বুধবার, মার্চ ২০

জেনে নিন ধাপে ধাপে সিগারেট ছাড়ার পদ্ধতি, বেশি দেরি হওয়ার আগেই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আপনি সিগারেট রোজই ছাড়ার সংকল্প করছেন, কিন্তু পারছেন না। বহুবিধ সতর্কীকরণ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন সর্বত্র হামেশাই চোখে পড়ছে। ভয় পেয়ে রোজ  মন তৈরি করেও পিছিয়ে আসছেন। সিগারেট ছাড়ার বিষয়ে কোটি কোটি লেখা হয়েছে। ধরেই নিন  এই লেখাটি একটি অতিরিক্ত সংযোজন। তবুও লেখাটি পড়ুন। একটা কথা মাথায় আনুন। রোজই, প্রচুর মানুষ কিন্তু পাকাপাকি ভাবে সিগারেট ছেড়ে দিচ্ছেন। হয়তো আপনিই তাদের একজন হতে যাচ্ছেন।

নিকোটিন হিট মানে সিগারেট বা বিড়িতে সুখটান। একজন গড়পড়তা ধূমপায়ী দিনে প্রায় ২০০টি নিকোটিন হিট  নেন। মানে বছরে ৭৩,০০০ নিকোটিন হিট। একটা সিগারেটে ১০টা টান মানে দিনে ২০টা সিগারেটে ২০০ টান। আপনার মস্তিষ্ক অপেক্ষা করে পরবর্তী হিটের জন্য। বিভিন্ন গবেষণা জানাচ্ছে, নিকোটিনের নেশা কোকেনের মতই মারাত্মক। কিন্তু এটা কোকেনের চেয়ে সহজে ছাড়া যায়।

 

নিকোটিন ছাড়লে যে সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় 

১-২ দিন:-ঘুম ঘুম ভাব

১ সপ্তাহ:– ঘুমের ব্যাঘাত,গলা শুকিয়ে যাওয়া, শুকনো কাশি, কফ

২-৪ সপ্তাহ:– দুশ্চিন্তা, অসহিষ্ণুতা,মেজাজ খারাপ, মনোনিবেশে বাধা, মাথা ব্যথা, দুর্বল বোধ, ঘন ঘন ক্ষুধা পাওয়া, পেটে গ্যাস ও কোষ্ঠকাঠিন্য।

এই সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রেই যে দেখা দেবে এমন নয়। অনেক সময়  এক বা একাধিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে কোন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।

 

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?  

সিগারেট আমাদের মস্তিষ্কে নিকোটিন গ্রাহকের (nicotine receptors) সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। যখন আপনি ধূমপান বন্ধ করবেন, নিকোটিন গ্রাহকগুলি অনবরত নিকোটিনের জন্য হাহাকার করবে। তারা যখন নিকোটিন পাবে না, নানা রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সাহায্য নিকোটিন না পাওয়ার কষ্টটা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে।

 

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কতদিন স্থায়ী হবে?

সিগারেট ছাড়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আপনার শরীরে থাকা নিকোটিন শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি থেকে আপনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন মাত্র প্রথম ২-৩ দিন। এবং ১-৩ মাসের মধ্যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি চলে যাবে। কারণ  ১-৩ মাসের মধ্যে মস্তিষ্কে সিগারেটের কারণে হওয়া রাসায়নিক পরিবর্তনগুলি আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সব শেষে যে দুটি লক্ষণ আপনাকে ভোগাবে, সেগুলি হলো খিটখিটে মেজাজ আর দুর্বল ভাব। তবে সিগারেট ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশিরভাগ মানুষ শারীরিক দিক থেকে ভাল বোধ করতে থাকেন।

 

ধাপে ধাপে সিগারেট ছাড়ুন

কঠোর ভাবে সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন

সিগারেট ছাড়া খুব কষ্টকর। কিন্তু নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ জয় করতে হবে। মাথায় রাখবেন এই পৃথিবীতে রোজ লক্ষ লক্ষ মানুষ পাকাপাকি হাবে সিগারেট ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই ঠিক করুন এবার ছাড়বেনই। বলবেন আগেও চেষ্টা করেছি, হতে পারে আপনার ছাড়ার পদ্ধতি সঠিক ছিল না।

 

নিজের প্রতিজ্ঞা রাখার জন্য একটি দিন ধার্য করুন

এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে আপনার জীবনে। কারণ এই দিনে আপনার অবচেতন মনে ঘুরপাক খেতে খেতে আপনার মনকে তৈরি করবে। পরের মাসের একটি দিন ঠিক করুন। যে কোনও একটি দিন। এমন দিন বাছবেন না, যে দিনে আপনি খুব ব্যস্ত থাকবেন, চাপে থাকবেন, দুশ্চিন্তায় থাকবেন। কারণ সেদিন আপনার মস্তিষ্ক ধূমপান করতে চাইবে। এমন জায়গায় লিখে রাখুন ছাড়ার দিনটি, যাতে রোজ  চোখে পড়ে। যদি আপনি সিগারেট ছাড়ার ওষুধ খেতে চান আপনাকে এই সময় থেকে শুরু করতে হবে।

