শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

আরও বেশি করে কথা বলতে থাকুন মোবাইল ফোনে, মাথায় গজাবে শিং!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় অনেকে বলতাম মাথায় একবার ঠোকা লাগলে শিং গজাবে, তাই আরেকবার ঠোকা দিতেই হবে।  এবার আর আলাদা করে ঠোকা দেওয়ার কষ্ট করতে হবে না আপনাকে।  রকেট যুগে আমরা বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, সময় দেখা, কিছু মনে করে লিখে রাখা, কাউকে কিছু জানানো–সর্বোপরি নিজে কিছু জানার জন্য যার উপর ভরসা করি, তার নাম মোবাইল।  যা চাই, সবই পেয়ে যাই ওই মুঠোফোনেই।  তাই ওইটুকু যন্ত্রের উপর আমাদের নির্ভরশীলতাও যথেষ্ট বেশি।  ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া আমরা তাকে বিরাম দিই না।  এবার ওই যন্ত্রেরও তো আমাদের কিছু দিতে ইচ্ছে করে, তাই সে আমাদের মাথায় শিং গজাতে সাহায্য করছে।  চোখ কপালে না তুলে, জানুন কী ভাবে।

বায়োমেকানিক্সের নতুন গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে আসছে।  দেখা গেছে যে মোবাইল ফোনের বহুল ব্যবহারে তরুণ প্রজন্মের করোটির পিছন দিকে শিং গজাচ্ছে।  মাথা ঝুঁকিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে সর্বক্ষণ আমাদের নজর থাকছে।  এতে কাঁধের দিক থেকে ওজন বা ভারটুকু মেরুদণ্ড দিয়ে চলে আসছে মাথার পেছনদিকে থাকা অংশে।  ফলে মেরুদণ্ড এবং করোটির সংযোগস্থলে ক্রমাগত ভার বাড়ছে, সেখানে টেন্ডন এবং লিগামেন্টেও তার প্রভাব পড়ছে।  অনেক সময় আমাদের চামড়ায় কড়া পড়ে, অনাবশ্যক চাপ আর ঘর্ষণে সেখানটা শক্ত হয়ে ওঠে দিন দিন।  এক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই হচ্ছে।  আর এভাবেই ঘাড়ের কাছে করোটি, চামড়া শক্ত হয়ে আস্তে আস্তে শিংয়ের মতো হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে আবার অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের সানশাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এক গবেষণায় বলছেন, মোবাইল আজকাল তরুণ প্রজন্মকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।  তাদের চালচলন, অঙ্গভঙ্গিও নিয়ন্ত্রণ করে মোবাইল।  আর মোবাইল ব্যবহারই তাদের শরীরের গঠনকে প্রভাবিত করে।  হাড় অনেকটাই নমনীয় করতে সাহায্য করে।  মোবাইল বা অন্য কোনও ডিভাইস ব্যবহারের জন্য নতুন প্রজন্মের মানুষ মাথা ঝুঁকিয়ে রাখছেন।  এই গবেষকরা আরও বলেছেন, তাঁরা পরীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছেন, ইয়ং জেনারেশনের শরীরের গঠনের অভিযোজনেও তাদের দৈনন্দিন জীবনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রভাব রয়েছে।  ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যবিশেজ্ঞরা সতর্ক করছেন, “text neck” “texting thumb”নিয়ে।  যা নির্দিষ্ট করে ঠিক কী, তা বলা না হলেও অনেকটাই ‘কার্পাল টানেল সিণ্ড্রোম’-এর মতো।  এই সিন্ড্রোমে দেখা যায়, হাতের কব্জি এত বেশি চাপে থাকে, যে আঙুল বা হাতের শিরায় তার প্রভাব পড়ে এবং যন্ত্রণা হয়।  কাজেই বেশি ফোন ব্যবহার থেকে ব্যথার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে এই গবেষণাতে।  তবে এক্ষেত্রে ঘাড় এবং আঙুলের যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে।

গত বছর ‘নেচার রিসার্চ’স পিয়ার রিভিউ’-এর একটি সমীক্ষার রিপোর্ট সামনে আসে, যেখানে প্রশ্ন তোলা হয় মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে তরুণ প্রজন্মের হাড়ের ক্ষয় কতটা দ্রুত হচ্ছে? সপ্তাহখানেক আগেই আবারও এই প্রশ্ন সামনে আসে।  আধুনিক জীবন মানুষের কঙ্কালকে কী ভাবে রূপান্তরিত করছে আজকাল? অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যম আপাতত এই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু করেছে। “phone bones”, “spikes”, “weired bumps”, “head horns”-এই শব্দগুলো তাই সেখানকার সংবাদ মাধ্যমে বারবার ঘুরে ঘুরে আসছে।  এই গবেষকদেরই একজন ডেভিড শাহর।  ডেভিড সানশাইন কোস্ট থেকে বায়োমেকানিক্সে পিএইচডি করেছেন ক’দিন আগেই।  তিনি বলছেন, এই যে হাড়ের রূপান্তর হয়ে করোটির পেছন দিকে শিং তৈরি হচ্ছে বলা হচ্ছে, একে অনেকে বলতে পারেন “ bird’s beak”, “horn”, “hook” অর্থাৎ পাখির ঠোঁট, শিং বা হুকের মতো দেখতে হচ্ছে এই অংশটা।  যেভাবেই হোক, যাঁদের হচ্ছে তাঁরা মাথা ব্যথা, ঘাড় এবং পিঠের উপর দিকে ভীষণরকম ব্যথা বোধ করতে পারেন।

