মঙ্গলবার, জুন ২৫

জেলে হাজির মদ-মোবাইল, রাশ টানতে বদলাবে আইন

সমীর মণ্ডল: ড্রাগ-মদের আন্দাজ ছিল। মোবাইলও ইদানীং বারবারই ধরা পড়েছে বন্দিদের কাছে। কিন্তু তাই বলে জাপানি তেল! এমনটা কখনও দেখেননি কারা কর্তারা। কিন্তু জেলেরই ডাক্তারবাবুর ব্যাগ থেকে যখন মদ-গাঁজা-হেরোইন-মোবাইলের সঙ্গে হাফ লিটার জাপানি তেলও পাওয়া গেল, তখন রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ তাঁদের!

জেলের অন্ধকারে ব্যবসার রমরমা। প্রথম পর্বের পরে।

জেলের ভিতরে মাদক ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করার রীতিমতো ‘টিম’ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন জেলের অন্দরের কর্মীরা।  তদের কয়েক জনের নামের তালিকাও মিলেছে। তালিকায় রয়েছেন

১) শেখ সিকান্দার (একবালপুর জোড়ামার্ডার কেসের আসামি)
২) মুকুল (বাংলাদেশের যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি)
৩) জগা
৪) শেখ সাজিত
৫) ভোলা
৬) প্রতাপ
৭) রাজু
৮) রাজা
৯) কালো বাচ্চা
১০) নেপো (যাবজ্জীবন আসামি)
১১) বাপি
১২) ফর্সা বাবাই
১৩) গব্বর (ফোন মারফৎ বিভিন্ন মহলে হুমকি দেওয়ার কাজ করে সে।)

যে সব যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা লেবারের এবং  জেলের ভিতরের গেটের সামনে কাজ করে, তাদের  হাত  দিয়েও বহু সামগ্রী পাচার হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য,

১) স্বপন কাহারা
২) বিজয়
৩) চুন্নু

যে সব কয়েদিরা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, যাঁদের তল্লাশিও করা হয় না, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই ব্যক্তি হলেন গোপাল তিওয়ারি এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরাবুল।

তবে জেল-ব্যবসার এই বড় জাল যে শুধু আলিপুরেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। এক শ্রেণির জেলকর্মীদের যোগসাজশে রাজ্যের অধিকাংশ সংশোধনাগারেই এই সমান্তরাল অপরাধ জগতের রমরমা। সিসিটিভি বা দেহ তল্লাশি করেও কোনও লাভ হয় না, এতই তাঁদের দক্ষতা। কারাকর্মীদের একাংশের বক্তব্য, কখনও টাকার লোভে কখনও বা উপরতলার ভয়ে, তাঁরা এই কাজ করেন। অভিযোগ, এই চক্রের শিকড় অনেক গভীরে, নিচু তলার কর্মীদের হয়তো সবটা জানা সম্ভব নয়।

আলিপুর সংশোধনাগারে নিরাপত্তায় এমনিতেই বড়সড় গলদ রয়েছে বলে একাধিক বার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক মাস আগেই জেলের ছয় এবং সাত নম্বর ওয়াচ টাওয়ার অরক্ষিত অবস্থায় খোলা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। ওই দুই টাওয়ারের এক দিকে কালীঘাটের হনুমান মন্দির, যার পাশেই আদি গঙ্গা। রোজ বহু মানুষের যাতায়াত। জিনিস পাচার বা পালানো, কোনওটাই অসম্ভব নয়।

সাত নম্বর ওয়াচ টাওয়ারে থাকার কথা দু’জন নিরাপত্তা রক্ষীর, কিন্তু বাস্তবে ছবিটা অন্য রকম ছিল। অভিযোগ, এক নিরাপত্তা রক্ষী নিশ্চিন্তে দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন, আর অন্য জন ছিলেনই না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা ছিল তাঁদের সার্ভিস এসএলআর। রাইফেল ফেলে রেখে, দায়িত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক জন ঘুমে আচ্ছন্ন অন্য জন কোথাও গায়ে উধাও। ছ’নম্বর টাওয়ার দিয়েই জানুয়ারি মাসে দুই বন্দি পালায়। সাত নম্বর টাওয়ার দিয়েও দু’বছর আগে তিন বন্দি পালিয়েছিল।

এই বিষয় কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান, “এটা গর্হিত অন্যায় কাজ। আমি সুপিরিয়রকে নির্দেশ দিচ্ছি পুরো বিষয়টা তদন্ত করে দেখার জন্য।” এই বিষয় নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি ডি.জি কারা ও জেল সুপার। এমনকী আলিপুর জেলের সাতটি ওয়াচ টাওয়ারের মধ্যে তিনটি এখনও অরক্ষিত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এই গাফিলতির দায় কার।

উল্লেখ্য, সংশোধনাগারে নিরাপত্তায় জ্যামার ও সিসিটিভি রয়েছে। দেহ তল্লাশিও হয় নিয়মিত। তবু বন্দিদের মোবাইলের ব্যবহার কমছে না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এই অভিযোগ আরও প্রকট করেছে।

আরও পড়ুন: জাপানি তেল থেকে বিলিতি মদ, জেনে নিন জেলের রেট

দমদম জেল থেকে এক ব্যাবসায়ীর কাছে তোলা চেয়ে হুমকির অভিযোগ ওঠে জেলবন্দি এক দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ কাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত রুমান খান জেলে বসেই ফেসবুকে ছবি আপলোড করেছিল বলে জানা যায়।

বস্তুত, কারা আইনে এত দিন এ বিষয়ে আইনানুগ কোন শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না। বলা ছিল না, জেলে মোবাইল বা সিমের ব্যাবহার নিষিদ্ধ। এই ‘নিষিদ্ধ’ শব্দের উল্লেখ না থাকারই সদ্ব্যবহার করেছে আসামি ও পাচারকারীরা। বর্তমান আইন সংশোধনে তৎপর হয়েছে কারা দফতর। ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত সংশোধনী পাঠানো হয়েছে নবান্নে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মোবাইল ও সিমের ব্বহার নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ রয়েছে, রয়েছে শাস্তির বিধানও।

দেখে নেওয়া যাক প্রস্তাবিত সংশোধনীর তালিকা:

১) জেলে মোবাইল ব্যাবহার করলে ন্যূনতম জেল তিন বছর, সর্বোচ্চ পাঁচ বছর।
২) ন্যূনতম আর্থিক জরিমানা ৩০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার।
৩) বন্দিকে যে মোবাইল জোগান দেবে, তারও শাস্তি হবে।

রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রের আইনে ইতিমধ্যেই জেলে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। দেরিতে হলেও এবার সেই পথেই হাঁটতে চলেছে এই রাজ্য। প্রস্তাবিত সংশোধনী দ্রুত বিধানসভার অধিবেশনে পেশ করে আইনে পরিণত করা হবে। (শেষ)

Leave A Reply