সোমবার, অক্টোবর ১৪

এত আওয়াজ চারিদিকে, এত শব্দ দূষণ, কী ভাবে বাঁচাবেন নিজের কান?

শব্দ দানবের জ্বালায় কম বেশি আজকাল আমরা প্রায় সকলেই অতিষ্ঠ।  কিন্তু এই সমস্যা থেকে আমাদের কানের কী কী সমস্যা হতে পারে, অন্তত হওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে।  পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র হর্ন দেওয়া গুরুতর অপরাধ, তবু হর্ন বাজে।  তাহলে আপনার উপায় কী! সে কথাই ‘দ্য ওয়াল’-কে বললেন ইএনটি বিশেষজ্ঞ সুমিত চট্টোপাধ্যায়।

দ্য ওয়াল: শব্দদূষণ শ্রবণশক্তির কতটা ক্ষতি করে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়: খুবই ক্ষতিকর।  শব্দদূষণকে শ্রবণশক্তির এক বড় নীরব ঘাতক বলা যেতে পারে।  দেখা গেছে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পিছনে এক পঞ্চমাংশ ক্ষেত্রে শব্দ দূষণ কে দায়ী করা যায়।

দ্য ওয়াল: শব্দ সীমা কতটা রাখা উচিত?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়: আমরা মোটামুটি সবাই জানি, শব্দের পরিমাপ হল ডেসিবেল।  ফিসফিসিয়ে আমরা যে কথা বলি, তাও মোটামুটি ২৫ ডেসিবেল।  সেই হিসেবে ৭০- ৭৫ ডেসিবেল অবধি শব্দ কানের পক্ষে সহনীয়।  ৯০ ডেসিবেল এর বেশি হলেই কানের মারাত্মক ক্ষতি হতে থাকে।

দ্য ওয়াল: কী ধরণের শব্দ কানের বেশি ক্ষতি করে ?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  সহনীয় লেভেলের ওপর যে কোনো শব্দই খুব ক্ষতি করে।  আমরা তো সবাই জানি– রাস্তায় ঘাটে সারাদিন যে হর্ন বাজে তাতে কানের প্রচন্ড ক্ষতি হয়।  আবার আপনি যদি নিজের বাড়িতে সারাদিন প্রচন্ড জোরে মিউজিক শোনেন তাতেও বেশি বই কম ক্ষতি হয় না।

দ্য ওয়াল: শব্দের ক্ষতিকর দিকটায় কি কোন বড় ছোটর কোন ব্যাপার আছে ? ছোটরা হয় তো দেখা গেল যে পরিমাণ শব্দ সহ্য করতে পারছে, সেই পরিমাণ শব্দ বয়স্করা পারছে না, এটা হতে পারে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  শব্দ দূষণ যে কোনও বয়সের পক্ষে সমান ক্ষতিকারক তবে কান খারাপ হলে বয়স্কদের ক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখা যায় , সেটা আবার একটু মজারও।  আপনারা হয় তো লক্ষ করে দেখবেন যে আপনার বাড়িতে কোন দাদু বা দিদিমা আছেন, যাঁদের নরমাল ভলিউমে ডাকলে তাঁরা সাড়া দেন না।  অথচ গলা সামান্য একটু বেশি তুললে তখন তাঁরা ভীষণ বিরক্ত হন, অনুযোগ করেন –এত জোরে চেঁচাচ্ছিস কেন ? মানে একটা নির্দিষ্ট ডেসিবেলের ওপর তাঁরা জোরে শব্দকে বড্ড জোরে শোনেন  তাতে তাঁদের কষ্ট হয়।  ইনফ্যাক্ট, কান যে খারাপ হচ্ছে , তাঁদের শ্রবণ ক্ষমতা যে কমে গেছে, এই অদ্ভুত ঘটনাটা তার একটা বড় লক্ষণ।

দ্য ওয়াল: আচ্ছা শব্দ দূষণের জন্য কারও যে কান খারাপ হয়ে গেছে সেটা কী ভাবে বোঝা যাবে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  শব্দ দূষণের জন্য হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, কানের শ্রবণ ক্ষমতা যদি কমে যায় পেশেন্ট সাধারণত নিজে নিজে সেটা বুঝতে পারেন না।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সাধারণত তাঁদের বাড়ির লোকে কমপ্লেন করে –এতবার ডাকছি শুনতে পাচ্ছ না? বা তুমি এত অন্যমনস্ক থাকো কেন?  সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু সহজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে।  আপনারা আপনাদের চিকিৎসকের কাছে গেলেই তিনি সেটা বলে দেবেন।  পরীক্ষা করলেই রোগটা ধরা পড়ে যাবে।  শব্দ দূষণের ক্ষেত্রে একটা পার্টিকুলার ধরনের পরীক্ষায় পার্টিকুলার ধরনের রিপোর্ট পাওয়া যায় ।  এটা পুরোপুরি মেডিক্যাল ব্যাপার।  তবে সেইটা থেকে খুব সহজেই ধরা যায় পেশেন্টের কান খারাপ হয়েছে কিনা, বা হলে সেটা শব্দ দূষণের জন্য হয়েছে কিনা।

