‘ভগবানের আপন দেশ!’ ৩৮৮ জন করোনা আক্রান্তের মধ্যে ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন ২১৮ জন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এপর্যন্ত সেরাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৮৮। তার মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ২১৮ জনই। মৃতের সংখ্যা আটকে রয়েছে ৩-এ। বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের যে শেষতম আপডেট পাওয়া গিয়েছে, তাতে এই তথ্যই রয়েছে কেরল সম্পর্কে। সারা দেশে যখন করোনা সংক্রমণ ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী, মৃত্যুর খবরও প্রতিদিনই মিলছে একাধিক করে, তখন এই রাজ্যটি যেন উদাহরণ তৈরি করছে ইতিবাচক লড়াইয়ের।

অথচ, এ কথা না বললেই নয়, ভারতের প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত করা গিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের এই ছোট রাজ্যটি থেকেই! চিনের উহান থেকে আসা এক ছাত্রের দেহে ধরা পড়েছিল সংক্রমণ। সেই থেকেই আক্রান্ত হন আরও কয়েক জন। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যটি ভারতের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়।

ক্রমে দেশের অন্য নানা রাজ্যে বাইরে থেকে দেশে ফেরা মানুষদের মাধ্যমে সংক্রামিত হতে থাকেন অনেকে। কয়েক দিনের মধ্যে এ সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে পৌঁছেছে ১০ হাজার ৮২৪-এ। মারা গেছেন ৪২০ জন। কিন্তু এসবের উল্টোদিকে কেরলের পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উল্টো পরিবর্তন হয়েছে। আক্রান্তের হিসেবে আর প্রথম তিনেও নেই কেরল। এপ্রিল মাসে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা আগের থেকে বেশ কমেছে। অন্যদিকে আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সুস্থ হয়েছেন ইতিমধ্যেই।

কিন্তু মাত্র দু-আড়াই মাসের ব্যবধানে সারা দেশের এই ছবিতে কেরল কী করে আলাদা হয়ে উঠল? কী করেই বা রুখে ফেলল ভয়াল সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি? শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ‘কেরালা মডেল উচ্চ প্রশংসিত’। এর কারণ অনুসন্ধান করলে অনেক তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। যার মধ্যে দু’টি কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হল, টেস্টিং। কোনও মানুষের সংক্রমণ আছে কিনা তা খুঁজে বার করতে অনন্য চেষ্টার পরিচয় দিয়েছে এ রাজ্যের প্রশাসন। যা রাজ্যকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে করোনা যুদ্ধে। এবং দ্বিতীয়টি হল, অভিজ্ঞতা। এই দ্বিতীয় কারণটির কথা উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেকে শৈলজা।

কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেকে শৈলজা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “যখনই এই ভাইরাসের কথা প্রথম শোনা যায়, তখন থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কোনও ঝুঁকির অবকাশ রাখিনি। করণ ২০১৮ সালে আর এক ভাইরাস ‘নিপাহ’ ছড়িয়েছিল আমাদেরই রাজ্যে। ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল সেবার। দেখেছিলাম, কত দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। সেই অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে এবার আমরা অনেক আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে কীভাবে করোনার মোকাবিলা করা হবে। তাই জানুয়ারির শেষ দিকে যখন প্রথম বিমানটি উহানে আটকে পড়া কেরালাবাসীদের নিয়ে এখানে নামল, আমরা প্রস্তুত হয়েই ছিলাম।”

সেই প্রস্তুতির ফলেই বিমানবন্দরে প্রত্যেকের তাপমাত্রা মাপা হয়। যাঁদের সামান্যতম উপসর্গও দেখা যায়, তাঁদেরই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু তবু শেষ রক্ষা হয়নি। ওই বিমানেই এসেছিলেন উহানে মেডিক্যাল পড়তে যাওয়া এক ছাত্র, যিনি ভারতে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনা আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হন।

প্রথম করোনা আক্রান্তের সন্ধান পাওয়ার পরেই কেরলের রাজ্য সরকার বিমানবন্দরগুলিতে আরও কড়াকড়ি শুরু করে দেয়। ইরান বা দক্ষিণ কোরিয়া-সহ ৯টি দেশ থেকে আগত বিদেশিদের বাধ্যতামূলক ভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো শুরু হয়ে যায় ১০ ফেব্রুয়ারি থেকেই। শুধু তাই নয়, যেখানে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমা ১৪ দিন, সেখানে কেরলে এই সময় ২৮ দিন। কেরলের কোয়ারেন্টাইনে যারা ছিলেন বা আছেন, তাদেরও পছন্দমতো খাবার দেওয়া হয়েছে, ফ্রি ওয়াইফাই-এর সুবিধে দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে করা হয়েছে নিয়মিত কাউন্সেলিং। ফলে কোয়ারেন্টাইন ভেঙে পালানো, লুকিয়ে থাকা, তথ্য গোপন করা– এসব ঘটেনি সে রাজ্যে।

