বুধবার, মার্চ ২০

কী ভাবে রাখলে সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকবে আপনার শিশুসন্তান? ডঃ সুব্রত চক্রবর্তীর চেম্বারে দ্য ওয়াল

জ্বর না হলে পেটখারাপ। শিশুদের নানারকম শরীর খারাপ প্রায়ই লেগে থাকে। তার উপর কখনও গলায় বা নাকে কিছু আটকে যাওয়া, বিষাক্ত জিনিস খেয়ে ফেলার আশঙ্কা। এই সবই সামলাতে হয় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে। নানা রোগের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন দিয়ে শিশুকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বও তাঁরই। এই সব নিয়ে কথা বলতে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ  সুব্রত চক্রবর্তীর চেম্বারে হাজির দ্য ওয়াল।

দেখে নিন কী বলছেন ডাক্তারবাবু ?

দ্য ওয়ালআমাদের রোগ যন্ত্রণা হলে আমরা মুখে বলতে পারি, কিন্তু শিশুরা সেটা পারে না। কী করে বোঝা যায়

বাচ্চার কী হয়েছে?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনেক কিছু মাথায় রেখে চিকিৎসা করতে ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াও সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট খুব জরুরি। স্টেথো দিয়ে দেখা অবজেকটিভ অ্যাসেসমেন্ট। কিন্তু তাকে হাতে নিয়ে দেখা হলো সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট। এক্ষেত্রে মায়ের বক্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সঙ্গে বাচ্চার বায়োলজিক্যাল বন্ডিং থাকে, তাই মা যা বলছেনসেটার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। কান্না শুনে আলাদা আলাদা রোগের অ্যাসেসমেন্ট করা যায়। বড়দের ক্ষেত্রে একরকম।কিন্তু মায়ের কোলে বাচ্চা যখন ঢুকছে ডাক্তারবাবুর কাছে তখনই বোঝা যায় তার কী কী হতে পারে। পেটব্যথার কান্না বাম্যানেনজাইটিসের বা খিদের কান্নার তফাৎ আছে। তাই বাচ্চাকে দেখিয়ে তবেই ওষুধ নিতে হবে। ফোনে নয়।

দ্য ওয়াল- ভ্যাকসিনেশন বা টিকাকরণ কতটা জরুরি? ভারত সরকার নতুন কী কী পদক্ষেপ করছে?  টিকা দেওয়ার পর কি এখনও বাচ্চাদের ব্যথা হয়

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- ভ্যাকসিনেশন এর ক্ষেত্রে রিভলিউশন হয়েছে আজকাল। কোনও দ্বিধা না রেখে শিশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত। হেপাটাইটিস বি থেকে পোলিও, ডিপথেরিয়া  থেকে  চিকেন পক্স সব ভ্যাকসিন জরুরি। বর্তমানে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমেছে টিকাকরণের জন্য। হেপাটাইটিস বি জন্মের দিনে দিলে সবচেয়ে বেশি কাজ করে। এটা সরকারের নিয়মানুযায়ী ডে জ়িরোতেই দেওয়া হয়। এটা টিকা দিয়ে দিয়ে প্রতিরোধ না করা হলে পরবর্তী ক্ষেত্রে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এমনকী অভিভাবকেরা যাঁরা হেপাটাইটিস বি টিকা নেননি তাঁদেরও নিয়ে নেওয়া উচিত। ডে জ়িরোতে বিসিজি থেকে পোলিও টিকা সবই দেওয়া উচিত।
পেনলেস ও পেনফুল ভ্যাকসিনে কিছু তফাতও আছে। নর্ম্যাল ভ্যাকসিনে অনেক সময়ে বাচ্চা ৭২ ঘণ্টা ধরে কাঁদতে থাকে ব্যথা থাকে। অভিভাবকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পেনলেসে ব্যথা হয় না। আগে DPT (ডিপথেরিয়া, হুপিং কাফ আর টিটেনাস) ভ্যাকসিনের জন্য ব্যথা হতো। হুপিং কাফের যে ব্যকটেরিয়া তার জন্যই ব্যথাটা হয়।এখন হুপিং কাফেরটা আলাদা করে দেওয়া হয়।তবে পেনলেসে উপকারিতা খুব সামান্য কমে যায়।ডাক্তারবাবু তাই ৬ সপ্তাহের বাচ্চাকে প্রথমে নর্ম্যাল ভ্যাকসিন করিয়ে তারপর বাকিগুলো পেনলেস দেন। সরকার কিন্তু এগিয়ে আসছে এই ক্ষেত্রে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধকারী ভ্যাকসিনের কথাও ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। যা খুবই যুগান্তকারী আবিষ্কার।  ভ্যাকসিনে দেরি হলে কিছু করার নেই কিন্তু চেষ্টা করতে হবে যাতে সব টিকা সব বাচ্চারা পায়

