বুধবার, অক্টোবর ১৬

ফ্যাসিজ়ম নিপাত যাক! যাদবপুরের ডাকে বেনজির ভিড়ে ভাসল রাজপথ, ফিরল কলরবের স্মৃতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: যারা মিছিল ডেকেছিলেন, তাঁরাও বোধ হয় আন্দাজ করেননি, এই জায়গায় পৌঁছবে মিছিলটা। রাজপথ ভরানোর ইতিহাস তাঁদের নতুন নয়। তবু, মাত্র এক রাতের ব্যবধানে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ডাকে যে এভাবে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষকে পথে নামাবে মিছিলের আহ্বান, তা ভাবতে পারার কথা কী!

আর রাজনীতিকদের অনেকেই বলছেন, এখানেই বারবার জিতে যায় যাদবপুর। এভাবেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ছাত্রঐক্যের দীপ্তি।

গতকাল দুপুর থেকে শেষ সন্ধে পর্যন্ত ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’-এর প্রত্যক্ষ চেহারা দেখেছে যাদবপুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথম। বৃহস্পতিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির এবিভিপি উইং আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এলে, বিক্ষোভ-প্রতিবাদে সামিল হন ছাত্রছাত্রীরা। তখন থেকেই শুরু ঝামেলার।

অভিযোগ ওঠে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছে পড়ুয়ারা। তাঁর জামা ছিঁড়ে দিয়েছে,তাঁকে গালিগালাজ করেছে। পড়ুয়াদের পাল্টা অভিযোগ, তাঁদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ইচ্ছে করে অশান্তির আগুন লাগিয়েছেন বাবুল। বাবুলের রক্ষীরা পড়ুয়াদের গায়ে হাত তুললে তাঁরা সর্ব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেন, তার পরেই ধস্তাধস্তি, হাতাহাতিতে গড়ায় গোটা পরিস্থিতি।

তবে কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি, এর জেরে দাউদাউ আগুন জ্বলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের বাইরে, পুড়ে যাবে ছাত্রদের ব্যাগ, জুতো, সাইকেল! ভাঙচুর হয়ে যাবে ইউনিয়ন রুম। যাদবপুর চত্বর জুড়ে ঘুরে বেড়ানো লাঠি হাতে, হেলমেট মাথায় প্রশিক্ষিত সাদা পোশাকের বিজেপি ‘কর্মী’রা এলোপাথাড়ি মেরে হাসপাতালে পাঠাবে একাধিক ছাত্রকে!

ভেতরে তখন শুয়ে রয়েছেন বাবুল। উপাচার্যের সঙ্গে একচোট উত্তেজিত কথোপকথনের পরে ফোন করেছেন রাজ্যপালকে, আর্জি জানিয়েছেন তাঁকে নিয়ে যেতে। বাবুলকে ঘিরে তখন ‘যাদবপুরের গান’ গাইছে কয়েকশো ছাত্রছাত্রী। রাতের দিকে বাবুল বেরিয়ে যান, শান্ত হয় পরিস্থিতি।

কিন্তু শান্ত হলেও, এ আগ্রাসী আক্রমণের জের যে মিইয়ে যাবে না, তা বলাই বাহুল্য ছিল। বস্তুত, বরাবরই স্বতন্ত্র ও সংগঠিত ছাত্রঐক্যের ঘাঁটি বলে পরিচিত যাদবপুরে যে ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ এই মাত্রা নিতে পারে, তা ধারণার বাইরে ছিল সকলের। এ যেন এক বড়সড় ধাক্কা ছিল স্বাধীন ছাত্ররাজনীতির আখড়ায়।

তাই প্রত্যাশিত ভাবেই মিছিল ডাকে যাদবপুর। শুক্রবার বিকেলে জমায়েতের আহ্বান জানায় ফ্যাসিজ়মের বিরুদ্ধে। বিকেল থেকেই ভিড় বাড়তে শুরু করে। বাড়তে বাড়তে ভরে যায় রাজপথ। যাদবপুর থেকে গোলপার্ক– এমাথা ওমাথা দেখা যায় না। বিকেল ফুরিয়ে আসার মুখে, লালচে আকাশের নীচে, জনজোয়ারে ভেসে যায় রাস্তা। সুদৃশ্য, সুশ্রাব্য। হবে না-ই বা কেন, মিছিলে হাঁটছেন শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক। গান ধরেছেন, ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল।’ তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছে আরও বহু পড়ুয়া।

ছাত্র, ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা, প্রাক্তনীদের জমায়েত তখন উপচে পড়ছে পথ জুড়ে। জেলা থেকে এসে যোগ দিয়েছেন বহু প্রাক্তনী। এমনকী হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, মুম্বই থেকে সকালের ফ্লাইটে কলকাতা এসে বিকেলের মিছিলে হাঁটলেন কত প্রাক্তনী! যেমন বেলঘরিয়ার বাসিন্দা, দেবব্রত চক্রবর্তী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যাবয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি থেকে পাশ করে, বেঙ্গালুরুর একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত তিনি। তাঁর যাদবপুরের গায়ে হাত পড়েছে হিন্দুত্ববাদীদের, এ খবর কাল থেকেই অস্থির করেছিল তাঁকে। আজ মিছিলের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেননি। সকালের ফ্লাইটেই এসে গিয়েছেন শহরে। বিকেলে যোগ দিয়েছেন মিছিলে।

গড়ানে দিনের গায়ে সন্ধে নামে। মিছিল তখন ঢাকুরিয়া। আচমকা নিস্তব্ধ অত বড় জমায়েত। পাশেই আমরি হাসপাতাল। বহু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা চলছে সেখানে। জোরে আওয়াজ অসুবিধার, এ কথা বলে দিতে হয়নি কাউকে। নিজের চরিত্রেই যেন শব্দ মিলিয়ে গেল মিছিলের। তবে জ্বলে উঠল, প্রতিটি মানুষের হাতের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট। সে এক অনন্য দৃশ্য। নিঃশব্দ মিছিল আলো হাতে এগিয়ে চলেছে সামনে। যেন জ্বলজ্বল করছে ফ্যাসিজ়ম রুখে দেওয়ার বিশ্বাস। সন্ত্রাস প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার।

প্রাক্তনীদের মাথায় তখন ঘুরছিল, আজ থেকে পাঁচ বছর আগের ঠিক এই দিনটারই কথা। ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪। সে দিনও ঠিক এ ভাবেই পুলিশি নিগ্রহের প্রতিবাদে পথ ভাসিয়ে বৃষ্টি ভেজা শহর জুড়ে হেঁটেছিল যাদবপুরের ‘হোক কলরব’ মিছিল। শাসকের সন্ত্রাস গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঙ্কার উঠেছিল সে দিন। কে জানত, ঠিক পাঁচটা বছর পরেই, একই দিনে, ফের পথে নামতে হবে অন্য কোনও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে!

ইতিহাস ফিরে আসে। প্রয়োজনে আবার আসবে… মনে করিয়ে দেয় মিছিল।

Comments are closed.