মানুষের জীবন আর কত সস্তা হবে?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    বিরাট একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। তার প্রভাবে শহরের দিগন্তরেখা হয়ে উঠেছে ঝাপসা। প্রাণভয়ে দৌড়চ্ছে জনতা। মঙ্গলবার দিল্লির এমনই ছবি ভাসছে টিভির পর্দায়। রাজধানীর জাফরাবাদ, মৌজপুর, ভজনপুরা, চাঁদবাগ, গোকুলপুরী, কারাওয়াল নগর ইত্যাদি এলাকায় হানাহানি শুরু হয়েছিল রবিবার বিকালে। ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও থামেনি। খুব প্রত্যাশিতভাবে শুরু হয়েছে দোষারোপের পালা। শাসক ও বিরোধী, উভয়েই পরস্পরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। মঙ্গলবার দিল্লিতে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ভারতে এসে কী ধারণা নিয়ে ফিরবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

    সরকারপক্ষের দাবি, হাই প্রোফাইল অতিথি দিল্লিতে থাকাকালীন ইচ্ছা করে গোলমাল পাকিয়েছে বিরোধীরা। তারা ট্রাম্পকে বোঝাতে চায়, দেশে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা শোচনীয়। এমনকি রাজধানী শহরেও দিনেদুপুরে গুন্ডারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিজেপি নেতাদের এই কথাটি হয়তো মিথ্যা নয়। বিরোধীরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিতেই পারে। আবার এর বিপরীতটাও সত্যি হলে আশ্চর্যের কিছু নেই।

    রবিবারের গোলমালের জন্য অনেকে এক বিজেপি নেতার উস্কানিকে দায়ী করেছেন। তাঁর নাম কপিল মিশ্র। আগে আম আদমি পার্টিতে ছিলেন। এখন কট্টর বিজেপি হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, যতদিন ট্রাম্প ভারতে থাকবেন, ততদিন আমরা শান্তিভঙ্গ করব না। কিন্তু তার মধ্যে পুলিশকে জাফরাবাদের অবস্থান তুলে দিতে হবে। না হলে…।

    অনেকে বলছেন, এটা একটা কৌশল। বিজেপি নেতার কথা শুনে বিরোধীরা ভেবেছিল, যাক মঙ্গলবার অবধি নিশ্চিন্ত। আপাতত আর কিছু হবে না। প্রতিপক্ষের এই মনোভাবের সুযোগ নিয়ে আচমকা হামলা চালানোই গেরুয়া বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল। তারা হয়তো ভেবেছিল, মঙ্গলবার অবধি মিডিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। নিরাপত্তারক্ষীরাও সেদিকে ব্যস্ত থাকবেন। এই সুযোগে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের একচোট শিক্ষা দেওয়া যাবে।

    এই হিংসার জন্য যেই দায়ী হোক, তার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ফায়দা তোলা। সেজন্য মানুষের জীবন গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। ফলত, দিল্লিতে হতাহতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। জীবনহানি ঠেকাতে প্রশাসনের যতদূর তৎপরতা দরকার ছিল, তেমনটা চোখে পড়ছে না। সদ্য বিপুল সমর্থন নিয়ে ফেরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ভূমিকাও সদর্থক বলা যায় না। একথা ঠিক যে, তাঁর হাতে পুলিশ নেই। কিন্তু পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত তাঁকে শান্তিরক্ষায় এত তৎপর দেখা যায়নি যতটা মঙ্গলবার দেখা গিয়েছে।

    অনেকে এও বলছেন, আপ হয়তো চাইছে দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রের ব্যর্থতা প্রমাণ হোক। যাতে কেজরিওয়াল সরকার পুলিশি ব্যবস্থার অধিকার পায়।

    আসলে, মানুষের জীবন খুব সস্তা হয়ে গিয়েছে আমাদের দেশে। দাঙ্গা হোক না না হোক, এমনিতেই প্রতিদিন বহু লোক অপঘাতে মরে এই দেশে। স্রেফ পথ দুর্ঘটনাতেই প্রতি বছর মারা যায় এক লক্ষের বেশি। তার মধ্যে শিশুরাও আছে। একইসঙ্গে অনেক লোক মারা গেলে কিছুদিন একটু হইচই হয়। তারপর সব ঠান্ডা।

    বহু লোক প্রতি বছর দুষ্কৃতীদের হাতে মারা পড়ে। এদেশের শহরগুলিতে দূষণের হার অত্যধিক বেশি। তার ফলে অনেকে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। মারাও যায়। চিকিৎসার ভুলে, হাসপাতালের অবহেলায় বহু লোক মারা পড়ে। এর জন্য কারও কোনও শাস্তি হয় না। এমন দেশে যে মানুষ-মারা রাজনীতির আবির্ভাব হবে, তাতে আশ্চর্য কি?

    আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি কেউ এই রাজনীতির উর্ধ্বে নয়। একটাই আশা, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষের সুবুদ্ধির উদয় হয়। আমাদের দেশের জনসাধারণের মধ্যে নিশ্চয় একদিন সুস্থ বুদ্ধির উদয় হবে। তখন তারা এই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More