দ্য ওয়াল- হামা দিতে দিতে বাচ্চারা অনেক সময়ে যা পায় তাই মুখে নাকে কানে ঢুকিয়ে ফেলে, কী করতে হবে তৎক্ষণাৎ?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- পিন জাতীয় কিছু বা ধারালো কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। প্রাথমিক ভাবে খাবার বা পুঁথি জাতীয় কিছু আটকে গেলে বাচ্চাকে উপুড় করে চাপড় দিতে থাকতে হবে। কোনও রাসায়নিক জাতীয় জিনিস যাতে তার মুখে না যায় সেদিকে খুব সাবধান থাকতে হয়। প্রয়োজনে অপারেশন করতে হবে।

দ্য ওয়াল – বাচ্চাদের জ্বর হলে অনেক সময় খিঁচুনি হয় অনেকের, এটা কতটা ক্ষতিকারক?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- জ্বরের সময়ে খিঁচুনি ৬ শতাংশ বাচ্চার হয়.এটা বংশগতও নয়। একে “ফেব্রাইল কনভালশন” বলে ডাক্তারি পরিভাষায়।৩-৫ বছর বয়স অবধি সাধারণত হয়। সেই সময়ে জ্বর কমিয়ে প্যারাসিটামল দিয়ে একটা ওষুধ দিয়ে গা স্পঞ্জ করে রাখতে হবে। অযথা ভয়ের কোনো কারণ নেই। ব্রেনডেথের আশঙ্কার কারণই নেই। নির্দিষ্ট ওষুধ আছে আজকাল এই খিঁচুনির। তাই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সেটা দিয়ে দিলেই হল। যে কোনও জ্বরই আসলে অন্য রোগের একটা লক্ষণ। তবে ডেঙ্গি জাতীয় কিছু হলে বুঝবেন অন্য বারের থেকে আলাদা। যদি জ্বরে কোনো সর্দি–কাশি-কাফ নেই, চোখ ছলছল করছে না এবং বাচ্চা কাহিল হচ্ছে বেশি, তা হলে চিন্তার কারণ আছে। ডেঙ্গি প্রথমে যদি ধরে ফেলা যায় তা হলে সমস্যা কম। সাধারণ জ্বরে ৫-৬ ঘণ্টার গ্যাপে প্যারাসিটামল দিন একটু বড় বাচ্চাকে। পেট খারাপে ওআরএস দিতে থাকুন। যদি ডাক্তারের কাছে সঙ্গে সঙ্গে না যেতে পারেন।

দ্য ওয়াল- একদম ছোট শিশুরা যখন খেতে চায় না, তখন আসলে তাদের কী সমস্যা হচ্ছে বোঝা যাবে কী করে?অভিভাবকেরই বা কী করণীয় সে সময়?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- অভিভাবকেরা এটা বললেও ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার দরকারই নেই। বাচ্চার জন্মের পর থেকে প্রথম ৫ মাসে দ্বিগুণ ওজন বাড়ে। আর তিন গুণ হচ্ছে ১ বছরে। মায়েরা যদিও এখানেই চিন্তিত হয়ে পড়েন। মূলত বাঙালি পরিবারে বাচ্চারা ভাত খাচ্ছে না বলা হয়।  খাচ্ছে না কারণ ওর সেটা প্রয়োজন নেই। ভাতের সাথে ডাল বা তরকারি নয়। ভাতের সাথে ডাল বা তরকারি নয়, বরং আপনি ডাল তরকারির সঙ্গে একটু ভাত খাওয়ান। ওকে সব্জি খাওয়ান বেশি। প্রথম ২ বছর সার্বিক বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই সব্জি ও ফল খাওয়ান। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন মা যদি ফল সব্জি খান তাহলে বাচ্চাও সে ভাবে অভ্যস্ত হবে। তাই সেই অভ্যাস করতে হবে মা-কে। নইলে বাচ্চা জাঙ্ক ফুডে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

