মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

কিডনির পাথর রুখতে এড়িয়ে চলুন কোক, রোজ খান লেবুর রস

কিডনির সমস্যা এড়াতে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি কতটা? শুরু থেকেই সজাগ থাকলে, নিয়মিত চেকআপ করালে এই বিড়ম্বনা এড়ানো যায় কি? এখন এর চিকিৎসাও খুব সহজ সরল।  বলছেন বিশিষ্ট ইউরোলজিষ্ট ডাঃ অমিত ঘোষ।

প্রশ্নঃ কিডনিতে পাথর হয় কেন?

উত্তরঃ কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়ার মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ।  সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল কিডনিতে রক্ত পরিশোধনের সময়ে তাতে থাকা কিছু লবণের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া।  এতটাই বেড়ে যায় যে, তারা দ্রবীভূত হতে না পেরে থিতিয়ে পড়ে।  কালক্রমে তা পাথরে পরিণত হয়।  থিতিয়ে পড়া লবণগুলির মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড, সিস্টিন অথবা জ্যানথিন।  পাথর সৃষ্টির জন্য দায়ী রাসয়নিকগুলি যেহেতু খাদ্য থেকে আসে, তাই যে সব খাদ্যে ওই সব রাসায়নিক আছে তাদের ত্যাগ করলে সামান্য হলেও উপকার পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ সাধারণ মানুষ বুঝবেন কী করে?

উত্তরঃ বুঝতে গেলে সেই মানুষটির কিডনি পাথর বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত।  পাথর সৃষ্টির নেপথ্যে সেখানে ঠিক কোন লবণের ভূমিকা রয়েছে।  মূলত চার ধরণের কিডনির পাথর হতে পারে, যেমন ক্যালসিয়াম পাথর, ইউরিক অ্যাসিড পাথর, স্টুভাইট পাথর এবং সিস্টিন পাথর।

প্রশ্নঃ তা হলে তো প্রথম থেকেই যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে?

উত্তরঃ যাঁদের বারবার পাথর হচ্ছে বা যাঁদের কম বয়সে পাথর হয়েছে, এমন কী যাঁদের দু’দিকের কিডনিতেই পাথর হচ্ছে – তাঁরা অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন খাদ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে।  অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে রক্তের ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড এবং ফসফেট।

প্রশ্নঃ তার মানে বিপদ এড়ানো সম্ভব?

উত্তরঃ তরল গ্রহণ বৃদ্ধি, সোডিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ, প্রোটিন গ্রহণ হ্রাস ও অন্যান্য কিছু খাদ্য গ্রহণ বা নিয়ন্ত্রণে পাথর সৃষ্টির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।  শরীরে পটাশিয়াম বেশি গেলেও ক্যালসিয়াম পাথর সৃষ্টির সামান্য ঝুঁকি থাকে।  ক্যালসিয়াম পাথর কিংবা ইউরিক অ্যাসিড পাথর হলে প্রতিদিন অন্তত ১০ গ্লাস তরল পান করা উচিত।  যার অর্ধেক হবে জল।  সিস্টিন পাথর থেকে রক্ষা পেতে প্রতিদিন ৪.৫ লিটারেরও বেশি জল খাওয়া দরকার।  অতিরিক্ত পরিশ্রম ও মানসিক চাপের পর পর্যাপ্ত জল বা তরল গ্রহণে সবকরম পাথর সৃষ্টি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।  ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ মিনারেল ওয়াটার ক্যালসিয়াম ও ইউরিক অ্যাসিড কিন্তু পাথর তৈরির ঝুঁকি কমায়।

প্রশ্নঃ এটা কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না।  তাই না?

