হেরেও জিতে গেলেন রাহুল! কী সেই রুদ্ধশ্বাস কৌশল-কাহিনী

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: কর্নাটক ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট ছিল আসন সংখ্যার বিচারে এগিয়ে মোদী-অমিত শাহ। পিছিয়ে রাহুল গান্ধী।  দিল্লি থেকে কলকাতা আলোচনা সেদিন একটাই – ১০৪ টি আসনে জিতেছে বিজেপি। ম্যাজিক সংখ্যা ১১২-র তুলনায় তা সামান্য কম ঠিক, কিন্তু সাত-আটটা বিধায়ক ভাঙিয়ে সরকার গড়ে ফেলা এখন অমিত শাহ-দের বাঁ হাতের খেলা। আবার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের অনেকেই শাপ-শাপান্ত শুরু করে দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধীকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিরে এসেছিল রাহুলের পাপ্পু উপাধি। কিন্তু তার পর সে সব অতীত করে দিয়ে শনিবার জিতলেন রাহুল গান্ধীই। কিন্তু কী ভাবে, বারো নম্বর তুঘলক লেনের দেওয়ালে কান রেখে জানতে পারল  দ্য ওয়াল।

    আরও পড়ুন: রাহুল কি এতই বোকা, বুঝলেন না জোটের মর্ম!

    কর্নাটকে ফল ঘোষণা হয়েছে ১৫ মে মঙ্গলবার। কিন্তু তার চব্বিশ ঘন্টা আগেই ১৪-র সকালে রাহুলের বাড়ি থেকে হঠাৎ ফোন যায় দলের পোড় খাওয়া চার নেতার বাড়িতে,- আহমেদ পটেল, গুলাম নবি আজাদ, অশোক গহলৌত এবং কে সি ভেনুগোপালের বাড়িতে। জরুরি মিটিং আছে। একবার আসতে হবে।

    কী ব্যাপার? রাহুল তাঁদের বলেন, বিজেপি-কে কর্নাটকে রুখতেই হবে। কংগ্রেস যদি একার ক্ষমতায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তা হলে জনতা দল সেকুলারকে নিঃশর্তে সমর্থন জানিয়ে দেব।

    বলা মাত্র কাজ।  জনতা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সে দিন বিকেলেই আগাম এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। তার পর বিকেলের বিমান ধরে ১৪ মে-র রাতেই বেঙ্গালুরু পৌঁছে যান গুলাম নবি আজাদ, অশোক গহলৌত ও কে সি ভেনুগোপাল।

    মেসেজ চলে যায় কংগ্রেসের পাঁচ সম্পাদকের কাছে। যাঁরা অঞ্চল ভাগ করে কর্নাটকে ভোটের দায়িত্বে ছিলেন। ওই পাঁচ হলেন, মধুযাক্ষী গৌড়, যশোমতী ঠাকুর, মানিক টেগোর, পি সি বিষ্ণুনাথ এবং সাকে শৈলজানাথ।  তাঁদের বলে দেওয়া হয় নিজের নিজের এলাকা না ছাড়তে। ভোটের ফল প্রকাশের পর যেই পরিষ্কার হয়ে যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার তুলনায় কম আসন পাচ্ছে বিজেপি, ওমনি সতর্ক হয়ে যান এই পঞ্চ পাণ্ডব।  নিজের নিজের এলাকার কংগ্রেস বিধায়কদের ফোন করে দ্রুত পৌঁছতে বলেন বেঙ্গালুরুতে।  প্ল্যান মতো দেবগৌড়াকে ফোন করে দেন সনিয়া গান্ধী। তার পর কালক্ষেপ না করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে চলে যান গুলাম নবি-অশোক গহলৌত। দেবগৌড়াকে বলেন, আপনার ছেলে কুমারস্বামীই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। আর হোটেলে নিজের ঘরে বসে অনবরত পাঁচ কংগ্রেস সম্পাদকের সঙ্গে আহমেট পটেল।

