কুমির ধরার টোপ চাই! তাই কালো চামড়ার শিশুদের ক্ষতবিক্ষত করে বসিয়ে রাখা হতো জলের ধারে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯২৩ সালের টাইম ম্যাগাজ়িনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ রীতিমতো হইহই ফেলে দিয়েছিল মার্কিন মুলুকে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য গণমাধ্যম সে সময়ে খুব জোরালো না হওয়ায়, সে হইহই-এর জের খুব বেশি দূরে পৌঁছয়নি। ওই প্রবন্ধে লেখা হয়েছিল, ১৮০০ শতকে ফ্লরিডায় ক্রীতদাস হিসেবে ব্যবহৃত কৃষ্ণাঙ্গদের ছোটছোট শিশুসন্তানগুলিকে ক্ষতবিক্ষত করে বসিয়ে রাখা হতো জলের ধারে। তাদের রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে শিকার করতে আসত কুমির, আর তখনই অদূরের ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে থাকা শিকারিরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিত কুমিরটিকে। কখনও আবার অপেক্ষা করা হতো, কখন শিশুটিকে খেতে শুরু করবে কুমির। কারণ খাওয়ার সময়ে কুমিরের সম্পূর্ণ মনোযোগ শিকারের উপরে থাকায়, তাকে মারতেও সুবিধা হতো।

    এ প্রবন্ধ পড়ে শিউরে উঠেছিল পাঠককুল। যদিও প্রশাসন খারিজ করে দিয়েছিল এই ধরনের দাবি। তবে ঘটনাটি যে মিথ্যে নয়, তা জানা যায় জিম ক্রো মিউজিয়ামে একটি দুর্লভ ছবি পাওয়ার পরে। ছবিটি বহু আগে ফ্লরিডার কোনও এক ফোটোগ্রাফারের তোলা ছিল বলে জানা যায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ৯ কৃষ্ণাঙ্গ শিশু বসে আছে। পরনে পোশাক নেই তাদের। আর তাদের সেই ছবির নীচে লেখা ‘অ্যালিগেটর বেট’। অর্থাৎ, কুমিরের টোপ।

    এই সেই ছবি। অ্যালিগেটর বেট।

    তবে টাইম ম্যাগাজ়িনেরও আগে, ১৯০৮ সালে ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত হয়েছিল নিউ ইয়র্কের চিড়িয়াখানার অন্য একটি ঘটনার কথা। তাতে লেখা হয়েছিল, চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা লোকেরা যাতে কুমির দেখতে পান তাই কুমিরগুলিকে তাদের শীতের সময়ে যে জলাশয়ে রাখা হয় সেখান থেকে তুলে অন্য জলাশয়ে সরানোর দরকার পড়েছিল। কিন্তু কুমিরগুলি কিছুতেই আসছিল না, তাই ওই চিড়িয়াখানার এক কর্মী দু’টি কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন।

    সে বারেও অবশ্য চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সাফাই দিয়েছিলেন, শিশুগুলোর কোনও ক্ষতি হয়নি এই ঘটনায়। তাঁরা কুমিরের টোপ হিসেবে শিশুর খোঁজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তাই দেখে ওই দুই শিশুর মা-ই নাকি তাদের কাছে শিশুগুলিকে বিক্রি করেছিলেন এই কাজে ব্যবহার করার জন্য। বিনিময়ে ২ ডলার নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সে সময়ের কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান মহিলারা পড়াশোনাই জানতেন না। তা হলে কী ভাবে তাঁরা বিজ্ঞাপন দেখে বাচ্চা বিক্রি করতে এলেন! এই প্রশ্নের অবশ্য কোনও জবাব দেননি কর্তৃপক্ষ।

    তবে গবেষকেরা বলছেন, এই ঘটনা মোটেই মিথ্যে নয়। কারণ ১৮০০-১৯০০ সালে কুমিরের চামড়ার ব্যাপক চাহিদা ছিল আমেরিকা ও ইউরোপে। কুমিরের চামড়া দিয়ে জুতা, জ্যাকেট, বেল্ট এবং অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করা হতো। তার পরে অনেক দাম দিয়ে বিক্রি করা হতো সে সব। কুমিরের চামড়ার ব্যবসা সে সময়ে বিশেষ লাভজনক ছিল। কিন্তু চামড়া ছাড়ানোর জন্য তো আগে কুমির মারতে হবে। সেই কুমির শিকার করা মোটেই সহজ ছিল না।