উত্তরঃ প্রতিদিন যদি হাফ কাপ বিশুদ্ধ লেবুর রস খাওয়া যায় তাহলে তা প্রস্রাবের সাইট্রেট মাত্রা বাড়িয়ে ক্যালসিয়াম পাথর সৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।  কিন্তু কোক জাতীয় পানীয় প্রস্রাবের সাইট্রেট মাত্রাকে সাংঘাতিক কমিয়ে দেয়।  তাই এই জাতীয় পানীয় সবারই উচিত এড়িয়ে চলা।  আবার অনেকেই জানেন না, আঙুরের রস পাথর সৃষ্টির ঝুঁকি অনেকটাই বাড়ায় – যা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

প্রশ্নঃ পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় – এ রকম আরও কিছু আছে নাকি?

উত্তরঃ মনে রাখবেন বেশি নুন খেলে প্রস্রাবের ক্যালসিয়াম অনেক বেড়ে যায়।  তাই যাঁদের ক্যালসিয়াম পাথর হয়েছে তাঁদের কম নুন খাওয়াই ভাল।  দেখা গেছে, খাদ্যের প্রোটিন প্রস্রাবের ইউরিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও অক্সালেটের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়।  পাশাপাশি সাইট্রেটের মাত্রা কমিয়ে দেয়।  এটা ঠিক, প্রাণীজ প্রোটিনের ক্ষতিকারক প্রভাব আজও স্বীকৃত।  এরা ইউরিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়াম অক্সালেটকে প্রভাবিত করে যৌগ দুটির কার্যকারিতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।  উদ্ভিদ প্রোটিনের তুলনায় প্রাণীজ প্রোটিনে বেশি সালফার থাকে, তাই বেশি অ্যাসিড তৈরি হয়।  কিডনির পাথরের চিকিৎসায় দুগ্ধজাত পদার্থের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।  কারণ দুধে কিডনির পাথরের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম থাকে।  অন্য দিকে স্টুভাইট পাথর হয়েছে এমন রোগীর খাদ্যে ফসফেটের মাত্রা কমানোর পাশাপাশি প্রোটিন গ্রহণের মাত্রাও কমানো দরকার।

প্রশ্নঃ মানুষকে আরও বেশি সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে – বিশেষ করে খাদ্যাভাসে।  কিন্তু তা জানবে ও বুঝবে কী করে?

উত্তরঃ খাদ্য থেকে যে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়, (যেমন দুগ্ধজাত খাদ্য) তা অক্সালেট পাথর সৃষ্টিতে রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করে।  দেখা গেছে, যাঁরা খাদ্য থেকে সব থেকে বেশি ক্যালসিয়াম গ্রহণ করেন তাঁদের পাথর হওয়ার ঝুঁকি কম, ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা মানুষের তুলনায় বেশ নগণ্য।  অনেকেই জানেন না, একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকায় শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের আশি শতাংশ-ই আসে দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে।  ক্যালসিয়ামের অন্যান্য খাদ্য উৎস হল রাজমা, সয়াবিন, তিল, কপিবীজ, কারিপাতা, কাঁকড়া বা চিংড়ির মতো সামুদ্রিক খাদ্য।  সম্প্রতি ফাইটেট (ইনোসিটল হেক্সাফসফেট) যৌগটি গবেষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।  এরা ক্যালসিয়াম লবণের ফসফেট ও অক্সালেটের কেলাসন (Crystallization) হতে দেয় না।  সুতরাং যথেষ্ট উপকারী।  আটা, দানাশস্য এবং সয়াবিন-এর মতো একাধিক উচ্চ মাত্রায় ফাইবার যুক্ত খাদ্যে ফাইটেট পাওয়া যায়।  প্রকৃতপক্ষে কিডনির পাথরে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে যে কোনও ধরনের ফাইবারই উপকারী ভূমিকা নেয়।  বিয়ার ও অন্য মাদক জাতীয় পানীয়, শুঁটি জাতীয় খাবার (যেমন বিনস, মটরশুঁটি) ,মাশরুম, পালংশাক, ফুলকপি, পোলট্রির মাংসে পিউরিন রয়েছে।  উচ্চমাত্রার পিউরিন গ্রহণে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।  তাই যাঁদের ইউরিক অ্যাসিড-এ পাথর হওয়ার ঝুঁকি থাকে তাঁদের পিউরিন সমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া উচিত।

প্রশ্নঃ তার মানে প্রতি মুহূর্তেই সতর্ক থাকা বা খাদ্যের মাপকাঠি নিজের হাতে রাখতে হবে তো?

