শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

কিছু নিয়ম মেনে, কিছু সাবধানতায় কীভাবে এড়াবেন হার্ট অ্যাটাক

হার্ট অ্যাটাক নিয়ে আমাদের নানা প্রশ্ন, নানা জিজ্ঞাসা থাকে। তবে ভয় না পেয়ে কীভাবে নিজের ও কাছের মানুষের হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে সে বিষয়েই ‘দ্য ওয়াল’ মুখোমুখি হল দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং সিনিয়র কার্ডিয়াক সার্জেন ডঃ সত্যজিৎ বসুর।  কী বললেন ডাক্তারবাবু— জানুন….

দ্য ওয়াল: হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বুঝবেন কী করে?
ডঃ বসু: সাধারণত বুকের মাঝে একটা চাপা, কমপ্রেসিভ চেস্ট পেন হবে।  অর্থাৎ একটা চেপে ধরা যন্ত্রণা এবং সঙ্গে প্রচুর ঘাম হবে।  এতটা ঘাম, যাতে পরে থাকা জামা পুরোটাই ভিজে যেতে পারে।  এই ব্যথা অনেক সময়েই বাঁদিকের চোয়াল, কাঁধ এবং হাতের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।  কারও আবার পিঠের দিকেও এই ব্যথা ছড়িয়ে যেতে পারে।  মুখ ফ্যাকাসে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে।  ব্লাড প্রেশার কমে যেতে পারে।  এসব দেখলে বুঝবেন অ্যাটাকের সিন্ড্রোম।

দ্য ওয়াল: এসময়ে সাধারণ মানুষের কী করা উচিত?
ডঃ বসু: বাড়িতে ডাক্তার ডেকে এনে ইসিজি করিয়ে রোগ নির্ণয়ের সিদ্ধান্তটা বোকামো এ সময়ে।  বরং সঙ্গে সঙ্গে দু’টো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট হাফ গ্লাস জলে গুলে খেয়ে নিন।  পারলে ৭৫ মিলিগ্রামের ৪ টে ক্লপিড্রোজেল ট্যাবলেট একসাথে খেয়ে নিতে পারেন।  এতে হার্ট অ্যাটাক থেকে মৃত্যুর সম্ভাবনা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যেতে পারে।  এরপরেই জিভের নীচে সরবিট্রেট দিয়ে কাছাকাছি যে হাসপাতালে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করার সুযোগ আছে সেখানে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে।  তখন প্রাইমারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে এ ধরনের রোগীকে বাঁচিয়ে দেওয়া যায় সহজে।

দ্য ওয়াল: কতক্ষণের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত?
ডঃ বসু: ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অর্থাৎ  ঠিক দু’ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে রোগীকে।  অর্থাৎ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিরিশ মিনিটের মধ্যে ক্যাথল্যাবে নিয়ে গিয়ে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে ফেলতে হবে। এভাবেই প্রচুর রোগীর প্রাণ বাঁচাতে পারি আমরা।

দ্য ওয়াল: ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা সেই দু’ঘন্টা পেরিয়ে গেলে কী হবে?
ডঃ বসু: আসলে এই সময়টা পেরিয়ে গেলে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যায়।  তাই শরীরের সেই ক্ষমতা থাকতে থাকতে এই কাজটি করে ফেলতে পারলে খুব ভালো হয়।

দ্য ওয়াল: অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই শোনা যায় তাঁদের হার্ট অ্যাটাক হলেও বুকে ব্যথা হয়নি, তাঁরা কী করে বুঝবেন?
ডঃ বসু: আসলে এটা সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক।  অনেকেরই হয়।  এদের অনেক সময়েই শ্বাসকষ্ট বা পেটে গ্যাসের মতো একটা কষ্ট হয়।  এদের ঘামও হয় না অনেক সময়ে।  তাই ডাক্তাররাও এই রোগীদের বুঝতে পারেন না, চিকিৎসায় দেরি হয়ে যায়।

দ্য ওয়াল: যে সব শহরে প্রাইমারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির সুবিধা নেই, সেখানকার মানুষজন কী করবেন?
ডঃ বসু: তাঁদের ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস করে রোগীকে কিছুটা স্টেবল অবস্থায় এনে তারপর কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল যেখানে এই ব্যবস্থা আছে সেখানে নিয়ে যেতে হবে।  আর এক্ষেত্রে অবশ্যই অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যেতে হবে রোগীকে।

