বাড়ি ভেঙে পড়ার শোকে মৃত্যু আরও এক বৃদ্ধের! থমথম করছে ধ্বংসস্তূপে পরিণত বৌবাজার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজের শহরেই ভিটেহারা হয়েছেন তাঁরা। সব কিছু ছেড়ে, রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন হোটেলে। তার পরে কেউ খবর পেয়েছেন, ছেড়ে আসা ঘর ভেঙে পড়ে যাওয়ার, কেউ বা আশায় বুক বেঁধেছেন তাঁর ঘর ভাঙবে না। বৌবাজার-কাণ্ডের এই দোলাচলের মধ্যেই ফের আরও এক জন বৃদ্ধের মৃত্যু হল বুধবার রাতে। এই নিয়ে দু’-দু’টো মৃত্যুর ঘটনার দায় কার, প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

৮৭ বছরের গণেশপ্রসাদ গুপ্তর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে দিলীপপ্রসাদ জানিয়েছেন, চলতি মাসের ১ তারিখে তাঁদের আচমকাই ছাড়তে হয় বৌবাজারের স্যাকরা পাড়া লেনের ১০ নম্বর বাড়ি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে বাড়ি খালি করায় পুলিশ। চাঁদনি চকের সেন্ট্রাল গেস্ট হাউসে ওঠেন তাঁরা ৯ সদস্যের পরিবার। পোষ্য কুকুরটিও সঙ্গে আসে।

ডায়াবেটিসের রোগী, বৃদ্ধ গণেশবাবু কিছুতেই মানাতে পারছিলেন না হোটেলে খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে। তার কয়েক দিন আগেই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। তার পরে আবার এই ধকল। এর ফলে ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন ক’দিন পরেই। আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় তাঁকে। হাসপাতালের টেলিভিশনেই দেখছিলেন, একের পর এক বাড়ি ভেঙে পড়ছে বৌবাজারে। নিজের বাড়িটিকেও ধ্বংসস্তূপ হয়ে যেতে দেখেন হাসপাতালে শুয়েই।

পরিবারের অভিযোগ, চূড়ান্ত মানসিক আঘাত পান গণেশবাবু। বারবার প্রশ্ন করতে থাকেন পরিবারের সকলকে। শেষমেশ বৃহস্পতিবার সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

দিলীপ বাবুর অভিযোগ, “মানসিক আঘাতে শেষ হয়ে গেলেন বাবা। এই মৃত্যুর দায় কে নেবে! সতর্ক না হয়ে কাজ করা জন্য এতগুলো মানুষের এত ক্ষতি হয়ে গেল আজ! আমরা তো বাবার পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মও করতে পারব না, কোনও আচার পালন করতে পারব না। আমাদের তো বাড়িই নেই, কোথায় করব এই সব!”– ক্ষোভ ও যন্ত্রণা উপচে পড়ে তাঁর গলায়।

শুধু তাই নয়। গণেশবাবুর ডেথ সার্টিফিকেট পেতেও খুবই সমস্যা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দিলীপবাবু। কারণ ফোটো আইডেন্টিটি ডকুমেন্টগুলো সঙ্গে আনতে পারেননি তাঁরা। এই একই সমস্যা হয়েছিল, গত কাল অঞ্জলি মল্লিকের মৃত্যুতেও। স্যাকরাপাড়া লেনেরই বাসিন্দা, দিলীপবাবুদের প্রতিবেশী মল্লিক পরিবারের অশীতিপর বৃদ্ধাও বাড়ি ছেড়ে এসে ইস্তক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। দমবন্ধ হয়ে আসছিল তাঁর, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা হচ্ছিল। বাড়ি ভেঙে পড়লে হৃদরোগে আক্রান্ত হন অঞ্জলিদেবী। একই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। মারা যান তিনিও। তার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রাণ হারালেন গণেশবাবু।

সমস্যার শুরু ১০ দিনেরও বেশি আগে থেকে। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গের জন্য টানেল বোরিং মেশিনের কাজ চলছিল বৌবাজার এলাকার মাটির নীচে। সেই কাজ চলার সময়েই বৌবাজারেের দুর্গা পিথুরি লেনে আচমকা ভেঙে পড়ে একটি বাড়ি। আতঙ্ক তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। সৌভাগ্যক্রমে, সে দিন কেউ হতাহত হননি। কিন্তু তদন্ত শুরু হতেই বড় বিপদের আশঙ্কা পরিষ্কার হয়।

ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়ে দেন, ওই এলাকার মাটির তলায় প্রচুর জল রয়েছে। সুড়ঙ্গ কাটতেই জল জমে মাটি আলগা হয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে বাড়ি। এলাকার সব বাড়িই বিপদের মুখে। তড়িঘড়ি বউবাজারের একাধিক বাড়ি খালি করে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টার নোটিসে ঘর ছাড়া হয় প্রায় ৫০ পরিবার। রাতারাতি হোটেলে গিয়ে ওঠেন ৪০০-৫০০ মানুষ।

চোখের সামনে হুড়মুড়িয়ে বসতভিটে ভেঙে পড়া স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিতে পারেননি কেউই। মেনে নিতে পারেননি, সব জিনিসপত্র ফেলে ঘর ছেড়ে হোটেলে থাকাও। প্রাণে বেঁচে গেলেও, নিজেদের বানানো বাড়ি মুহূর্তে ধূলিস্যাৎ হয়ে যাওয়া যে কতটা কষ্টের তা সকলের কাছেই স্পষ্ট।

১ সেপ্টেম্বর থেকে আতঙ্কে দিন কাটছে বউবাজারের বাসিন্দাদের। একের পর এক ভেঙে পড়ছে বাড়ি। এর মধ্যে দু’-দু’টি মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই থমথম করছিল এলাকা।

সরকারি সূত্রের খবর, বৌবাজার এলাকায় ভেঙে ফেলতে হবে মোট দশটি বিপজ্জনক বাড়ি। আগেই পাঁচটি বাড়ি ভেঙে ফেলার কথা জানিয়েছিল কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন লিমিটেড। প্রাথমিক পরীক্ষার পর আরও পাঁচটি বাড়ি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেট্রো প্রোজেক্টের কাজের জন্য ইতিমধ্যেই ন’টি বাড়ি ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ মোট ১৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হবে ওই এলাকায়।

এত বড় বিপর্যয়ের দায় নিয়ে মেট্রো কর্তৃপক্ষ নতুন বাড়ি তৈরির কথা বলেছেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপদকালীন আর্থিক সাহায্যও করেছেন। সাহায্য মিলেছে রাজ্য সরকারের তরফেও। কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে গেলেও আতঙ্ক এখনও কাটেনি। একই সঙ্গে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছে সরিয়ে দেওয়া বাসিন্দাদেরও। নিজের বাড়ি ছেড়ে, ন্যূনতম জিনিসপত্র নিয়ে এ ভাবে কত দিন থাকা যায়, প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। সকলেরই পড়াশোনা, কাজকর্মের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন অসুবিধা তো আছেই।

যে ভাবে রোজ বাড়ি ভাঙছে, তাতে ওই এলাকায় যে আর নিরাপদে ফেরা হবে না, তা আন্দাজ করছেন অনেকেই। কিন্তু এর পরে কী হবে, তা বলতে পারছেন না কেউ-ই।

আরও পড়ুন…

ভেঙে পড়েছে বসতভিটে, হৃদরোগ কেড়ে নিল বৃদ্ধার প্রাণ! এখনও বাড়ি ভাঙছে বৌবাজারে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More