উত্তরঃ ঘনত্বের সামান্য পরিবর্তনেও ক্যালসিয়াম অক্সালেট কেলাসনের ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।  অথচ ক্যালসিয়াম ঘনত্বের প্রচুর পরিবর্তন করেও এই জাতীয় কোনও প্রভাব ফেলা যায় না।  বিট, ব্ল্যাক টি, চকলেট, কোকো, ডুমুর, গোলমরিচ গুঁড়ো, ছাড়াও যে কোনও ধরনের বাদাম বেগুন, ঢেঁড়শ, ক্যাপসিকাম, টমাটো, চকোলেট ইত্যাদি খাদ্যে প্রচুর অক্সালিক অ্যাসিড রয়েছে।  আর বিনস, গাজর, কাঁচা পেঁয়াজ, কমলালেবু, স্ট্রবেরিতে মাঝারি মানের অক্সালেট পাওয়া যায়।  তবে মনে রাখতে হবে অ্যাসকর্বিক অ্যাসিড (ভিটামিন-সি) অক্সালেটে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।  সেই কারণে হাইপেরোক্সালুরিয়া-তে আক্রান্ত ব্যক্তির ভিটামিন সি পরিপূরক এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রশ্নঃ এ ক্ষেত্রে ক্যালসিয়ামের ভূমিকা কতটা?

উত্তরঃ দুধ জাতীয় খাদ্যে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।  তবে ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণের আগে শরীরে তার উপস্থিতির পরিমাণ জেনে নেওয়া দরকার।  দেখতে হবে ক্যালসিয়াম খাদ্য থেকে বেশি পরিমাণে শোষিত হচ্ছে নাকি এর পিছনে অন্য কোনও হরমোনের ভূমিকা রয়েছে।  গলায় থাইরয়েড গ্রন্থির পাশে থাকা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে প্যারাথরমোন নিঃসৃত হয়।  এই হরমোনটির অতি সক্রিয়তার কারণে রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে যেতে পারে।  কিন্তু যে সব কিডনি স্টোনের রোগীদের রক্তের ক্যালসিয়াম বেশি নয় তাঁদের ক্ষেত্রে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেও কোনও কাজ হবে না।  সেখানে বুঝে নিয়ে হবে যে কিডনির ছাঁকনির কার্যকারিতাতেই গন্ডগোল রয়েছে।  যে রক্ত পরিশোধনের জন্য যাচ্ছে সেখান থেকে ক্যালসিয়াম লিক করে যাছে।  তাই এরকম ক্ষেত্রে খাদ্য নিয়ন্ত্রণে কোনও কাজ হবে না।

প্রশ্নঃ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে তবে কী উপকার হয়?

উত্তরঃ হয়।  দুটো কিডনিতে স্টোন হলে, একাধিক স্টোন হলে, বারে বারে স্টোন হলে খাদ্য নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই উপকার মিলবে।  সেজন্য বলা হয়, কিডনি স্টোন বার বার হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে, তাই একবার কিডনি স্টোন হলে কিডনির হেলথ্‌ চেকআপ করানো ভাল।

প্রশ্নঃ কিডনি পাথরের চিকিৎসা তো এখন খুবই সহজ সরল?

উত্তরঃ খুবই সহজ।  বর্তমানে একটা ছোট্ট ফুটো করে অনেক কম সময়ে, কম খরচে কিডনি অপসারণ হচ্ছে।  সাধারণত ছোট পাথরে, লিথোট্রিপসি ও বড় পাথরের জন্য পি.সি.এন.এল. পদ্ধতিতে অপসারিত করা হয়।

সাক্ষাৎকারঃ বিপ্লবকুমার ঘোষ

Comments are closed.