মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

শরীরের কোথাও ফুললে গাফিলতি করবেন না

হার্নিয়া এমন একটি রোগ যা শরীরেরই অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড, তবু তা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে সময় পেরিয়ে গেলে। তাকে শরীরেই রেখে দেবেন না কেটে বাদ দেবেন! কী করবেন আর কী করবেন না হার্নিয়া হওয়া আটকাতে, কিংবা হয়ে গেলে তাকে আয়ত্তে রাখতে, তা নিয়েই কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট এ ডব্লিউ আর (Abdominal Wall Reconstruction)সার্জেন ডঃ বি রামানার সঙ্গে। দ্য ওয়ালকে কী বললেন ডাক্তারবাবু জানুন….

দ্য ওয়াল: হার্নিয়া কী? কেন হয়?

ডঃ রামানা: শরীরের অপেক্ষাকৃত নরম মাংসপিণ্ড যখন শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসতে চায় তখন তাকে হার্নিয়া বলতে পারি।  আমাদের পেটের কিছু অংশ আছে যেগুলো আশেপাশের অংশ থেকে দুর্বল হয়৷ অনেকের জন্মগতভাবেও এই অংশগুলো দুর্বল থাকে৷ পেটের ভিতরের চাপ যদি বেশি হয়, যেমন অনেক দিনের পুরনো হাঁচি, কাশি বা কোষ্ঠকাঠিন্যর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তাদের ক্ষুদ্রান্ত্র এই দুর্বল অংশগুলো দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে৷ কুঁচকিতে হার্নিয়া হতে পারে৷ এটা সাধারণত পুরুষদের হয়৷ মহিলাদের উরুর ভেতরের দিকে ফুলে যায়৷ নাভির চারপাশে বা কোনো একপাশেও ফুলে যায় অনেক সময়ে৷ এটাকে নাভির হার্নিয়া বলা হয়৷ আগে অপারেশন করা হয়েছে এমন জায়গাতেও হার্নিয়া হতে পারে৷ এটাকে ‘ইনসিশনাল হার্নিয়া’ বলা হয়৷ ভারী জিনিস তুলতে গিয়েও হতে পারে হার্নিয়া৷ পুরুষদের প্রস্টেটের অসুখ, ইউরিনারি ব্লাডারের অসুখের কারণে হতে পারে৷ চাপ দিয়ে টয়লেট করলে হতে পারে৷ মহিলাদের ক্ষেত্রে ডেলিভারির পর ভারী কাজ বা অনবরত সিঁড়ি ভাঙলে হার্নিয়া হতে পারে৷

দ্য ওয়াল: হার্নিয়া হচ্ছে সেটা কী দেখে বোঝা সম্ভব?

ডঃ রামানা: হাঁটাচলা করলে, ভারী জিনিস তুললে বা জোরে হাঁচি-কাশি হলে কুঁচকির ওপরের দিকটা গোলাকার বলের মতো ফুলে ওঠে এবং শুয়ে থাকলে এটা চলে যায়।  মাঝে মধ্যে শক্ত হয়ে যায় এবং ব্যথা হয়।  কিছুদিন এভাবে চলার পর গোলাকার ফোলাটি স্ক্রোটামে (অণ্ডকোষ থলিতে) নেমে আসে এবং শুয়ে থাকলে আপনা আপনি পেটের ভেতর চলে যায়।  ফোলা অংশটি বড় হতে থাকে এবং মাঝে মধ্যে চাপ দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হয়।  তারপর ক্রমে চাপ দিলেও পেটের ভেতরে ঢোকে না।  এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন।

দ্য ওয়াল: মহিলা এবং পুরুষের ক্ষেত্রে কতটা তফাৎ হয় হার্নিয়ায়?

ডঃ রামানা: হার্নিয়া ছেলে মেয়ে যে কারও হতে পারে।  পুরুষের ক্ষেত্রে অন্ডকোষ বা স্ক্রোটাম, মহিলাদের ক্ষেত্রে উরুর ভেতরের দিকে মাংসপিণ্ড ফুলে গেলে হার্নিয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা যায়।  মেয়েদের সাধারণত ব্যায়ামের অভ্যাস কম থাকায় তাদের পেটের পেশীগুলো সহজে নরম হয়ে ঝুলে পড়ে।  তা থেকেই হার্নিয়ার শুরু হয়।  অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে, বিশেষত সি সেকশনের পরে হার্নিয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

দ্য ওয়াল: কত রকমের হার্নিয়া হতে পারে, কী কী?

