মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯

তাপসীর মূর্তির গা বেয়ে উঠেছে আগাছা, সিঙ্গুর আন্দোলনের মুখ ঢেকেছে জঙ্গলে

শোভন চক্রবর্তী

বারো বছর আগের কথা মনে পড়ে? হুগলি-সহ গোটা রাজ্যের পাড়ার মোড়ে মোড়ে একটা পোড়া দেহের ছবি। পাশে সেই কিশোরীর মুখ। লেখা- ‘ছিঃ বুদ্ধ ছিঃ।’ সিঙ্গুর। তাপসী মলিক।

কাট টু ২০১৯। যে তাপসী মালিকের ছবি ছিল বামেদের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মোক্ষম অস্ত্র, এখন সেই তাপসী মালিকের ছবিই বামেদের হাতিয়ার। সেই সিঙ্গুরেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারে আসার পরই সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়ায় তাপসী মালিকের মর্মর মূর্তি তৈরি করেছিল তৃণমূল। সেই মূর্তি ঢেকে গিয়েছে জঙ্গলে। কোনও রকমে মাথা তুলে আছে তাপসীর মূর্তি। আর গা বেয়ে উঠেছে আগাছা।

সিপিএমের ছাত্র-যুব সংগঠন এসএফআই-ডিওয়াইএফআই ‘নবান্ন চলো’র ডাক দিয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সিঙ্গুর থেকে শুরু হবে মিছিল। ১৩ তারিখ নবান্ন। দাবি, কাজ চাই, শিল্প চাই। বাম ছাত্র যুবদের কয়েকশো কর্মী গত তিনদিন ধরে সিঙ্গুরে রয়েছেন। বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তাঁরা গ্রামে গ্রামে প্রচার করছেন নবান্ন অভিযানের। সেই প্রচারেরই অন্যতম হাতিয়ার হয়েছে জঙ্গলে ঢাকা তাপসীর মূর্তির ছবি। সিংহেরবেড়ি, খাসেরবেড়ি, ডুবিরবেড়ি-সহ সিঙ্গুরের গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে তাঁরা বলছেন, এই দেখুন তৃণমূলের চরিত্র। এঁরা সিঙ্গুরকে ধোঁকা দিয়েছে। তাপসী মালিককেও ভুলতে বসেছে।

অনেক জল বয়ে গিয়েছে ঘুণির খাল দিয়ে। তাপসীর বাবা মনোরঞ্জন মালিকও তৃণমূলের প্রতি রুষ্ট। পঞ্চায়েত ভোটে জেলাপরিষদ আসনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন। আগাছায় ঢাকা মেয়ের মূর্তি নিয়ে মনোরঞ্জন বললেন, “আমার মেয়েকে নিয়ে শুধুই রাজনীতি হয়েছে। এখন.ওদের সব পাওয়া হয়ে গেছে, তাই ভুলে গেছে।”

সিঙ্গুর আন্দোলনের নেতা তথা হরিপালের তৃণমূলে বিধায়ক বেচারাম মান্না অবশ্য বলছেন, “বর্ষার সময় বলে একটু জঙ্গল হয়েছে। ও আমরা ঠিক পরিষ্কার করে নেব।” কিন্তু মনোরঞ্জন মালিক যে বলছেন, আপনারা শুধু ওঁর মেয়ের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন? বেচাবাবু তিন বার হ্যালো হ্যালো হ্যালো বলে বললেন, “আপনার কথা কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না।”

তৃণমূলের বিরুদ্ধে সিঙ্গুরের মানুষের যে ক্ষোভ রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে লোকসভা ভোটে। একচ্ছত্র ভোট ব্যাঙ্কে ধস নেমেছে। বিপুল ভোটে লিড পেয়েছে বিজেপি। আর বাম ছাত্র-যুবরা শোনাচ্ছেন অন্য অভিজ্ঞতার কথা। ডিওয়াইএফআই নেতা মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, “গ্রামে গ্রামে ঘুরছি। মানুষ বলছেন, কারখানাটা চলে গিয়ে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।”

তাপসী মালিকের মৃত্যুতে সিবিআই গ্রেফতার করেছিল সিপিএম নেতা সুহৃদ দত্তকে। অসুস্থ সুহৃদবাবু। তবু তাঁকে ইদানিং বিভিন্ন কর্মসূচিতে সিপিএম হাজির করছে। সুস্থ থাকলে নবান্ন অভিযানের সূচনা অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকবেন সিপিএমের প্রাক্তন জোনাল সম্পাদক। পর্যবেক্ষকদের মতে, যে সিঙ্গুরে বামেদের ওয়াটার লু হয়েছিল, সেখান থেকেই ভোট বিপর্যয়ের পর নতুন আন্দোলন শুরুর বার্তা দিতে চাইছে। যে অস্ত্রে একদিন বিদ্ধ হয়েছিল, সেই অস্ত্রকেই প্রয়োগ করতে চাইছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

Comments are closed.