বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

যজ্ঞের আগুন কী ভাবে বদলে গেল আকাশপ্রদীপে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুপুরের পর থেকেই ম্লান হয়ে আসে সূর্যের তেজ।  দৃষ্টি ঘোলাটে করে দেয় হিমেল সন্ধ্যায় বাতাসে জমে যাওয়া শিশির।  আকাশে দৃষ্টি না পৌঁছলেও গৃহস্থের বাড়ির ছাদে একে একে জ্বলে ওঠে লাল-নীল-হলুদ আলো।  কোথাও বাঁশের, কোথাও বা লোহার যষ্টির মাথায় টুনি-আলো লাগানো।  এই আলো দেখেই নাকি কার্তিক মাস জুড়ে লৌকিক জগতে নেমে আসেন বিদেহীরা।  বিশ্বাস তো তাই বলে।  কিন্তু কী ভাবে এল আকাশপ্রদীপ? গোড়ায় তা দেখতে কেমন ছিল?

বড়জোর দুই দশক হবে, তখনও বিদ্যুতের খুঁটি গিয়ে পৌঁছায়নি বাংলার অনেক গ্রামে।  সেখানে দেখা যেত, আশ্বিন মাসের শেষেই একটা বাঁশ বেঁধে দেওয়া হত শক্ত করে।  তারপরে পুরো কার্তিক মাসভর দিনের আলো ফুরোলেই তার ডগায় আটকে দেওয়া হত চৌকো লণ্ঠন, শিখা যথাসম্ভব কমিয়ে।  সকাল হলেই নামিয়ে নেওয়া হত সেই লণ্ঠন।

দীপাবলিতে গৃহস্থের ঘরে ঘরে জ্বলে প্রদীপ।

বিদ্যুতের আলো, লণ্ঠন, প্রদীপ… একটা কিছু বাদ পড়ে গেছে মাঝে।  সেটা দেখা যায় এখনও।  সেই ট্র্যাডিশন সত্যিই চলছে বারাণসীতে।  লণ্ঠনের যুগ আর প্রদীপ, এই দুয়ের মাঝের সময়টা আজও ধরে রেখেছে বারাণসী।

মণিকর্ণিকা ঘাট থেকে দশাশ্বমেধ ঘাট ছাড়িয়ে অসি ঘাটের দিকে আরও এক কি দেড় ফার্লং… ঘাটের ধারে, মন্দিরের দেওয়াল থেকে দাঁড়িয়ে থাকে বিশাল বিশাল বাঁশ, উচ্চতা তার মাথা নুইয়ে দিয়েছে অনেকটা।  কোনও কোনও বাঁশ উঠেছে মন্দিরের মাথা ছাড়িয়ে।  বাঁশের তৈরি ঢাকা দেওয়া ফুলের সাজির মধ্যে একটা প্রদীপ বসিয়ে সেটি জ্বালিয়ে ঢাকা দিয়ে দেওয়া হয়।  তার পরে পতাকা তোলার মতো ধীরে ধীরে সেটিকে বাঁশের ডগায় তুলে দেওয়া হয়।  সারারাত ধরে আকাশের তারার পানে চেয়ে জ্বলতে থাকে প্রদীপ।

বারাণসীর ঘাটে এখনও জ্বলে এমন আকাশপ্রদীপ।

ছেলেবেলায় অনেকেই শুনেছেন, নিকটজন মারা গেলে তাঁরা নাকি তারা হয়ে যান।  তাই কি তারার পানে চেয়ে জ্বলতে থাকে আকাশপ্রদীপ? প্রদীপ কি শুধু ঘিয়েই জ্বলে? না কি অভাবে বনস্পতিও চলে?

যতদূর জানা গেছে, প্রদীপের চল ছিল না বৈদিক যুগে।  সে ছিল যাগযজ্ঞের যুগ। চতুষ্কোণ হোমাধারে জ্বাজ্বল্যমান আগুনে ঘৃতাহুতি দিতেন ব্রাহ্মণরা।  সেই ঘি খেয়েই নাকি অরুচি হয়েছিল স্বয়ং ব্রহ্মার, তার জেরে খাণ্ডবদহন… সে অন্য কাহিনি।  তবে সেই আগুনই একদিন এল গৃহস্থের বাড়িতে, প্রদীপ হয়ে।

শুধু ঈশ্বরের উপাসনা ও রীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, প্রদীপ এখন জ্বলে অলঙ্করণের জন্যও

সন্ধ্যায় তুলসীতলায় জ্বলল প্রদীপ।  প্রকৃতি যখন ঈশ্বররূপে মূর্তিতে ধরা দিল, তখন সেই মূর্তির সামনে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে আহুতি দেওয়া বন্ধ হল না, কিন্তু পিদিমও নিভল না, বরং কখনও তা হল পঞ্চপ্রদীপ, কখনও কর্পূরের আগুন, কখনও জাগপ্রদীপ।  ম্লান হয়ে এল যজ্ঞের আগুন।  খড় নেই এমন প্রতিমার পুজোয় যজ্ঞের আগুন আজকাল আর জ্বলতে দেখা যায় না।

বদলেছে পুজোর রীতিও: যজ্ঞের আগুনের পাশেই জ্বলছে প্রদীপ

ব্রাহ্মণ ও গোয়ালার ঘরে ঘিয়ের অভাব ছিল না, তাই তাদের ঘরে ঘিয়ের প্রদীপই রয়ে গেল অনেক দিন।  কলুর ঘরে জ্বলল তেলের প্রদীপ।  অনেক পরে যখন প্রদীপ হয়ে গেল লণ্ঠন, তখন ইন্ধন বদলে গেল কেরোসিনে।  আকাশপ্রদীপের মতো লোকাচারে স্থান হল প্রাণিজ তেলের।  শতাব্দীর মাঝামাঝি বনস্পতির চল হল, কিন্তু ঠাকুরঘরে তার আর ঢোকা হল না।  নিদেনপক্ষে রেড়ির তেল (এখন যা ব্র্যান্ডেড ক্যাস্টর অয়েল) হলেও চলবে, কিন্তু বনস্পতি নৈব নৈব চ।

মহালয়ার আগে পিতৃপক্ষে তৃষ্ণার্ত বিদেহীরা আসেন জল পান করতে, উত্তরপুরুষদের হাত থেকে।  আর কার্তিকে তাঁরা খুঁজে নেন নিজের ঘর।  তবে যাঁরা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী নন; আত্মায় বিশ্বাস করেন না, তাঁদের জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। এই সময়ে, মানে হেমন্তের শুরুতে নানা ধরনের পোকার উপদ্রব বাড়ে।  ঘরে তো আলো জ্বালাতেই হয়, আর আলো জ্বালালেই তার চারদিকে ভিড় করে উড়তে থাকে পোকা, খাবারে উড়ে পড়ে।  ঘরে আলো জ্বালানোর আগেই যদি বাইরে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে পোকা ঘরে আসবে না এমন নয়, তবে সংখ্যা কমবে।  তাই হয়তো ধর্মের মোড়কে শুরু হয়েছিল আকাশপ্রদীপ জ্বালানো।

দীপাবলির আলোর রোশনাই একরাত মাত্র থাকে, তার আগে-পরে মাসভর তারার পানে চেয়ে একাকী জ্বলতে থাকে আকাশপ্রদীপ, কুয়াশায় মুখ ঢেকে।

Comments are closed.