তারমধ্যে –

    (১) বেশি বয়স- বয়সের কারণে কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।  সাধারণত ৪০ পেরোলেই এর সম্ভাবনা বাড়তে থাকে।  মহিলাদের চেয়ে পুরুষেরই ঝুঁকি বেশি।

    (২) পরিবেশ- সমীক্ষায় দেখা গেছে শহর জীবন ও নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এই রোগ বেশি হয়।

    (৩) ধূমপান- অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি দ্বিগুনেরও বেশি।  যারা খৈনি বা তামাক জাতীয় নেশা করেন তাদেরও ঝুঁকি অনেক বেশি।
    (৪) খাদ্যাভাস- অনিয়মিত ও খারাপ খাদ্যাভাসের কারণে ঝুঁকি অনেক বেশি।

    (৫) বেশি ওজন- গড় ওজনের চেয়ে বেশি ওজন ঝুঁকি বাড়ায়।

    (৬) হাইপারটেনশন- উচ্চ রক্তচাপ কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

    তবে কেন তার কোনও সঠিক কারণ আজও জানা যায়নি।

    প্রশ্নঃ এই সমস্যা থেকে বাঁচতে সুরক্ষার কোনও পরামর্শ দেবেন?

    উত্তরঃ নিয়মিতভাবে ভিটামিন এ, সি এবং ই যুক্ত ফল ও শাকসব্জি বেশি করে খেলে এই রোগ থেকে অনেক বেশি সুরক্ষা পাওয়া যায়।

    সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিপ্লব কুমার ঘোষ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More