সকালে ঘুম ভাঙলেই শরীরে ব্যথা, ক্লান্তিবোধ, সতর্ক হোন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    হাড় নিয়ে সমস্যা তো আজকাল ঘরে ঘরে।  কারও বয়স তিরিশ বা চল্লিশের কোঠায়, কেউ বা আবার ষাট, সত্তর।  হাড়ের ব্যথা তো অনেক রকম, তবে অস্টিওপোরোসিস আসলে কী? আর এ থেকে বাঁচার রাস্তা আছে, নাকি এই হাড়ের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই-ই করে যেতে হবে? তা জানতেই ‘দ্য ওয়াল’কথা বলল বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জেন ডঃ সূর্য উদয় সিং-এর সঙ্গে।  কী বললেন ডাক্তারবাবু জানুন।

    দ্য ওয়াল: অস্টিওপোরোসিস কী?
    ডঃ সিং: এটা ক্যালসিয়াম-এর অভাবে হওয়া একটা রোগ।  হাড়ের বৃদ্ধির জন্য চাই ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার।  হাড় দুর্বল হয়ে গেলে হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেড়ে যায়।  স্বাভাবিক ভাবে হাড়ের ভর যা থাকে, তার তুলনায় কম ভর, এবং স্বাভাবিক নিয়মে যেটুকু হাড়ের ক্ষতি হয়, তার থেকে হাড়ের ক্ষয় বেশি হলে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।  বয়স্ক মানুষদের মধ্যে হাড় ভাঙার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এই অস্টিওপোরোসিসই।  যে হাড় সাধারণত বেশি ভাঙ্গে, তা হল মেরুদণ্ডের মধ্যে কশেরুকার হাড়, হাতের হাড়, এবং কোমরের হাড়।

    আমাদের শরীরে ২০৬টি হাড় রয়েছে।  এ হাড়গুলো জন্মের সময় নরম থাকে।  তারপর আস্তে আস্তে হাড়ে ক্যালসিয়াম জমা হয়ে হাড় শক্ত হয়।  শক্ত হওয়া বলতে, হাড়ের ডেনসিটি বা হাড়ের ঘনত্ব বাড়ার কথা বলা হয়েছে।  মানুষের জন্মের পর ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত হাড়ের ঘনত্ব বাড়তে থাকে।  তারপর ন্যাচারালি ঘনত্ব কমতে থাকে।  অর্থাৎ ক্ষয় হতে থাকে।  একটা নির্দিষ্ট বয়সে (৬০-৭০ বছর) হাড়ের ঘনত্ব অনেক কমে যায়।

    দ্য ওয়াল: এই রোগের লক্ষণগুলো কী কী?
    ডঃ সিং: সারা শরীর জুড়ে ব্যথা থাকে।  আর ক্লান্তিবোধ খুব বেশি থাকে।  সকালে ঘুম ভাঙলে প্রথম অনুভূতি হয় ব্যথা।  হাড় না ভাঙা পর্যন্ত সাধারণত কোন উপসর্গ দেখা দেয় না।  হাড় এতটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে যে, সামান্য জোর দিলে বা এমনিই ভেঙ্গে যায়।  হাড় ভাঙলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

    দ্য ওয়াল: এক্ষেত্রে হাড়ের কোনও পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হয় অস্টিওপোরোসিস হয়েছে কি না?
    ডঃ সিং:
     হাড়ের ঘনত্ব কমে যাবার নির্দিষ্ট মাপ রয়েছে।  এক্সরের মতো একটি মেশিনে পুরো বডিকে স্ক্যান করে BMD (BONE MINERAL DENSITY) TEST করা হয়।  এ পরীক্ষায় হাড়ের ঘনত্ব -২.৫ বা তার বেশি যদি হয়, তাহলে হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  এক কথায় হাই রিস্ক।  আর হাড়ের ঘনত্ব যদি ১.৫ থাকে, তাহলে রিস্ক মিডিয়াম।  আর কারও ০ থাকলে, তাদের হাড়ের অবস্থা ভালো রয়েছে।  এই BMD থেকে সহজে বোঝা যাবে, আপনি অস্টিওপোরোসিসের রোগী, না অস্টিওপিনিয়ার রোগী।

     দ্য ওয়াল: অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওপিনিয়া, স্বাভাবিক হাড়—তফাৎ কী কী?
    ডঃ সিং:
     যখন ক্যালসিয়াম কমলেও আলাদা কোনও লক্ষণ নেই, তখন তাকে বলে অস্টিওপিনিয়া।  আর পোরোসিস হলে ক্যালসিয়াম এতটা কমে গেছে যে সবসময়ে তার লক্ষণ বোঝা যায়।  আসলে অস্টিওপিনিয়া অস্টিওপোরোসিসের আগের স্টেজ।  অস্টিওপোরোসিসে কর্টেক্স পাতলা হয়ে যায়, হাড় অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে যায় যা সাধারণ হাড়ে হয় না।  অস্টিওপোরোসিস হওয়ার আগেই যদি কেউ চিকিৎসা শুরু করতে পারে, তাহলে সমস্যা অনেকটাই আয়ত্তে থাকে।

    দ্য ওয়াল
    : অস্টিওপোরোসিস কাদের হতে পারে?

