রবিবার, এপ্রিল ২১

পলিসিস্টিক ওভারি কোনও ডিসিজ় নয়, সিন্ড্রোম

আজকাল যে সমস্যায় জেরবার মহিলা মহল , তা PCOD বা PCOS, কী এই PCOD বা PCOS? পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিণ্ড্রোম না পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিসিজ়? রোগের লক্ষণ না রোগ কী এটা, যা নিয়ে মেয়েদের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে এই হাইটেক যুগে! বিশিষ্ট গায়নোকলজিস্ট ডঃ বিশ্বজ্যোতি গুহর সঙ্গে কথা বললাম আমরা।  ‘দ্য ওয়াল’ কে কী বললেন ডাক্তারবাবু, জানুন….

দ্য ওয়াল: পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম কী? কেন হয়?
ডঃ গুহএটা একটা বায়োকেমিক্যাল ডিসঅর্ডার।  একে অনেকে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিসিজ় বলে, তা কিন্তু নয়।  এটা আসলে সিণ্ড্রোম।  দেখা যায় অনেকেরই ওভারির চারপাশে অনেক ছোট ছোট সিস্ট হয়।  মালার মতো হয়ে ওভারির চারপাশে থাকে এই সিস্ট।  সিস্ট আসলে জলভরা ছোট থলি, আর একসাথে অনেক সিস্টকে বলা হয় পলিসিস্ট।

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম হল মহিলাদের মধ্যে অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন) এর মাত্রা বেড়ে যাবার জন্য কিছু উপসর্গ।ছোট ছোট সিস্ট পুঁতির মালার মতো দেখতে ওভারি বা ডিম্বাশয়কে ঘিরে থাকে। এই সিস্টের জন্য ওভারির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। পলিসিস্টিক ওভারি এমন একটি ব্যাধি যেখানে একটি মহিলার ডিম্বাশয় বড় হয় এবং সেখানে ০.৫-১.০ সেন্টিমিটার ব্যাসের ছোট ছোট ফলিকুলার সিস্ট তৈরি হয়। এর ফলে ডিম্বাশয়ে ডিম্বানু জমা হয় যা শরীর থেকে বেরোতে পারে না। এক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ টি সিস্ট থাকবে প্রতি ওভারিতে।

যে সব কারণে হয় সেগুলো, ১.জিনগত কারণ, অর্থাৎ যাঁদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিসিজের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, ২.পরিবেশগত কারণ, ৩.আচরণগত কারণ।  অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অনিয়মিত খাদ্যাভাস, ফাস্টফুডের প্রতি ঝোঁক,অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবার খাওয়া, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ইত্যাদি।  পাশাপাশি মানসিক চাপও এই অসুখের বড় একটা কারণ।

দ্য ওয়াল: কোন বয়সে এটা হতে পারে?
ডঃ গুহ১৮ থেকে ৪৪ বছরের মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ এন্ড্রোক্রিন গ্রন্থির রোগ হল পিসিওএস।  এই বয়সের প্রায় ২% থেকে ২০% মহিলা এই অসুখে আক্রান্ত।   পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিণ্ড্রোম আসলে অ্যাডলোসেন পিরিয়ডে হলে মানে ১৩- ১৬ এর মধ্যে হলে চিকিৎসা করা কঠিন হয়।  কারণ তখন তাদের ওভারিতে মান্টিপল ফলিকল থাকে।  ফলিকল মানে ডিম, যা ভিতরে তৈরি হয়ে ওভারি সারফেসে এসে ফাটে এবং ওভাম তৈরি হয়।  এই ডিম ফাটার আগেই খুব ছোট ছোট ১৮ থেকে ২০ মিলিমিটারের সিস্ট তৈরি হয়।  যাদের অনেক সংখ্যায় তৈরি হয় এই সিস্ট তাদেরই পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিণ্ড্রোম হয়।  ডিম না ফুটেই অনেকের পিরিয়ড শুরু হয়, একে বলা হয় অ্যানিভোলেশন।  এদের ক্ষেত্রে অনেকটা পরে শুরু হলেও বেশিদিন ধরে চলে পিরিয়ড।

দ্য ওয়াল: পিসিওডির লক্ষন কী? যার থেকে অনুমান করা যায় এই সমস্যা হচ্ছে?
ডঃ গুহকেউ কেউ কিছুটা মোটা হয়ে যায়, শরীরে লোমের পরিমাণ বেশি থাকে।  মেন্স্ট্রুয়াল ইরেগুলারিটি থাকে।  ব্রণর সমস্যা ইত্যাদি থাকে।  প্রথমেই অনিয়মিত পিরিয়ড বা পিরিয়ড একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও ঘটতে পারে।  এ ছাড়াও চুল পড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যালাকটোরিয়া অর্থাৎ স্তন বৃন্ত থেকে সাদা তরল বেরনো ইত্যাদিও হতে পারে।  পলিসিস্টিক ওভারি দীর্ঘদিন ফেলে রাখার ফলে ৪০ বছরের এজ গ্রুপে ডায়াবেটিস, হাইপার টেনশন,থাইরয়েডের মতো মাল্টিসিস্টেম এফেক্ট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শুনুন এ নিয়ে ডঃ গুহ কী বলছেন–