 

সবাইকে জানান কবে আপনি সিগারেট ছাড়ছেন

হ্যাঁ, ঢাক ঢোল পিটিয়ে ধূমপান ছাড়ুন। দেখবেন কয়েকশো জোড়া চোখ আপনার সুহৃদ হয়ে আপনার উপর নজর রাখছে। আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিছু কাছের মানুষকে আপনার প্ল্যান বলে রাখুন। অনেকে যেমন আপনার ভালো চান, অনেকে আবার মজা করে আপনার এই প্ল্যান বানচাল করার চেষ্টা করবেন। আপনার দিকে সিগারেট এগিয়ে  দিতে পারে এমন বন্ধুকে কয়েক মাসের জন্য এড়িয়ে যাবেন।

 

এসে গেছে সেই দিন

ঘুম থেকে উঠেই আপনার প্রিয় মানুষটিকে বলুন সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। সবাইকে ফোনে, মেসেজে, মুখে জানিয়ে দিন।

 

ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত জিনিসগুলি ফেলে দিন

কিছু কিছু জিনিস আপনার সিগারেটের নেশা মনে করিয়ে দেয়। সেগুলি হলো— লাইটার, দেশলাই, পাইপ, সিগারেট হোল্ডার, অ্যাশ ট্রে। সব গুলিকে চোখের সামনে থেকে পত্রপাঠ বিদায় করুন। ভুলেও কাছে রাখবেন না। বাড়িতে, গাড়িতে, অফিসেও না। একদম ডাস্টবিনে ফেলুন কাওকে দেখিয়ে।

 

আপনার স্টকে থাকা সব সিগারেট ফেলে দিন

ধূমপান মুখের নেশা। আপনি সিগারেট ছাড়লে মস্তিষ্ক কিন্তু স্নায়ুর মাধ্যমে মুখে ধূমপানের আকুলতা জাগাবে। সুতরাং সিগারেট ছাড়ার প্ল্যান হিসেবে আপনাকে এই সময় মুখে নেশার ঝোঁক চাপলেই  চিউয়িংগাম, মৌরি, জোয়ান, লবঙ্গ দিতে হবে। যদি আপনি নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট ড্রাগ বা ধূমপান ছাড়ার ড্রাগ নিতে চান, এই সময় ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। জেনে নিন সেগুলি কী করে ব্যবহার করবেন।

 

সিগারেট ছাড়ার পথের কাঁটাগুলিকে চিনুন আর বিদায় করুন

ধূমপান কেবল মাত্র শারীরিক নেশা নয়, এটি একটি মানসিক নেশাও। এবার বলুন তো, কেন আপনি ধূমপান করতেন? কর্মক্লান্ত দিনের অবসাদ কাটাতে? অবসরে নিজের চিন্তায় ডুবে থাকার আনুষঙ্গ হিসেবে? না, আসলে আপনি ধূমপান করতেন আয়েস করতে বা নিজেকে খুশি করতে। আপনি নিজেও জানেন কোন কোন বিশেষ মুহূর্ত আপনার ধূমপানের নেশাকে উস্কে দেয়। প্রথমেই সেগুলিকে চিহ্নিত করে বিদায় করুন।

 

  • চা বা কফির পরেঃ আপনি যদি সকালে কফির পরেই সিগারেট খান, এমন জায়গায় চা বা কফি খান যেখানে আপনি সিগারেট খেতে পারবেন না। হতে পারে শিশু, মা,বাবা, গুরুজনদের সামনে, অফিসের টেবলে।
  • গাড়ি চালানোর সময়ঃ– গাড়ি চালাবার সময় সিগারেট খান? চেনা রুটের অটো-পাইলট না হয়ে অন্য রুট দিয়ে যান। আপনার মন নতুন রাস্তা চিনতে ব্যস্ত থাকবে, সিগারেটের কথা মাথায় থাকবে না।
  • ভারী খাবারের পরঃ– দুপুর ও রাতে খাওয়ার পর আয়েস করে সিগারেট ধরান? খাওয়ার পরে দাঁত মাজুন,মুখে লবঙ্গ বা জোয়ান দিন।
  • ফোনে কথা বলার সময়ঃ– ফোনে কথা বলার সময় স্ট্রেস-বল হাতে রাখুন বা হাতে পেন বা পেন্সিল রাখুন। সোজা কথায় অন্য হাতটিকে ব্যস্ত রাখুন।
  • দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায়ঃ– আপনার প্রিয় মানুষ বা বন্ধুকে ফোন করুন, পৃথিবীর কোনও চিন্তা আপনার একার নয়। এই অবস্থায় মুখে চিউয়িংগাম দিন। বিশ্বনাথন আনন্দ দাবা খেলার সময় চিউয়িংগাম চেবান দেখেন না?
  • মদ্যপানের সময়ঃ– মদ্যপান যদি একান্ত করতেই হয়, নিজের মনকে বলুন, মদ্যপান ও ধূমপান  দুটোই আমার ক্ষতি করছে। তাই দুটোর বদলে একটা ক্ষতি করি। ধূমপানটা করব না। মদ্যপানও ছাড়বো ধীরে ধীরে।
  • সামাজিক অনুষ্ঠানেঃ– যেখানে ভিড় সেখানে থাকুন। আড়ালে থাকবেন না। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলুন বা থাকুন। ধুমপায়ীদের ভিড়ে ঘেঁষবেন না।