শুনে নিন ডাক্তারবাবু আর কী বলছেন এ বিষয়ে

দ্য ওয়াল: আচ্ছা যদি কান বেশি খারাপ হয়ে যায় তাহলে কি চিকিৎসা আছে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  চিকিৎসা অবশ্যই আছে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেশেন্টরা বড্ড বেশি দেরি করে আসেন।  সে ক্ষেত্রে কানে শোনার মেশিন বা হিয়ারিং এড ছাড়া কোন উপায় থাকে না।  এবং এখনকার দিনে এতো ভালো ভালো মেশিন বেরিয়ে গেছে, পেশেন্টের অলমোস্ট নিয়ার নর্মাল হিয়ারিং অর্থাৎ ইয়াং বয়সে স্বাভাবিকভাবে তিনি যে রকম শুনতেন  সেই ধরনের শ্রবণ ক্ষমতাই তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া যায় ।  তবে মেশিনটা সব সময় পরে থাকতে হয়।

দ্য ওয়াল: তা সেটা তো খুবই অসুবিধাজনক ব্যাপার, সব সময় কানে একটা কিছু লাগিয়ে রাখা…….

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  এখনকার হিয়ারিং এডগুলো এত ছোট হয়ে গেছে যে, সেটা এখন আর কোনও সমস্যাই নয়।  তা ছাড়া হিয়ারিং এডগুলো কানের পিছনে থাকে বলে সহজে দেখাও যায় না।  কিছু কিছু হিয়ারিং এড কানের একদম মধ্যে রাখা যায়।  সেগুলো তো বাইরে থেকে একেবারেই দেখা যায় না।  ফলে কিছু কিছু পেশেন্ট আগে যে লজ্জা পেতেন বা একটু দ্বিধাবোধ করতেন, সেই সমস্যাগুলো এখন খুবই কমে গেছে।

দ্য ওয়াল: ধরুন কান খারাপ হয়েছে অথচ আমি হিয়ারিং এড নিলাম না, বা কোন চিকিৎসা করলাম না, তাতে কি কি অসুবিধা হতে পারে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  আপনার খারাপ কান আরও খারাপ হয়ে যাবে। এতে দুটো অসুবিধে ।

প্রথমতঃ খুব বেশি খারাপ হয়ে গেলে কানে একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ হয় সেটা অসম্ভব বিরক্তিকর । আপনারা দেখেছেন ,আমরা সবাই দেখেছি স্নান করার পর কানে জল ঢুকে গেলে আমাদের কানটা কী রকম বুজে যায়।  একটা শব্দ হয়।  সামান্য সময়ের জন্য হয়, কিন্তু আমাদের কী ভীষণ অস্বস্তি হয় ! ভেবে দেখুন সেই রকম সাউন্ড দিন রাত ২৪ ঘন্টা সপ্তাহে সাত দিন বছরের ৩৬৫ দিন আপনার কানের মধ্যে যদি হতে থাকে তাহলে কেমন লাগবে?

দ্বিতীয়তঃ  কানে কিছু শুনতে পান না, রাস্তাঘাটে বের হচ্ছেন, যে কোন সময় বড়সড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন।

দ্য ওয়াল: তাহলে শব্দ দূষণ থেকে বাঁচার কি কোন উপায় আছে?

ডঃ চট্টোপাধ্যায়:  সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে শব্দ দূষণ কমানও কিন্তু সেটা তো ব্যক্তিগত লেভেলে সম্ভব নয়, সেটা কোন সরকার তার সদিচ্ছা দিয়ে একমাত্র করতে পারেন।

ব্যক্তিগতভাবে যেটা সম্ভব সেটা হচ্ছে যতটা সম্ভব জোরালো শব্দ থেকে নিজেকে দূরে রাখা ।

আমি উদাহরণ দিয়ে বোঝাই।  ধরুন কোন মন্দিরে গেছেন।  সেখানে বেশ জোরে জোরে ঢাক ঢোল কাঁসর ঘন্টা বাজছে।  আপনি চেষ্টা করবেন যথাসম্ভব ওই সব শব্দের উৎস থেকে দূরে থাকতে।  মানে ঢাক যেখানে বাজে ঠিক তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন না।  ঠিক তেমনই কোন প্রোগ্রাম বা জলসায় গেছেন, চেষ্টা করবেন যেখানে বক্সটা বাজছে, ঠিক তার পাশে যেন না দাঁড়াতে বা বসতে হয়।  আপনি গান শুনতে ভালোবাসেন।  তার মানে এই নয় যে বাড়িতে সারাক্ষণ প্রচন্ড জোরে গান চালিয়ে শুনবেন।  এখন যেমন হেডফোন এর প্রচলন খুব বেড়ে গেছে ।  হেডফোনে গানটা খুব ভালো শোনা যায় যেমন ঠিক কথা, তেমনি হেডফোনে কানের ক্ষতিও সর্বোচ্চ পরিমাণে হয়।  একটা লেভেলের বেশি শব্দ নিয়ে বা ডেসিবেলের বেশি সাউন্ড কখনওই শোনা উচিত না।  তাই হেডফোনে একটানা অনেকক্ষণ জোরে জোরে গান না শোনাই বাঞ্ছনীয়।

এরকম কিছু কিছু ছোট ছোট সর্তকতা পালন করলেই শব্দ দূষণ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Comments are closed.