বুধবার, অক্টোবর ১৬

চার বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় মৃত নদীকে বাঁচিয়ে দিলেন ২০ হাজার মহিলা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মৃতপ্রায় একটা নদী, তাকে বাঁচাতে ২০০০০ মহিলার নিরলস প্রচেষ্টা চলেছে দীর্ঘ চার বছর ধরে।  তামিলনাড়ুর ভেলোরের নাগানধি নদী বেঁচে গেল অবশেষে।  সাথে বহু মানুষও বেঁচে গেলেন তীব্র জলকষ্ট থেকে।  তামিলনাড়ুর যে ২৪টি জেলা খরাপ্রবণ, তার মধ্যে অন্যতম ভেলোর।  এই ভেলোরের মানুষদের কাছে বেঁচে থাকার, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় জলের উৎস ছিল একমাত্র এই নাগানধি।  কিন্তু ১৫ বছর আগেই এই নদীটি শুকোতে শুকোতে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।  সাধারণ মানুষজন তীব্র জলকষ্টে বেঁচে থাকতে নিজেদের ধানি জমি খুঁড়তে শুরু করেন।  বেঁচে তো থাকতে হবে তাঁদের।  কীই বা করতেন তাঁরা!

আবার দক্ষিণ ভারতের থেকে শত মাইল দূরে ভারতের উত্তর দিকেও একই ছবি রয়েছে।  উত্তরাখণ্ডের পউরি গাড়ওয়ালের প্রায় ১০০ জন গ্রামবাসী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়েই নানা মাপের রিজ়ার্ভার তৈরি করতে পরিশ্রম করে চলেছেন।  এমনকি তাঁরা নিজেরা সই সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন, যাতে বর্ষার জল ধরে রাখা যায় এবং সকলেই জলের সমস্যা থেকে দূরে থাকতে পারেন।  আরামে বাঁচতে পারেন।

উত্তর ভারত হোক বা দক্ষিণ ভারত এই জায়গাগুলো বারবার খবরে আসে তাদের জলকষ্টের জন্য।  ভারতের কিছু জায়গায় এখনও কতটা জলের সমস্যা রয়েছে, কী করে সেখানকার মানুষরা দিন কাটান তা সারা বিশ্বের সামনে আসে এই ঘটনাগুলো থেকেই।  এক একটা জায়গার জল বাঁচানোর প্রচেষ্টাগুলোই তখন বাকিদের কাছে নিদর্শন হয়ে থাকে, উপায় হয়ে থাকে।  ভেলোরের ক্ষেত্রে ২০ হাজার মহিলার ৪ বছরের প্রচেষ্টায় ১৫ বছর আগে শুকিয়ে যাওয়া নাগানধিকে ২০১৮ তে আবারও স্রোতস্বিনী করে তোলা হয়েছে।  এক্ষেত্রে ৩৫০০ কুয়োর জল এবং প্রচুর নুড়ি পাথর ব্যবহার করা হয়েছে।  যাতে বর্ষার জল অগভীর খাতেও বয়ে চলতে পারে, এবং নদীটি বহমানতা পায়।

নাগানধি বাঁচাও প্রকল্পের ডিরেক্টর চন্দ্রশেখরণ কুপ্পান বলছেন, “কোনও নদীকে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলার জন্য শুধু তার বহমানতার দিকে নজর দিতে হয়, তা তো নয়।  নদীর গভীরতাও যাতে ঠিক থাকে সেদিকেও নজর দিতে হয়।  এক্ষেত্রে বৃষ্টির জলও যাতে মাটি শুষে নিয়ে জমিয়ে রাখে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তো বটেই।  তাই বৃষ্টি হলে সেটা এজাতীয় নদীর ক্ষেত্রে খুব কাজে দেয়। ” ২০১৪ সালে এই প্রকল্পটি শুরু হয়।  সাফল্য আসে ২০১৮তে।  এই নদী বাঁচাও প্রকল্পের পোশাকি নামও আছে একটা , Naganidhi Rejuvenation Project, an Art of Living Foundation (AOL) initiative.

