মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

হাওয়ায় অসুখ বয়, ভিতরে ভিতরে ক্ষয়

  • 55
  •  
  •  
    55
    Shares

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনেছিল মানুষের জন্য।

কয়েকজনের সামন্ততান্ত্রিক মুঠোর মধ্যে বদ্ধ থাকা শিক্ষাকে সাম্রাজ্যবাদ তার পুঁজির প্রয়োজনে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঔপনিবেশিক শিক্ষার থেকেই যে কিছু মানুষ ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতার শিক্ষাকে আয়ত্ত করেছিল এবং ছড়িয়ে দিয়েছিল অগণিত মানুষের মধ্যে, তা আমরা আমাদের দেশেই দেখেছি। যার ফল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন।

ভারত প্রশাসনিক উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেলেও গোটা পৃথিবী এখন পুঁজির উপনিবেশ। আদর্শ পুঁজিবাদী সমাজের মডেল এক গোলাকার জেলখানার মতো যার মাঝখানে একটা আলোকস্তম্ভ। এই আলোকস্তম্ভের ওপরে একটা সার্চলাইট ঘুরবে। বন্দীরা জানবে না কখন সেই আলো কার ওপর এসে পড়বে। সেই আশঙ্কায় সমস্ত বন্দী জেলখানার আদর্শ আচরণ করবে। হাতে পায়ের শিকলের বদলে এখানে শিকল পরানো হল তার মগজে। সে নিজেই এবার সর্বক্ষণ নিজের ওপর নজরদারি চালায় এখানে। এই কারণেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তোলা প্রশ্নকে দুরভিসন্ধিমূলক বলেছিলাম আমরা।

পরীক্ষা ব্যাপারটা খেলার মতো। যেখানে আগে থেকে তৈরি করা কতগুলো নিয়ম কানুনের মধ্যে থেকে নিজের দক্ষতা দেখাতে হয় খেলোয়াড়কে। মনে রাখতে হবে, সেই নিয়মগুলো কিন্তু পরীক্ষা যারা নেন সেই নিয়ামকের উদ্দেশ্য অনুসারে তৈরি করা। নিয়ামকের লক্ষ্য যদি হয় আরও বেশি নম্বর পাওয়ানো তাহলে পরীক্ষার্থী নম্বর পান। নম্বর এমনিতে ভালো জিনিস, আর তা পরীক্ষকের পকেটে রেখে দেওয়ার জন্যও নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এই বিপুল নম্বর ওঠার লক্ষ্যটি ঠিক কী? কেন্দ্রীয় বোর্ডের সমতুল পরীক্ষায় এমন নম্বর ওঠে, এ ছাড়া এর আর ঠিক কী যুক্তি আছে এর পিছনে!

নম্বর কেন ওঠে আর কী করে ওঠানো হয়, এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে আমরা দেখব – জ্ঞান, বোধ, প্রয়োগ ও দক্ষতা প্রশ্নের এই চারটি ধরণের মধ্যে জ্ঞানমূলক অর্থাৎ তথ্যসর্বস্ব ও স্মৃতিনির্ভর প্রশ্নই বেশি থাকছে পরীক্ষায়। ফলত, ক্লাসে এবং চর্চায় থাকছে তার প্রাধান্য। এর সঙ্গে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে পাশমার্ক। বোধ, প্রয়োগ ও দক্ষতায় খামতি সত্ত্বেও তাই পাশের হার বাড়ছে। পাশের হার বাড়াও খারাপ নয়, কিন্তু আমি চৌত্রিশ সেন্টিমিটার লাফাতে পারি না বলে লক্ষ্যকেই নামিয়ে পঁচিশ সেন্টিমিটার করা কোনও কাজের কথা নয়। অবশ্যই স্বীকার্য যে এই ব্যবস্থায় যারা অত্যন্ত ভালো ফলাফল করছে তারা বাকি মানদণ্ডেও নিশ্চয়ই দক্ষ।