আরও পড়ুন: করোনা রুখতে মরিয়া, তাই ভোর থেকে মাঝরাত অক্লান্ত দৌড়ঝাঁপ কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজার

আর এই সব সাবধানতার পাশাপাশিই করা হয়েছে আগ্রাসী টেস্টিং। হু প্রথম থেকেই বলেছে, করোনাকে জব্দ করতে লকডাউন জরুরি হলেও, তা যথেষ্ট নয়। লকডাউন করে সময়টা হাতে পাওয়া মাত্র, যাতে সংক্রমণ আর না ছড়ায়। কিন্তু সেই সময়টায় যদি ব়্যাপিড টেস্ট করে আক্রান্তদের খুঁজে আইসোলেট করা শুরু না হয়, তাহলে কোনও লাভ নেই। কেরল সরকার সেটাই করেছে।

প্রথমে তো বাইরে থেকে আসা সমস্ত রাজ্যবাসীর উপর কড়া নজর রাখা হয় এবং সামান্যতম উপসর্গ মিললেই টেস্ট করানো হয়। তার পর থেকে কোনও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য যাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের খুঁজে বার করে টেস্ট করা হয় বাধ্যতামূলক ভাবে। রীতিমতো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো কাজ ছিল এটি। প্রশাসনিক টিম তৈরি করে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। একজন করে অফিসার এক একটি এলাকার দায়িত্বে, তাঁর সঙ্গে আরও ১৭ জন বিশেষজ্ঞ।

আর এসবের পাশাপাশি নিরন্তর ছুটে চলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজা। একদম প্রথম থেকেই সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়েছেন সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে। কোনও দিন গন্তব্য হাসপাতাল তো কোনও দিন নিজের দফতর। সকালের বৈঠক সেরে এক এক দিন এক এক জেলায় ছুটছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন নিজেই। যাতে বাড়তি বিড়ম্বনা না হয়। বিকেলের মধ্যে ফিরে এসেছেন দফতরে। তার পরে ফের বৈঠক। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই গোটা পরিকল্পনার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, “উই হোপড ফর দ্য বেস্ট বাট প্ল্যান্ড ফর দ্য ওয়ার্স্ট”।

ঠিক সেটাই হচ্ছে এ রাজ্যে। তাই একদিকে ভাইরাস মোকাবিলার চ্যালেঞ্জের সঙ্গেই অন্যদিকে চলেছে ব্যাপক প্রচারও। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যম হোক, বা রাস্তায় বড় করে লাগানো বিজ্ঞাপনই হোক। লেখা হয়েছে একটাই বাক্য, ‘ব্রেক দ্য চেইন’। সেই ব্রেক করার পথেই এগোচ্ছে কেরল। একই সঙ্গে কড়া এবং মানবিক– এই দু’রকম ভাবেই।

আরও পড়ুন: কেরল পারলে, বাকি দেশ পারবে না কেন?

রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ মঞ্জুর করছে কেরল সরকারই। পরিমাণ কুড়ি হাজার কোটি টাকা। এই রাজ্য দায়িত্ব নিয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদেরও। তাই সারা দেশ থেকে যখন শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার চেষ্টা নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও আশঙ্কার খবর এসেছে, তখন কেরলে বসবাসকারী ভিন্ রাজ্যের শ্রমিকদের রাখার জন্য অসংখ্য ক্যাম্প তৈরি করেছে কেরল। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাম্পগুলিতে সেইসব কর্মীদেরই মোতায়েন করা হচ্ছে সরকারের তরফে, যাঁরা এই শ্রমিকদের ভাষা বলতে পারেন। নির্দেশ, নিয়মকানুন আর কড়া অনুশাসনের বেড়াজালে মানবিকতা হারিয়ে যেতে দেয়নি এই রাজ্য।

ফলও মিলেছে সব মিলিয়ে। নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক কম। মৃত্যুও বাড়েনি। একের পর এক মানুষ সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছেন। এঁদের মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য এক দম্পতি, যাঁদের একজন ৯২ আর আর এক জন ৮৮ বছর বয়সি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজা বলেন, “এই দু’জনকে সারিয়ে তোলা আমাদের চিকিৎসকদের একটা বড় সাফল্য। বয়স্করাই বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছেন করোনায়। কিন্তু এঁরা দীর্ঘ চিকিৎসার পরে সেরে উঠেছেন। আমাদের রাজ্যে জনসংখ্যার ১৫% ই বয়স্ক। তাই তাদের মধ্যে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়, সেটাও আমাদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More