    আসল নাটক শুরু হয় এর পরই। ১৬ মে-র সকালে।  ভোটের ফল ঘোষণার দিন বিকেলেই আগাম কৌশলমতো সরকার গঠনের দাবি নিয়ে রাজ্যপাল বাজুভাই বালার সঙ্গে দেখা করতে চলে গিয়েছিলেন কুমারস্বামী।  কিন্তু ইয়েদুরাপ্পাও সরকার গঠনের জন্য দাবি জানাতে পারেন বুঝেই নড়ে বসেন কংগ্রেস নেতারা।  বেলা তিনটে নাগাদ প্রথমে রাহুলের বাড়িতে পরে দশ নম্বর জনপথে ডেকে নেওয়া হয় কপিল সিব্বল, চিদম্বরমকে। সেখানে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও। ঠিক হয় রাতেই  সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে কংগ্রেস। এবং কংগ্রেসের হয়ে মামলাটি লড়বেন দলের দুঁদে আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। কিন্তু কোথায় অভিষেক? রণদীপ সুরজেওয়ালা তাঁকে পাগলের মতো ফোন করতে থাকেন। ফোন নট রিচেবল। ফোন যায় অভিষেকের এক জুনিয়ারের কাছে। তাঁর মাধ্যমেই জানা যায়, একটি মামলার জন্য অভিষেক রয়েছেন চন্ডীগড়ে। কোনও রকমে তাঁকে পেয়েই পিটিশনের খসড়া তৈরি শুরু হয়ে যায়। এ ব্যাপারে বেঙ্গালুরুতে দলের পয়েন্টসম্যানের কাজ করেন কংগ্রেস নেতা এম বি পাতিল। ফোনেই তাঁর জুনিয়ার দেবদত্ত কামাতকে ব্রিফ দিতে শুরু করে দেন অভিষেক।

    কিন্তু তিনি চন্ডীগড় থেকে দিল্লি ফিরবেন কী ভাবে?  চন্ডীগড় বিমানবন্দর ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ট্রেনে দিল্লি এলে মধ্যরাত হয়ে যাবে। ঠিক হয় পিনজৌর থেকে চাটার্ড বিমানে উড়িয়ে আনা হবে তাঁকে। দশ নম্বর জনপথ থেকে এ জন্য ফোন যায় পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরেন্দ্র সিংহের কাছে। তিনিই চাটার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার সময় দিল্লি বিমানবন্দরে নেমে সোজা ১৫ নম্বর গুরুদ্বারা রেকাব গঞ্জ রোডে কংগ্রেসের ওয়ার রুমে পৌঁছে যান। সেখানে তখন অপেক্ষা করছিলেন পি চিদম্বরম, কপিল সিব্বল, বিবেক টাঙ্কা, রণদীপ সিংহ সুরজেওয়ালারা। আদালতে আবেদনের খসড়া তখনই চূড়ান্ত হয়।

    সেই মোতাবেক সাংবাদিকদের বার্তা দিতে সেখান থেকে চব্বিশ নম্বর আকবর রোডের উদ্দেশে রওনা দেন সিব্বল, চিদম্বর, টাঙ্কা ও সুরজেওয়ালা। কিন্তু অভিষেক যাননি। রাজ্যপাল ইয়েদুরাপ্পাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন আঁচ করে কংগ্রেস কিন্তু খসড়ায় সামান্য পরিবর্তন করেন।

    তার পর রাত সওয়া দশটা নাগাদ তিনি তাঁর জুনিয়র দেবদত্ত কামাতকে রওনা করে দেন সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে। সর্বোচ্চ আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে পিটিশন জমা দিয়ে রাতেই শুনানির আবেদন জানান। আদালত জানিয়ে দেয়, শুনানি হবে ৬ নম্বর কোর্ট রুমে। রাত দুটো নাগাদ। আরও ঘন্টা দেড়েক পর তাঁর নীতি বাগের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইন্ডিয়া গেটের অদূরে তাজ মান সিংহ হোটেলে আসেন সিঙ্ঘভি। সেখানে মাচান রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে নেন। তার পৌনে ২ টো নাগাদ তাঁর জুনিয়রদের নিয়ে পৌঁছে যান সুপ্রিম কোর্টে। ওদিকে আরও রুদ্ধশ্বাস কাণ্ডকারখানা তখন শুরু হয়ে গিয়েছে বেঙ্গালুরুতে।

    ১৫ তারিখ রাত থেকেই অন্তত দেড় ডজন কংগ্রেস বিধায়কের কাছে ফোন আসা শুরু হয়ে যায় বিজেপি থেকে।  বিজেপি-র মতিগতি বুঝতে পেরে রাতেই কংগ্রেস বিধায়কদের তাই বেঙ্গালুরুর উপকন্ঠে ইগলটন রিসর্টে পাঠিয়ে দেন গুলাম নবি। কিন্তু সে টুকু করেই থামেননি একদা সঞ্জয় গান্ধীর এই ঘনিষ্ঠ নেতা। বিধায়কদের দশ জনের গ্রুপে ভাগ করে, এক একটি গ্রুপের দায়িত্ব দেন এক-এক জন প্রবীণ নেতাকে। কড়া নজর রাখতে বলা হয় তাঁদের।