পড়ুন প্রথম পর্ব : ক্লাসঘরে প্যান-অপটিকন আর সিসিটিভি – একসঙ্গে চলে না যে

প্রত্যেকটি বিষয়ের পাঠ্যক্রমের নিজস্ব কিছু বিশেষ চাহিদা আছে। দৌড়ের বিজয়ীর ভালো সাঁতারু হয়ে ওঠার যোগ্যতা থাকতেই পারে, কিন্তু থাকবেই যে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই প্রবেশিকার মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া যে, হিউম্যানিটিজের বিষয়গুলিতে যেখানে বোধ, প্রয়োগ ও দক্ষতার বেশি প্রয়োজন সেই মাপকাঠি পূরণ হচ্ছে কিনা। স্মরণীয় এই একই পদ্ধতিতে কিন্তু মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে বিষয়ের বিশেষ চাহিদা যাচাই করে নেয় নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে। সংখ্যাতত্ত্বে নেয় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিঊট। আসলে যাদবপুর বিশেষ কিছু করছে না, যেটা প্রয়োজন সেটাই করছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করলে এবং বাস্তবিক পরিস্থিতি থাকলে তারাও এমন ব্যবস্থায় আসতে পারেন। তাতে সামগ্রিক ভাবে প্রতিটি বিভাগের উন্নতি হতে পারে। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ন্যূনতম মূল্যে আলাদা তারিখে পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে তা পরীক্ষার্থীদের সহায়ক হয়। কারণ লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য নিজের বিষয়ে মৌলিক ভাবে ভাবতে পারা আর সেই ভাবনাকে প্রকাশ করতে পারা।

উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষার পর, আমাদের দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রথম সারির বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী চলে যান ‘জব ওরিয়েন্টেড’ পড়াশোনার ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রই তাকে ঠেলে দেয় সেদিকে। ভালো করে লেখাপড়া করে কাজ চাওয়াটা তো অন্যায় বা অন্যায্য কোনও দাবি নয়। কারণ মৌলিক বিজ্ঞান এবং মানবিকীবিদ্যায় কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে না রাষ্ট্র। তাই পড়াশোনার ধাঁচাটাও হয়ে যায় কর্পোরেটের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে। কল্যাণকামী রাষ্ট্র কাঠামো যত হাত গুটিয়ে নেবে এর থেকে, যত বেশি উৎসাহিত করবে কর্পোরেট পুঁজিকে ততই আমাদের শিক্ষা সংকুচিত হবে বড়োলোকদের জন্য। খোলাবাজারের হাওয়া ধাওয়া করার পর থেকে এই প্রবণতা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। মৌলিক বিজ্ঞানও বর্তমানে এত বেশি দামি যন্ত্রপাতি সজ্জিত গবেষণাগার নির্ভর হয়ে উঠেছে যে সেখানে ব্যক্তিগত মেধায় খুব মৌলিক কিছু করার সুযোগ প্রায় নেই। ফলে একটা পূর্ব প্রকল্পিত বিষয়ের মধ্যে নিজেকে ‘ফিট’ করিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই গবেষকদের। এরই পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স যেভাবে বাড়ছে ভবিষ্যতের বিজ্ঞান গবেষণার বিরাট অংশের কাজ তার মাধ্যমেই হবে বলে মত এই বিষয়ের অগ্রণী মানুষজনের।

আমাদের দেশের সদা-পরিবর্তনশীল আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র সম্পর্কে তাই বার বার যে প্রশ্নগুলো উঠে আসছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে তার প্রায় সবটাই সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে আসছে এটা লক্ষণীয়। সেই ন্যায্য প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ উত্তর যখন রাষ্ট্র দিতে পারছে না তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নানা বদনামে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কখনও বলা হচ্ছে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর, কখনও বলা হচ্ছে কোনও কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাসের ছেলেমেয়েদের আখড়া এইসব বিশ্ববিদ্যালয়। কিংবা ওখানে কেবল আন্দোলন হয়। ঠিক, আন্দোলন হয়, রাজনৈতিক আন্দোলন। যে পাঠ্যক্রম তাদের নির্বিচারে মেনে নেওয়ার বদলে প্রশ্ন করতে শেখায় সেই পাঠ্যক্রমই তাদের আন্দোলন করতে শেখায়। রাজনীতি সর্বতোভাবে শিক্ষার্থীর শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, শিক্ষার্থীরও পূর্ণ অধিকার থাকে সেই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার। ছাত্রানং অধ্যায়নং তপঃ যদি হয়, তবে বিনা প্রশ্নে সেই অধ্যয়ন বিকশিত হয়ে তপস্যার স্তরে যায় কী করে!

হিটলার ক্ষমতায় এসে জার্মানিকে পবিত্র আর্যরাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে প্রথমে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করে আর স্কুল পাঠ্যকে প্রশ্নহীন আনুগত্যের ফ্যাসিস্ত শিক্ষায় ঢেলে সাজানো হয়। যাতে বর্তমান শ্রমিক কর্মচারীরা ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও প্রশ্ন করতে বা কোনও দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করতে না পারে। আর এটা কিছুদিন চালাতে পারলেই ভবিষ্যতে এমন কর্মীবাহিনি উঠে আসবে তারা ওই ফ্যাসিস্ত শিক্ষায় শিক্ষিত। রাষ্ট্রকে আর তাহলে কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না। এবার একটু গুগল করে জেনে নিন, রাজস্থানে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কী কী আছে। প্রশ্নহীন আনুগত্যের এক-একটি হিন্দু তালিবান তৈরি কি তাহলে রাষ্ট্রের লক্ষ্য?