দ্য ওয়াল: এখন অল্প বয়স্ক মেয়েদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারির সমস্যা কি দিন দিন বাড়ছে কেন বাড়ছে? দৈনন্দিন lifestyle এর ভূমিকা কতটা? নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করলে এটা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে?
ডঃ গুহ: না সমস্যা আগেও ছিল, তবে এখন অনেক বেশি সামনে আসছে বিষয়টা।  তবে অনেকক্ষেত্রে ওভার ডায়গনসও করা হচ্ছে।  সেটা বারবার দেখে নেওয়া উচিত।
এখন অনিয়নিত জীবনযাপন, জাঙ্কফুডের প্রতি নির্ভরশীলতা, কোনও এক্সারসাইজ় না করা এরকম একাধিক জিনিস একসাথে করলে সমস্যা তো হবেই।  এই লাইফস্টাইলে কোনও অ্যাক্টিভিটি থাকছে না।  স্কুলে বা কলেজে যাতায়াত, সঙ্গে বাড়ি এসে পড়া, লেখা এবং টুকটাক কাজ করে স্মার্টফোনে ডুবে গেলে সমস্যা তো হবেই।  তাই এগুলোতে নজর দিতে হবেই।

দ্য ওয়াল:কী কী ভাবে এই রোগটির নির্ণয় সম্ভব?
ডঃ গুহরোগীর চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা হয়।  কোন বয়সে রোগী আসছে সেই অনুযায়ীই চিকিৎসা হয়।  তবে ১২ -১৩ বছরের রোগী এলেও প্রথমেই প্রেগনেন্সির দিক থেকেই ভাবা হয়।  পাশাপাশি ওষুধের থেকেও রোগীর ওজন কমানোর বিষয়ে জোর দেন চিকিৎসকরা।  এরপর আল্ট্রা সাউন্ড, এন্ড্রোজেনিক ওভার অ্যাকটিভিটি টেস্ট,  হরমোনাল মাত্রা পরীক্ষা, ওজন ও উচ্চতা পরীক্ষা, লিপিড প্রোফাইল দেখা হয়।  ৪০-র ওপরে কোনও মহিলা এই সমস্যায় ভুগলে তাঁর এন্ড্রোমেট্রিয়াল বায়োপ্সি করানো হয়।  এছাড়াও ধাপে ধাপে অন্যান্য চিকিৎসা রয়েছে।

দ্য ওয়াল: অনেকের ৩০-৩২ এর পরে সমস্যা শুরু হল, কেন সেটা এবং তখন কী করতে হবে?
ডঃ গুহ: 
ওভারওয়েটের জন্য অনেক সময়ে এরকম হয়।  এক্ষেত্রে একটু সমস্যা হয় ট্রিটমেন্টে। কারণ এদের ক্ষেত্রে পিরিযড রেগুলার করা এবং সন্তান যাতে আসে সেই দু’দিকেই নজর দিতে হবে। বিবাহিত এবং বাচ্চা চাইলে তাঁকে এক্ষেত্রে ট্রিটমেন্টের পিলগুলো দেওয়া যাবে না।  কারণ এই পিলগুলো কন্ট্রাসেপটিভ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।  যাঁদের সন্তান নেই তাঁদের একরকম চিকিৎসা আর যাঁর আছে, তাঁর ক্ষেত্রে আরেকরকম হবে ট্রিটমেন্ট।  কারোর কনজুগাল লাইফ না থাকলে, তাঁকে হরমোনাল পিল দেওয়া হয়, কিন্তু কনজুগাল লাইফে থাকলে এবং বাচ্চা তখনই চাইলে তাঁকে দেওয়া যাবে না।  আবার যাঁরা এখন চিকিৎসার জন্য পিল নিচ্ছেন, তাঁদের যে পরবর্তীকালে বাচ্চা হতে সমস্যা হবে তা কিন্তু নয়।  ঠিকঠাক নিয়মে থাকলে পরবর্তীকালে একটু দেরিতে হলেও বাচ্চা আসতে সমস্যা নেই কোনও।

দ্য ওয়াল: চিকিৎসায় কি এটা পুরো সারে?
ডঃ গুহএটি ১০০ শতাংশ সেরে যায় না কখনোই।  তবে ওষুধ দিয়ে এবং নিয়মিত মনিটরিং-এর মাধ্যমে সমস্যাগুলোকে বেশ কিছুটা কমিয়ে রোগীকে স্বাভাবিক জীবন দেওয়া যেতে পারে।  পাশাপাশি এই রোগের প্রভাবগুলোকেও কমিয়ে দেওয়া যায় ২০-২৫ বছরের জন্য।  এমনকি রোগীর সহযোগীতা থাকলে তাঁর পক্ষে কনসিভ্ করারও কোনও সমস্যা নেই।  আর এই চিকিৎসার সময়ে অনেকের মানসিক বিরক্তি বেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম কম হওয়া সহ বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।

শুধুমাত্র লাইফস্টাইল অর্থাৎ জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই রোগ কমানো যায়।  নিয়মিত শরীরচর্চা, হাঁটাচলা, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ছোটোদের দৌড়ানো, খেলাধূলার পাশাপাশি সঠিক সময়ে ওষুধের মধ্যে দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় সহজেই।  আর অযথা চিন্তায় ডুবে যাবেন না।  পুরো সেরে যাওয়া অসম্ভব হলেও এটা নিয়ে চিন্তা করতে বসলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।  আর ধূমপান বা মদ্যপানের বিষয়ে একটু সচেতন থাকতে হবে, মদ্যপান কখনও কখনও করলেও ধূমপান করবেন না একেবারেই।  এতে সমস্যা বাড়বে।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Shares

Comments are closed.