    এর মধ্যেই বিধায়কদের কাছে ফোন আসতে শুরু করে দেয় ঘনঘন। যখন কম বেশি প্রায় বিধায়ক ফোন আসার ব্যাপারে অভিযোগ করতে শুরু করেন, গুলাম নবি যোগাযোগ করে রাহুলের ঘনিষ্ঠ দিল্লির কিছু তরুণ নেতার সঙ্গে। তাঁরাই পরামর্শ দেন, বিধায়কদের বলা হোক যে তাঁরা যেন কল রেকর্ডিংয়ের জন্য ফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে নেন। কংগ্রেসের এক নেতার কথায়, সব ধরনের অফার আসতে থাকে বিধায়কদের কাছে। এমনকী এমনও বলা হয় আপনি বাড়ি পৌঁছনোর আগেই বাড়িতে টাকা পৌঁছে যাবে। বা রিসর্ট থেকে বেরিয়ে আসুন, বাইরে গাড়িতে পাঁচ কোটি টাকা রাখা আছে।

    এক সময় ঠিক করা হয়েছিল, বিধায়কদের বাসে বসিয়ে রাতেই নিয়ে যাওয়া হবে কোচিতে।  সে জন্য কোচিতে একটি পাঁচ তারা হোটেল ভাড়াও করা হয়েছিল। কিন্তু হোটেল মালিক দু ঘন্টার মধ্যেই পিছিয়ে যান। বলেন, তাঁর উপর চাপ আসবে বিজেপি-র থেকে। এর পরেও কোচি যাওয়া যেত। কারণ, ততক্ষণে কেরল কংগ্রেসের নেতারা কোচিতে অন্য একটি হোটেলে ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু দলের মধ্যে অনেকে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয় কোচিতে চাটার্ড ফ্লাইট নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবে না ডিজিসিএ। যদিও ডিজিসিএ পরে জানিয়েছিল, চাটার্ড ফ্লাইট যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু এর মধ্যেই ঠিক হয়ে যায় বিধায়কদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হবে হায়দরাবাদ। মজার ঘটনা হল, কর্নাটকের পুলিশ বিধায়কদের নিরপাত্তার ব্যবস্থা না করলেও রাজ্যের সীমা পর করতেই দেখা যায় তেলঙ্গনার পুলিশ এসকর্ট দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁরাই পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যায় হোটেলে।

    দলের এক নেতার কথায়, হোটেলে পৌঁছেও কম নাটক হয়নি। আস্থা ভোটের আগের দিন সকালে দেখা যায় এক জন বিধায়ক নিঁখোজ। গোটা হোটেল তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় তাঁকে। হোটেল কর্মীরাও তাঁর ফটো দেখা তাঁকে খুঁজতে নামেন। শেষমেষ দেখা যায় উনি সুইমিং পুলে নেমে গা জুড়োচ্ছেন। ব্যাপারটা জানতে পেরে হাসতে হাসতে সবার পেটে খিল ধরে যায়।

    রাহুল ঘনিষ্ঠ তেলঙ্গনা কংগ্রেসের ওই যুব নেতার কথায়, আসলে বিধায়কদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল। তাঁরা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে হাসি ঠাট্টা মস্করা আড্ডা দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। কারও ফোনে চোরাশিকারের জন্য বিজেপি-র ফোন এলেই অন্যরা চুপ করে যেতেন। যাতে কল রেকর্ড ঠিক মতো করা যায়। এ ধরনের অডিও টেপ এখন গুচ্ছ রয়েছে কংগ্রেসের কাছে।  বিজেপি-র এই নির্লজ্জ হানাদারিই আসলে কংগ্রেস বিধায়কদের আরও ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছিল। একমাত্র শত চোখের প্রহরা এড়িয়ে গলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন এক জন বিধায়ক,- আর শঙ্কর। কিন্তু সিড্ডারামাইয়া তাঁকে ফোন করে ধমক দিতেই তিনি গুটি গুটি পায়ে ফিরে আসেন।

    এর পর কর্নাটক বিধানসভায় আস্থা ভোট পর্ব, ইয়েদুরাপ্পার ইস্তফা গোটা দেশ দেখেছে।  শেষ হাসি হেসেছেন রাহুল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More