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় যাতে যাদবপুরের মতো প্রশ্ন-সংকুল হয়ে উঠতে পারে তার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করা উচিত। কারণ দেশটাকে ভবিষ্যতে এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের ছাত্রছাত্রীদের হাতেই তুলে দিয়ে যেতে হবে আজকের রাজনীতিকদের। তা না করে তারা প্রশ্নকেই নিষিদ্ধ করতে চান অচলায়তনের মতো। উত্তরের জানলা খোলার মুরোদ তাদের নেই বলেই প্রশ্ন নিষেধ। তাই সব বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশ্নের আঙিনায় তুলে আনার বদলে তারা যাদবপুরকেই টেনে হিঁচড়ে নামাতে চান তোলাবাজির কলেজগুলোর সমতলে। কারণ যেখানে তাদের আধিপত্য প্রশ্নাতীত। নতুবা নিয়ে যেতে চান রাজনীতিহীনতার রাজনীতিতে। সেন্ট জেভিয়ার্স তার আদর্শ হয়ে ওঠে। কর্পোরেট মিডিয়া সেই রাজনীতির পক্ষে জনমত নির্মাণের জন্য ব্যয় করে নিযুত অর্থ।

শিক্ষা একটা বিরাট বাজার। আগামী দিনে ভারত হয়ে উঠতে চলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক স্কুল ছাত্রছাত্রীর দেশ। এবং তার পরে তা হয়ে উঠবে কলেজের ক্ষেত্রে। প্রচলিত সরকারি ব্যবস্থাকে ভাঙতে না পারলে তাকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। সেটাই কি তাহলে লক্ষ্য? তাই কি যাদবপুর আর জেএনইউর বিষয়ে লাগাতার জিহাদ ঘোষণা করেছে রাষ্ট্র, করেছে আমাদের রাজনীতি? টাটা-বিড়লা-গোয়েংকা-আম্বানি অনেক দিন ধরেই আস্তে আস্তে মানবিকীবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। কর্পোরেটের নিজস্ব স্বশাসন এবং কর্পোরেটের নিজস্ব গবেষণার ধাঁচা তৈরি করতে হচ্ছে, কারণ স্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন গবেষণার ক্ষেত্র যত বাড়ছে ততই রাষ্ট্র ও প্রাইভেট এডুকেশন সেক্টর ধাক্কা খাচ্ছে। গবেষণা ক্ষেত্রকে তাই বেনিয়াদের রক্তচক্ষুর নিচে থাকতে হবে। থাকতে হবে প্যান অপটিকনের আলোয়।

নয়তো আদৌ তৈরিই না হওয়া জিও ইনস্টিটিউট কী ভাবে “ইনস্টিটিউট অভ এমিনেন্স”-এর তকমা পায়? মনে রাখতে হবে এ কেবল রাষ্ট্রীয় তকমা নয়, সঙ্গে বাৎসরিক এক হাজার কোটি টাকার নিয়োগ। মনে রাখতে হবে, আমার আপনার করের টাকা নিয়োজিত হচ্ছে প্রাইভেট অন্ত্রেপ্রেনিয়রের জন্যে, যে পুঁজির ‘রিস্ক এন্ড লস’ রাষ্ট্রের কিন্তু মুনাফা ব্যক্তি মালিকের। ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের আদর্শ উদাহরণ এই সিদ্ধান্ত। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে অভাবী অথচ মেধাবীদের কথা যেই কর্পোরেট মিডিয়া চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলবে তারাই আবার চাইবে প্রশ্ন করতে শেখানোর প্রতিষ্ঠানগুলো উঠে যাক ব্যক্তি পুঁজির হাতে। সেখানে বিভিন্ন আর্থসামাজিক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা আসতে পারবে তো? প্রশ্ন করতে শিখবে তো?

অসুখের হাওয়া বইছে চারপাশে। অসুখের হাওয়ায় ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে আজকে আপনার আর আগামীকালের আপনার সন্তানের এই দেশটা।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

কণিষ্ক ভট্টাচার্য। শিক্ষক ও সাহিত্যকর্মী।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু সরকার 

Leave A Reply