ডঃ রামানা: ইংগুইনাল হার্নিয়া নারী পুরুষ উভয়েরই হতে পারে দাঁড়িয়ে থাকলে, ভারী জিনিস তুললে বা জোরে কাশলে, হাঁচলে।  আবার শুয়ে পড়লে কমে যায়।  ফেমোরাল হার্নিয়ারও একই উপসর্গ, তবে পুরুষের চেয়ে মহিলাদের বেশি হয়।  ইনসিশোনাল হার্নিয়া মূলত মহিলাদের ডেলিভারির পরে বা কিডনি স্টোন অপারেশনের পরে হয়।  আম্বিলিক্যাল হার্নিয়াও মহিলাদের হয়, নাভির চারপাশে এটা হয়।  নাভির চারপাশ থেকে বেরিয়ে আসে নরম মাংসপিণ্ড।  এপিগ্যাসট্রিক হার্নিয়া হয় পেটের উপর দিকে, খুব ছোট আকারের এই হার্নিয়া বেশ যন্ত্রণা দেয় নারী পুরুষ উভয়কেই।  লাম্বার হার্নিয়া হয় কিডনির অপারেশনের পরে।  অপারেশনের পরে জোরে কাশি হলে এই সমস্যা তৈরি হয়।  বাকি হার্নিয়ার তুলনায় স্প্যাগেলিয়ান হার্নিয়া খুব কম হয়, অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটি থেকেই এই হার্নিয়া হয়।  প্যারাইসোফেগাল এবং ডায়াফ্রামাটিক হার্নিয়া হলে বুক জ্বালা, রাত্তিরে কাশির সমস্যা, গলার স্বরে পরিবর্তন দেখা যায়।  প্যারাস্টোম্যাল হার্নিয়ার ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রো সমস্যা থাকলে বা স্টম্যাকের সমস্যা থাকলে সম্ভাবনা বেশি থাকে।  ডায়াস্টাসিস হার্নিয়া পেট কেটে যে কোনও অপারেশন হলেই হতে পারে।  তাই পেট কেটে যে কোনও অপারেশনের পরে সাবধানে থাকাটা হার্নিয়া এড়াতে খুব জরুরি ।

দ্য ওয়াল: কোনওভাবে আটকানো যায় হার্নিয়া? লাইফস্টাইল, ফুড হ্যাবিট কতটা দায়ী?

ডঃ রামানা: শুরুতেই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তা ব্যথা থাক বা না থাক।  লাইফস্টাইল অবশ্যই দায়ী।  ওবেসিটি যে কোনও ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করে।  এক্ষেত্রেও আলাদা না।  যত ব্যায়াম করে নিজেকে ফিট রাখবেন তত সমস্যা কম।  আর অপারেশনের পরে ভারী জিনিস তোলা, বেশি জোরে হাঁটা, খুব জোরে হাঁচি কাশি হার্নিয়ার সূত্রপাত করতে পারে।  তাই হাল্কা খাবার খান আর রোজ কিছুক্ষণ ব্যায়াম করুন।  হার্নিয়া একবার হলে অপারেশন ছাড়া গতি নেই।  ওষুধে বা কোনও ঘরোয়া টোটকায় সারে না এই রোগ।

দ্য ওয়াল: ক্যান্সার, সুগার, হাই ব্লাড প্রেশারের রোগী বা হার্টের পেশেন্ট হলে অপারেশন করা যায়? রিস্ক থাকে কতটা?

ডঃ রামানা: এক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ে।  অপারেশনে সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা।  অন্য কোনও বড় রোগ না থাকলে অপারেশনের পরে সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরা সম্ভব।  কিন্তু এক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগে।  অপারেশন করার আগে এজাতীয় রোগীদের অনেক বেশি অবসার্ভেশনে রাখতে হয়।  তাদের শরীরের সমস্ত দিক খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে তবে অপারেশন করা হয়।  এমনকি এজাতীয় রোগীদের যদি হার্নিয়া খুব একটা সমস্যা না করে তাহলে অপারেশল করতেও বারণ করা হয়।  কারণ লাইফরিস্ক অন্যদের তুলনায় এখানে বেশি থাকে।

দ্য ওয়াল: খরচ কতটা হতে পারে?

ডঃ রামানা: এক থেকে দেড় লাখ টাকা থেকে শুরু করে জটিলতা অনুযায়ী বাড়তে পারে খরচ।  এখন যে নতুন পদ্ধতি এসেছে হার্নিয়া অপারেশনের ক্ষেত্রে, তাতে হার্নিয়া বা অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড আটকাতে যে “ফরেন বডি” বা জাল লাগানো হয় তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা কম।  তাই খরচ সাধারণ হার্নিয়া অপারেশনের চেয়ে বেশি।

জানুন ডাক্তারবাবু কী বলছেন—-

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Shares

Comments are closed.