৭ বছর আগে বেইরুটের বন্দরে জোর করে ভিড়েছিল অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বোঝাই রুশ জাহাজ! তারই মাসুল গুনতে হল আজ

৩৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাত বছর আগের একটা ভুলের জন্য এত দিন পরে ভয়াবহ মাসুল গুনতে হল লেবাননের রাজধানী বেইরুটকে। ২০১৩ সালে রাসায়নিক বোঝাই রাশিয়ান কার্গো জাহাজ বেইরুটের বন্দরে অপরিকল্পিত ভাবে এসে না ভিড়ত, তাহলে আজ এই চরম বিপর্যয় ঘটত না। বেইরুট বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে এমনই বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।

২০১৩ সালের ওই জাহাজটির নাম রোসাস। তার ক্যাপ্টেন বরিস প্রোকোশেভ বয়ান দিয়েছেন, “সেদিনের লোভের জন্যই আজ এমন ঘটনা ঘটল।” তাঁর দাবি, অতিরিক্ত মাল সংগ্রহ করার জন্য লেবাননে থামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাদের। ২৭৫০ টন বিস্ফোরক রাসায়নিক অ্যামোনিয়াম নিয়ে জর্জিয়া থেকে মোজাম্বিক যাচ্ছিল রোসাস। আচমকাই নির্দেশ আসে, জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে বেইরুটের বন্দরে ভেড়াতে হবে। কারণ সেখান থেকে কিছু রাস্তা নির্মাণের সামগ্রী সংগ্রহ করে, মোজাম্বিক যাওয়ার পথে জর্ডনের আকাবা বন্দরে নামাতে হবে তাদের। মোজাম্বিকে পৌঁছনোর কথা ছিল ওই বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট।

কিন্তু অপরিকল্পিত ভাবে জাহাজ ভিড়িয়ে সমস্যা তৈরি হয় বেইরুট বন্দরে। কারণ সেখান থেকে সামগ্রী সংগ্রহ করা নিয়ে আইনি জটিলতার মুখে পড়ে জাহাজটি। শেষমেশ বেইরুট বন্দরেই আটকা পড়ে যায় রোসাস! ৭০ বছরের প্রোকোশেভ বলছিলেন, “অসম্ভব একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। গোটা জাহাজ আটকা পড়ে যায় বন্দরে। আমি কিছুতেই রাজি হইনি জাহাজ ছেড়ে চলে আসতে।”

এই সেই জাহাজ, রোসাস। বেইরুট বন্দরে তোলা ফাইল ছবি।

কিন্তু শেষমেশ লেবাবন কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে আটকেই রেখে দেয়। পাশাপাশি বাজেয়াপ্ত করা হয় জাহাজে ভর্তি সেই বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। ১১ মাস এভাবেই কাটে। সমাধান হয়নি পরিস্থিতির। ফলে বাধ্য হয়ে ওই জাহাজকে বেইরুট বন্দরে রেখেই চলে যান ক্যাপ্টেন ও কর্মীরা। তা নইলে, তাঁদের গ্রেফতার করা হতো।

Beirut's accidental cargo: How an unscheduled port visit led to ...

পরে জানা যায়, জাহাজ থেকে ওই বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নামানো হয়। রাখা হয় বন্দরের ১২ নম্বর হ্যাঙ্গারে। সেই হ্যাঙ্গারটি মূল শহরে ঢোকার জন্য ব্যস্ততম সড়কের ঠিক ধারেই অবস্থিত। সমস্ত মাল নামানোর পরে ফিরিয়ে দেওয়া হয় জাহাজটি।

এর পরের বছর, ২০১৪ সালের ২৭ জুন লেবানন কাস্টমসের পরিচালক শাফিক মেরহি এই বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য রাশিয়ার কার্গো কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি পাঠান। এর পরের তিন বছরে আরও পাঁচটি চিঠি দেওয়া হয়। জানা গেছে, মূলত তিনটে প্রস্তাব দেওয়া হয় এই কার্গো জাহাজের মালিকের কাছে। প্রস্তাবগুলি হল, ১. নাইট্রেট সরিয়ে নেওয়া, ২. লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে পুরোটা হস্তান্তর করা, ৩. লেবাননের বেসরকারি বিস্ফোরক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া।