দ্য ওয়াল: হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচতে কী কী করতে হবে?
ডঃ বসু: প্রথমেই ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা ছাড়তে হবে।  যে কোনও রকম তামাক যাঁরা খান, তাঁদের সেসব ছেড়ে দিতে হবে।  ডায়বেটিকদের সুগার লেভেল কমাতে হবে।  হাইপার টেনশনে ভোগেন যাঁরা তাঁদের প্রেশার ১২০/৮০-এর নীচে রাখতে হবে।  রক্তে LDL & Triglyceride এর মাত্রা ৭০ এর নীচে রাখতে হবে।  HDL> 45 mg/dl. এছাড়াও রিফাইনড সুগার আছে যেসব খাবারে সেগুলো একেবারেই খাওয়া চলবে না।  অর্থাৎ যে কোনো কোল্ডড্রিঙ্ক বা জাঙ্কফুড একদম ছোঁবেন না।  নিয়ম করে হাঁটুন বা ব্যয়াম করুন ৩০ মিনিট।

দ্য ওয়াল: কিন্তু হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও যাঁরা একটু হাঁটাচলা করলেই বুকে চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করেন, তাঁদের কী বলবেন?
ডঃ বসু: এগুলোকে বলা হয় ‘আনস্টেবল অ্যাঞ্জাইমা’।  এদের কিন্তু অনেক সময়েই হেভি খাবার খেলে বুকে ব্যথা হয়।  এক্ষেত্রে তাঁদের একটা অ্যাঞ্জিওগ্রাম করা উচিত এবং দেখে নেওয়া উচিত হার্টের ধমনী কত শতাংশ বন্ধ হয়ে আছে।  যেটাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে করোনারি আর্টারি ডিজিজ়।  সেক্ষেত্রে একটা আর্টারি বন্ধ থাকলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, আর তিনটি আর্টারি বন্ধ থাকলে বাইপাস সার্জারি করে নেওয়াই ভালো।

ডঃ বসু এই অ্যাটাক নিয়ে  কী কী বললেন শুনুন—

দ্য ওয়াল: তাহলে কি ব্লক থাকলেই অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি করতেই হবে?
ডঃ বসু: না, তেমন নয় বিষয়টা।  ৭০ শতাংশ ক্ষেএেই বহুদিন ধরে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা হতে পারে।  অনেক সময়ে ডাক্তাররাই দেখে নেন যে বাইপাস বা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি  না করেও ওষুধেই কাজ চালানো হয়।

দ্য ওয়াল: বিষয়টা আরেকটু সহজ করে বলুন, কিছুটা কনফিউশন হল তো…
ডঃ বসু: আসলে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা ভালো থাকলে বেশ কিছুদিন ওষুধেই কাজ হতে পারে।  তবে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে, তিনটি ধমনী বন্ধ থাকলে বা তিনটি ধমনীতেই ক্রিটিক্যাল ব্লকেজ থাকলে বাইপাস সার্জারি করিয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।  তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ডাক্তার যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই শেষ সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

দ্য ওয়াল: অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হলে কী ধরনের স্টেন্ট লাগানো উচিত?
ডঃ বসু: সাধারণভাবে ড্রাগ ইলিউটিং স্টেন্ট (DIS) লাগানো উচিত এবং দেখে নেওয়া উচিত সেই স্টেন্ট এফডিএ প্রুভড কি না।  অনেক সময়ে অনেক হাসপাতাল লাভ করার জন্য সস্তার স্টেন্ট লাগিয়ে লাভ করার চেষ্টায় থাকে।  দক্ষিণ ভারতে অনেক জায়গাতেই এই জিনিসটা  করা হয়।

দ্য ওয়াল: হার্টের রোগ থেকে বাঁচতে কী ধরনের খাবার খাওয়া অভ্যাস করা উচিত?
ডঃ বসু: চিনি অর্থাৎ কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।  ভাত রুটি চাল থেকে তৈরি মুড়ি, খই, চিঁড়ে; গম থেকে তৈরি সুজি ,ময়দা জাতীয় খাবার একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত।  ডিম, মাছ, মুরগীর মাংসে কোনো সমস্যা নেই।  প্রচুর পরিমাণে সব্জি , স্যালাড খাওয়া উচিত।  যাঁদের বংশগত হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস আছে, তাঁদের সবসময়েই সাবধান হতে হবে।

অতএব জীবনধারণের ক্ষেত্রে নিজেকে সংযত রাখুন আর হৃদয়কে সুস্থ রাখুন, কারণ এখানেই তো মনের মানুষের বাস।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

 

Comments are closed.