    নিকোটিন চ্যুইং গাম

প্রথম দুই সপ্তাহ আপনি যা করবেন

সিগারেটের নেশার চাগাড় দেওয়ার সময়সীমা মাত্র ১০-২০ মিনিট। এটা কাটিয়ে দিন নেশার ঝোঁকটা কেটে যাবে। প্রথম দুই সপ্তাহ, এই সময়টিকে কাটিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। এই দুই সপ্তাহের একটা রুটিন তৈরি করুন, এবং এই রুটিন মেনে এই দুই সপ্তাহে নিজেকে টেনশন ফ্রি অথচ ব্যস্ত রাখুন। স্বাস্থ্যকর খাবার খান। একা একা সিগারেটের নেশা ছাড়তে যাবেন না। সবার সঙ্গে থাকুন। ধূমপান করেন না এমন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে থাকুন। এঁদের সঙ্গে বেড়াতে যান। মর্নিং ওয়াক করুন। সিনেমা হলে যান। পেন বা পেন্সিল হাতে রাখুন। যাঁরা সাহায্য করতে চান তাঁদের ডেকে নিন বাড়িতে। সিগারেট খেতে ইচ্ছে হলেই ফোন করুন প্রিয় বন্ধু বা বান্ধবীকে যিনি আপনার চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে জানেন, বা তাঁদের কারও বাড়ি চলে যান।  প্রচুর বিশ্রাম নিন। কম ঘুম আর চিনি কিন্তু নেশার ঝোঁক বাড়ায়। মুখে চিউইংগাম গাম, মৌরি, কাঁচা গাজর, শক্ত লজেন্স দিন। ডায়েটিং করবেন না। ফল ও সবজি খান। বেশি করে জল খান। দিনে পাঁচবার নাক দিয়ে গভীর ভাবে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ছাড়ুন। দেখুন ম্যাজিক।

 

ধূমপায়ী বন্ধুদের এড়িয়ে চলুন 

ধূমপায়ীদের সঙ্গে ঘুরবেন না। তাঁরা যতই আপনাকে সাহায্য করবেন বলুন। তাঁরা সিগারেট ছাড়তে পারেননি, তাঁদের থেকে উপকৃত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভবনা নেই। তাঁরাই  কিন্তু আপনার ধূমপান ছাড়ার মূল বাধা ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। তাঁদের মুখের ওপর বলে দিন,‘আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি’। দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করুন। বন্ধুরা কিছু মনে করলে কিছু করার নেই । আসল বন্ধু হলে তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন। আপনার পথের কাঁটা হবেন না।

 

নিজেকে নিজেই পুরস্কৃত করুন

আপনি T-20 মানে ২০ মিনিটের ম্যাচে জিততে শুরু করলেন। মানে ২০ মিনিট ধরে আপনাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা সিগারেটের নেশার ঝোঁক কাটিয়ে দিলেন। আবার এই ঝোঁক ফিরে আসবে, আবার T-20  ম্যাচ। আবার জিতবেন আগের ম্যাচের মতো। ক্রমশ ম্যাচ দূরে সরে যাবে। সংখ্যায় কমে আসবে। আপনার সংগ্রামের দিকে জোর দেবেন না। কটা ম্যাচ জিতলেন, কটা ম্যাচে সিগারেট আপনাকে হারাতে পারলো না সেটা দেখুন। জয়ের আনন্দের দিকে জোর দিন। হিসেব করুন যত টাকা বাঁচল, তা দিয়ে কী খাবেন বা কী কিনবেন। প্ল্যান করুন ওই বাঁচানো টাকা দিয়ে বছর শেষে কোথায় বেড়াতে যাবেন। দুই সপ্তাহের বাঁচানো টাকা দিয়ে একটা গেট টুগেদারের প্ল্যান করুন। ভাবুন এই মুহূর্তে পৃথিবীর কয়েক লক্ষ লোক আপনার মতোই সিগারেট ছাড়ার পণ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই, একটা একটা করে  T-20 ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্ট জিততে চলেছেন।  আর কিছু ম্যাচ জিতলেই  আপনি স্বাস্থ্য, সম্মান, পয়সা সব দিক থেকে লাভবান হবেন। এতক্ষণ তো আপনিও T-20 ম্যাচগুলি জিতে এসেছেন। শেষ ম্যাচও আপনি জিতবেন বিশ্বাস রাখুন। একটা তুচ্ছ সিগারেট  আপনার মতো মানুষের জেতার সামনে বাধা হতে পারে না। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ জিতছে, আপনিও জিতবেন। বিশ্বাস রাখুন, হ্যাঁ নিজের উপরে।

 

আরও পড়ুনঃ আপনার আশেপাশে থাকা বিষাক্ত মানুষদের সহজে চিনে নিন

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.