    এই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখত আমেরিকা ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষেরা। নিজেদের সর্ব ক্ষণের কাজ করানো ও নানা বিধ অত্যাচার করার ধারা পালন করা হতো ক্রীতদাসদের উপর। তাই কুমির ধরার জন্যও কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের টোপ হিসাবে ব্যবহার করত লোভী ও অত্যাচারী আমেরিকানরা। ছোট শিশুদের রক্তাক্ত করে, টোপ হিসেবে রেখে, কুমির শিকার করত তারা। তথ্য বলছে, আমেরিকার লুইজিয়ানা এবং ফ্লরিডায় এই প্রথা বিশেষ ভাবে প্রচলিত ছিল।

    কারণ কুমির শিকার করতে গিয়ে জলে নেমে প্রায়ই মারা যেতে হতো শ্বেতাঙ্গদের। কখনও আবার কুমিরের কামড়ে হাত-পা খোয়াতে হতো তাদের। তাই শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান শিকারিরা ঠিক করে, কুমির শিকার করার জন্য কুমিরকেই টোপ দিয়ে ডাঙায় তুলবে তারা। তার পর আড়াল থেকে গুলি করে কুমিরকে ঘায়েল করবে। আর এই টোপ হিসেবেই ব্যবহার করা হতো কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের। তাদেরই বলা হতো ‘অ্যালিগেটর বেট’।

    তবে কুমির শিকার করার জন্য কিন্তু তারা চাইলে হাঁস, মুরগি, খরগোশ, ছাগল– এ সবও কাজে লাগাতে পারত। কিন্তু সেই সময়ে, এই পশুগুলো ছিল দামি। অন্তত পক্ষে কালো চামড়ার শিশুদের থেকে দামী। কারণ ইতিহাস বলছে, সে সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের কোনও মূল্যই ছিল না সমাজে। তাদের সন্তানদেরও মানুষ বলেই মনে করা হতো না। আর পাঁচটা পশুর মতোই দেখা হতো কৃষ্ণাঙ্গদের। তাই কুমিরের টোপ হিসেবে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুগুলোকেই বেছে নিয়েছিল অত্যাচারী আমেরিকানরা।

    সম্প্রতি আফ্রিকার একটি জার্নালে এই খবর ফের প্রকাশিত হয়েছে। তাতেই উঠে এসেছে টাইম ম্যাগাজ়িনের সেই প্রবন্ধের কথা। আরও এক বার আলোড়িত হয়েছে ইতিহাস। আফ্রিকার ওই জার্নালে বলা হয়েছে, এক সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপে যে কুমির শিকারের টোপ হিসেবে কালো চামড়ার শিশুদের ব্যবহার করা হতো, তা আর উড়িয়ে দেওআর উপায় নেই।

    বস্তুত, কালো চামড়ার মানুষদের উপর আমেরিকান ও ইউরোপিয়ানদের অত্যাচারের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তাদের ক্রীতদাস প্রথাও সর্বজনবিদিত। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই উঠে আসে অত্যাচারের ভয়াল, অসহনীয় সব বয়ান। কিন্তু সে সব কিছুকেই যেন ছাপিয়ে গিয়েছে সম্প্রতি সামনে আসা এই ঘটনা! শিশুদের ধরে, তাদের ইচ্ছাকৃত ভাবে ক্ষতবিক্ষত করে, জলের ধারে বসিয়ে কুমিরের জন্য অপেক্ষা করার কথা জেনে আঁতকে উঠছেন সকলে।

    যদিও গবেষকেরা বলছেন, কৃষ্ণাঙ্গদের অত্যাচারের ইতিহাস এতটাই নৃশংস। একটা সময় পর্যন্ত বিশ্বের সামনে নির্মিত হয়েছে কেবল সাদা চামড়ার মানুষদের লেখা ইতিহাসই। এখন বদল এসেছে। কৃষ্ণাঙ্গদের গলার স্বর পৌঁছচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। তাই কয়েনের উল্টো দিকটা আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More