শেষ দশকের হিসেব বলছে, ভেলোরের অর্ধেকের বেশি কৃষক জলের অভাবে গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন।  কারণ তাঁরা চাষের জল পাননি দীর্ঘদিন।  আর যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরা তাঁদের পরিবারের সাথে কোনওক্রমে এদিক ওদিক টুকটাক কাজ করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে।  আর এসময়েই AOL এর স্বেস্চ্ছাসেবকরা এসে তাঁদের পাশে দাঁড়ান।  ভেলোরের আগে কর্ণাটকের বেদবতী এবং কুমুদবতী নদীকেও এঁরাই পুনরায় নাব্যতা দিয়েছিলেন।

খুব একটা সহজ একেবারেই ছিল না কাজটা।  প্রথমেই AOL একটি টিম তৈরি করে নেয়, যে টিমের সদস্যরা প্রথমে স্যাটেলাইট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এলাকার ভূতত্ত্ব বিচার করে, জমি পরীক্ষা করে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মেপে কাজ করতে শুরু করেন।  কেন্দ্রীয় সরকার থেকে কাজের অনুমতি দেওয়ার পরেই স্থানীয় মহিলাদের মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গারান্টি অ্যাক্টে (MGNREGA) কাজ করানো শুরু হয়।  সেই মহিলাদের দৈনন্দিন রোজকারের উপায়ও হয়ে যায় সহজেই।

এই প্রকল্পে কর্মরত ৩২ বছরের নাথিয়া দড়ি বেয়ে বেয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন।  তিনি জানিয়েছেন, ভেলোরের কান্যায়মবাদি ব্লকের সালামানাথাম গ্রামে প্রায় ৩৬ টা কুয়ো খুঁড়েছেন তিনি।  যেগুলো বৃষ্টির জলে ভরে উঠেছে।  আর একবার সাফল্য আসায় তিনি বুঝেওছিলেন, এবার গ্রামে ফসলও ফলানো যাবে।  এক একটি কুয়ো প্রায় ২০ ফুট গভীর, ১৫ ফুট লম্বা এবং ৬ ফুট চওড়া।  এগুলো খুঁড়ে তৈরি করতে প্রায় ২৩ দিন করে লেগেছে ১০ জন শ্রমিকের।

নাথিয়া আরও বলছেন, “এখন আমাদের জমিতেই ধান ফলাতে পারব আমরা, এটা কয়েকদিন আগেও আমরা কল্পনা করতে পারতাম না।  রোজ আমাদের আয়ও হবে ২২৪ টাকা করে, আমরা যদি MGNREGA তে সই করে নিই।  ” এসব শুনে ভেলোরের কালেক্টর এস এ রামান বলছেন, এই প্রকল্পের সাফল্য ওঁদের উৎসাহ দিচ্ছে।

অন্যদিকে উত্তর ভারতের পউরি  গাড়ওয়ালের ১৩ বছরের ছাত্রী দীপা রাওয়াত এবং তার বন্ধু স্কুল শেষে বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য রিজ়ার্ভার তৈরি করতে মাটি খুঁড়ে চলে আজকাল।  সেখানকার সরকারি স্কুলগুলো প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকেই এই কাজে উৎসাহ দেয়।  বলা হয়েছে, এক একটি রিজ়ার্ভার যাতে অন্তত ২ ফুট গভীর হয় সেদিকে নজর দিতে।

পোখরার ব্লকপ্রধান সুরিন্দর সিং রাওয়াত বলছেন, “হিমালয়ের কাছে থাকা গ্রামগুলোতে মানুষের সচেতন হওয়া খুব জরুরি এখনই।  যাতে ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা জল সঞ্চয় করে রাখতে পারেন।  নইলে সমস্যা বাড়বে, সন্দেহ নেই।  এখানকার গ্রামগুলোতে জল দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, জলের উৎসও বেশ কম।  ফলে দিন দিন জল যত কমবে লোকজন চলে যাবেন এই এলাকা থেকে।  তাই গণ অভ্যুথ্থান ছাড়া এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির কোনও আশা নেই। ”

Comments are closed.