    ডঃ সিং: যে কোনও কারো ক্ষেত্রেই হতে পারে।  তবে মহিলাদের বেশি হয়।  তাঁদের হরমোনের পরিবর্তনের জন্য এই সমস্যা পুরুষদের থেকে বেশি হয়। মেনোপজ়ের পরে হারের ক্ষয় বেশি হয়।  তবে ৭০ বছরের পরে পুরুষ মহিলাদের একই সাথে ক্ষয় হয়।  কিন্তু তার আগে যেহেতু মহিলাদের ক্ষয় বেশি হয়, তাই ওটা পরে আর সমান হয় না, নারী পুরুষের ক্ষেত্রে।
    তবে বংশগতভাবে কারও হাড়ের বয়সজনিত রোগ থাকলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।
    খাবারও একটি বিষয় এক্ষেত্রে।  হাড় ঠিক রাখতে রোজ খাবারে ২টি উপাদন থাকা জরুরি ।  একটি ক্যালসিয়াম, আরেকটি ভিটামিন ডি।  এই দুটি জিনিস যদি প্রয়োজন মতো না খাওয়া হয় তাহলে তাদের অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।  ক্যালসিয়াম মূলত দুধ, ছোট মাছ এবং ভিটামিন ডি ডিম, গাজর ও বিভিন্ন ফলের মধ্যে রয়েছে।  কিছু স্টেরয়েড ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে খেলে হাড়ের ঘনত্ব নষ্ট করে দেয়।  আর মহিলাদের অনেকেরই জরায়ুর অপারেশন করা হয়।  যাদের জরায়ু ফেলে দেওয়া হয়, তাদের পিরিয়ডস আগেই বন্ধ হয়ে যায়।  এ ক্ষেত্রে তাদের অল্প বয়সে অস্টিওপোরোসিস হওয়ার চান্স বেশি।  যারা সব সময় বসে থাকে, কম হাঁটাচলা করে, তাদের ক্ষেত্রেও অস্টিওপোরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে।  কায়িক পরিশ্রম যারা কম করেন, তাদের অস্টিওপোরোসিস হওয়ার চান্স বেশি রয়েছে।  সৌভাগ্যের বিষয় মোটা লোকদের অস্টিওপোরোসিস কম হয়ে থাকে।  খুব রোগাদের এই রোগের চান্স বেশি।


    আরও জানুন ডাক্তারবাবু কী বলছেন অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিও
    আর্থ্রারাইটিসের তফাৎ নিয়ে

    দ্য ওয়াল: কী ধরনের চিকিৎসায় এ রোগের ভালো ফলাফল পাওয়া যায়? অস্টিওপোরোসিস চিকিৎসার সর্বাধুনিক পদ্ধতি কেমন হতে পারে?

    ডঃ সিং: সর্বাধুনিক ভালো ফল পাওয়া মানে অভ্যাসে থাকতে হবে।  কিছু জিনিস সবসময়ে মনে রাখতেই হবে।  ডায়েট, এক্সারসাইজ়, ক্যালসিয়াম ঠিক রাখতে হবে।  ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলে এই অভ্যাস শুরু করে দেওয়া উচিত।  যাদের অস্টিওপোরোসিস হয়েছে তাদের ওষুধ তো দিতেই হবে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে কেউ বয়স্ক বা বৃদ্ধ হলে চেষ্টা করতে হবে লাঠি নিয়ে হাঁটতে, উঁচু-নিচু জায়গা এড়িয়ে চলতে, পিচ্ছিল-ভাঙা জায়গা এড়িয়ে চলতে। বাথরুম, করিডরে আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে সবসময়ে।  বাথরুম সব সময় শুকনো রাখতে হবে, কারণ পিচ্ছিল হলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  এছাড়া সিঁড়িতে ওঠা-নামার সময় ধরে ধরে নামতে-উঠতে হবে।

    দ্য ওয়াল: হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা অস্টিওপোরোসিস চিকিৎসায় কেমন ফলাফল দেয়? এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?

    ডঃ সিং: যে হেতু ক্যালসিয়ামকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্যালসিয়াম তাই এক্ষেত্রে হরমোন দেওয়া হতে পারে।  তার সাইড এফেক্ট আছে, ব্যালান্স করে চলতে হবে।  ডাক্তারকে দেখিয়ে তবেই এভাবে চলা যেতে পারে।  হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা মহিলাদের দেওয়া হয়।  বিশেষ করে মহিলাদের মাসিকের পর যাদের অস্টিওপোরোসিস শুরু হয়।  এছাড়া অপারেশন করে যাদের জরায়ু ফেলে দেওয়া হয়েছে, তাদের হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া হয়।  সাধারণত এক্ষেত্রে ওষুধের তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।  তবে ক্যানসার, হাই প্রেশার, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস থাকলে সমস্যা হয়।  তাই ডাক্তারের সাথে কথা না বলে হরমোন থেরাপি করা যাবে না।

    দ্য ওয়াল: এ রোগের চিকিৎসার মেয়াদ কতদিন হতে পারে? চিকিৎসার পর রোগী কি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন?

    ডঃ সিং: অপারেশনের জায়গা থাকে না কোনও।  পুরোটাই মেডিকেশনের উপর থাকে।  অন্য কোনও রেগ সঙ্গে থাকলে অবশ্যই বেশি সময় লাগে সারতে।  তবে মনে রাখতে হবে, এই রোগ পুরোটা সেরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।  অন্তত ২-৩ বছর তো লাগবেই।  তারপর হাড়ের ঘনত্ব দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।  তখন হয়তো ওষুধের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয় অনেক ক্ষেত্রেই।  প্রতি বছর পরীক্ষা করে সেটা নজরে রাখতে হবে।  সাধারণত বাচ্চাদের রোগ নয় এটা, বয়স্কদের হয়।  তাই পুরোপুরি কখনওই সারে না।  সারা জীবনই চেষ্টা করে যেতে হয় সঠিক এক্সারসাইজ় করে নিজেকে ঠিক রাখার।

    সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More