দ্য ওয়াল- ঋতু পরিবর্তনের সময়ে ঠাণ্ডা লাগা এবং পেট খারাপের প্রতিরোধ এবং প্রতিকার কী কী

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী – কমন কোল্ড নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন বা হু বলছে প্রথম ৩ বছর ঠাণ্ডা লাগা স্বাভাবিক। প্রতি মাসে তা হতেই পারে, যদি না অ্যালার্জি হয়। খাবার এবং জল সবসময় ফুটিয়ে নিলে পেটের সমস্যাও কম হবে। পানীয় জল ৫-৭ মিনিট ফুটিয়ে নিলে ভালো হয়। মূলত বর্ষাকালে পানীয় এবং স্নানের জলও ফুটিয়ে নিন। ফ্রিজ থেকে নামিয়ে খাবার ফুটিয়ে নিন। আমরা জানি ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। ফ্রিজ থেকে ফল নামালে ৩-৪ ঘণ্টা পরে খাওয়ান, অসুবিধা নেই। তার বেশি হলেই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। মোবাইল বা পেন মুখে দিলে পেট খারাপের চান্স কম। ওটা ভেজা সারফেস নয়। ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে সারফেসে।তাই সেদিকে নজর দিতে হবে।বারবার সর্দি হলে সেটা অ্যালার্জি হয়তো, তখন ডাক্তারের কাছে অবশ্যই নিয়ে যাওয়া দরকার।

দ্য ওয়াল- হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিসিজ কী এবং কেন হয়? প্রতিরোধের উপায় কী? আর হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে কি করণীয়?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিস ইন্দোনেশিয়ায় খুব প্রভাব ফেললেও এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে এটা অতটা প্রভাব ফেলে না।মূলতঃ স্কুল থেকেএই রোগ আসে। তাই স্কুল এবং মা বাবা সকলকে খুব নজর রাখতে হবে।এই ভাইরাল রোগটিতে কিছুটা ব্যথা, সঙ্গে জ্বর হবে। কিছুদিন কাহিল করে দেয় বাচ্চাকে।তাই সেদিকে নজর দিতে হবে।এই রোগে আক্রান্ত শিশুকে স্কুলে না পাঠানোই ভালো। কারণ অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগটি।


দ্য ওয়াল  –  শিশুদেরও মুডসুইং হয়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও শিশুদেরও এই সমস্যা হয়। অনেক সময় শিশুরা একা থাকতে বাধ্য হয়। এতে আসলে তাদের মনের অস্থিরতা বাড়ে। তার প্রভাব শরীরে কী ভাবে পড়ছে? সেক্ষেত্রে সহজে সেটা কাটানোর উপায় কী?

ডঃ সুব্রত চক্রবর্তী- বাচ্চাকে যেটুকু পারছেন কোয়ালিটি টাইম দিন। মা বাবা ব্যস্ত হতেই পারেন, কিন্তু যেটুকু সময় দেবেন ভালো সময় দিন। পড়া স্যাক্রিফাইস করেও খেলতে পাঠান। গো আউট অ্যান্ড প্লে দরকার। তাতে সকলের সাথে মিশতে পারবে শিশুটি। তার শারীরিক কসরত হবে, বুদ্ধি খুলবে। লিডারশিপ কোয়ালিটি গড়ে উঠবে। মুক্তমনে সব কিছু বিচার করার ক্ষমতা তৈরি হবে। বিকেলে আপনার বাচ্চা মাঠে পাঠান।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Shares

Comments are closed.