অভিযোগ, এই চিঠিগুলোর কোনও জবাব আসেনি কখনও। শেষমেশ ওই হ্যাঙ্গারেই থেকে যায় পুরো রাসায়নিকের স্তূপ। ছ’মাস আগেও বন্দরের গুদামের সেই ১২ নম্বর হ্যাঙ্গার পরিদর্শন করে আধিকারিকরা জানিয়েছিলেন, কার্যত ‘ভাসমান বোমা’ মজুত করা রয়েছে বেইরুটে। এটা যদি সরিয়ে না নেওয়া হলে পুরো বেইরুট উড়ে যেতে পারে।

Beirut explosion: 16 people arrested over Lebanon port blast | The ...

সেটাই হল শেষমেশ। গত মঙ্গলবার, সেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুদ হওয়ার সাত বছর পরে ঘটে গেল দুর্ঘটনা। আগুন লেগে গেল বিপুল পরিমাণ ‘ভাসমান বোমা’য়। ফলস্বরূপ ছারখার হয়ে গেল গোটা এলাকা। অন্তত ১৫০ জন প্রাণ হারালেন, আহত হলেন পাঁছ হাজারেরও বেশি মানুষ। কয়েক লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। ধসে পড়েছে বড় বড় বহুতল। বেইরুটের বন্দর এলাকা ছিন্নভিন্ন করে দিল সাত বছর আগের একটি ভুল পদক্ষেপ।

গোটা ঘটনার কথা সামনে আসার পরে কার্যত ক্ষোভে ফুঁসছে বেইরুটবাসী। কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কোনও জঙ্গিযোগও নেই। শুধুমাত্র প্রশাসনের তরফে চূড়ান্ত একটা গাফিলতির কারণে গোটা বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এর ফলে সরকারের ওপরে ক্ষোভ যে বাড়বেই তা বলাই বাহুল্য। ক্যাপ্টেন প্রোকোশেভও বলছেন, “সাংঘাতিক বিস্ফোরক ছিল জাহাজ ভর্তি। ওটা ওভাবে আটকে রাখা উচিত হয়নি কখনোই।”

এই ঘটনার কথা সামনে আসার পরে ক্যাপ্টেন প্রোকোশেভ তাঁর মতামত ও অভিজ্ঞতা জানালেও, গোটা ঘটনাটি অস্বীকার করা হয়েছে মোজাম্বিকের তরফে। তারা নাকি জানতই না, তাদের দেশের দিকে আসা জাহাজ এভাবে বেইরুটে আটকা পড়ে গেছিল বিস্ফোরক-সহ।

This country is cursed.' Massive Beirut blast kills more than 70 ...

তদন্ত চলবেই। তবে বিপর্যয়ের অভিঘাত তাতে বিন্দুমাত্র কম হবে না। স্থানীয় এক ঘরহারা বাসিন্দার কথায়, “আমি জানি না, এই দুর্যোগ কী ভাবে কাটিয়ে উঠব, আপনাদের কী মনে হয় যে হিরোশিমার ঘটনা এর থেকেও ভয়াবহ ছিল না?”

কিন্তু এখনও যেটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটে বিস্ফোরণ হল কী ভাবে। সাধারণত, এতে বিস্ফোরণ হতে গেলে চরম তাপের প্রয়োজন। একটি সূত্র বলছে, সেদিন সম্ভবত কাছাকাছি কোনও এলাকায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল। কারণ সেদিনই বেইরুট পুরসভার নির্দেশে বন্দরের কাছে পৌঁছেছিল দমকলের একটি বাহিনী। তার পরেই ঘটে বিস্ফোরণ, এবং সেই থেকেই আর কোনও খোঁজ নেই দমকলেরও। ফলে এমনটা হতেই পারে, যে সেই আগুন থেকেই ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More