একটি দৈনিকে এই শিং নিয়ে কথা বলেছেন শাহারের সহকারী গবেষক মার্ক সাঈদ। তিনি জানান, যে কজনের এমন শিং গজিয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন, তাঁদের নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন।  তাঁদের ক্ষেত্রে প্রথমে ওঁরা ভেবেছিলেন শিংগুলো বোধহয় ৩-৫ মিলিমিটার হবে, কিন্তু আসলে সেগুলো ১০ মিলিমিটার পর্যন্ত দেখা গেছে।  এখানেই বিপদ ভেবে থামলে চলবে না, সাঈদ আরও বলছেন, বিপদ আসলে ওই অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড বা শিং নির্দিষ্ট একটা জায়গাতেই থাকছে না, বরং মাথা ও ঘাড়ের এদিক ওদিকেও আয়তনে বাড়ছে।  ফলে মাথা এবং ঘাড়ের গঠনেও তার প্রভাব পড়ছে।

তাঁরা এই গবেষণা শুরু করেন আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়ারই কুইন্সল্যাণ্ডে।  একজনের ঘাড়ের এক্স-রে করতে গিয়ে দেখা যায় তাঁর করোটির কাছে কিছুটা হাড় উঁচু হয়ে আছে।  ডাক্তারি পরিভাষায় তাকে বলা হয় এনথেসোফাইটস।  প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এরপর থেকে এক্স-রে প্লেটগুলোর দিকে নজর দিতে শুরু করেন তাঁরা।  দেখতে পান শুধুমাত্র তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা বেশি রয়েছে।  অথচ বয়স্কদের ক্ষেত্রে নেই।

২০১২ এর জার্নাল অব অ্যানাটমিতে প্রকাশিত হয় তাঁদের গবেষণার ফার্স্ট পেপারটা।  ১৮ থেকে ৩০ বছরের মানুষদের ২১৮ টি এক্স-রে প্লেট নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছিল।  ৪১ শতাংশ তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাড়ের বৃদ্ধি দেখা যায়, যা যথেষ্ট বেশি চিন্তার।  পুরুষদের থেকে মহিলাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি চোখে পড়েছে।  এই সমস্য বিশ শতকের শেষ দিকে কিছুটা চোখে পড়লেও তখন অতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।  পরে গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে একেই।

২০১৮-র শুরুর দিকে ক্লিনিকাল বায়োমেকানিক্সের আরেকটি পেপার বের করা হয়।  সেখানে চারজন টিনএজারের উপর গবেষণা করা হয়।  সেখানে বলা হয়েছিল অন্য কোনও কারণে নয়, অতিরিক্ত ভার বহন করার জন্য পিঠের পেশি, ঘাড়, মেরুদণ্ড, করোটিতে চাপ পড়তে পড়তে এমন শিং গজায়।  কুইন্সল্যাণ্ডেই ১৮ থেকে ৮৬ বছরের ১২০০ মানুষের এক্স-রে রিপোর্ট নিয়ে গবেষণা করে দেখা যায় সেখানে প্রায় ৩৩ শতাংশের মধ্যেই হাড়ের ওই গ্রোথ রয়েছে।  যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যায়।  ফলে এখনকার এই সমীক্ষার রিপোর্টের থেকে একেবারেই উল্টো কথা বলেছে ওই রিপোর্ট।  তবে এখন যে সমীক্ষা করা হয়েছে, তাতে এ কথাও বলা আছে যে এখনকার ইয়াং জেনারেশন প্রচণ্ড বেশি স্ট্রেসের মধ্যে থাকে।  আর সঙ্গে ইলেকট্রনিক গ্যজেট ষোলকলা পূর্ণ করে।  তাই শেষ দশ থেকে কুড়ি বছরে তরুণ প্রজন্মের শরীরের গঠনেও এসেছে পরিবর্তন।

মানুষ ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন দিনের পর দিন, কিন্তু নিজেদের শরীরকে বাইরে থেকে কোনওভাবে চেষ্টা করছেন না তার সাথে অভিযোজিত করতে।  তাই আজ এ জাতীয় সমস্যা হচ্ছে।  যন্ত্র যখন ব্যবহার করছেন, তখন তাঁর উচিত মাথা এতটাই ঝোঁকানো যে তা বুকের কাছ অবধি আসে, কিন্তু তিনি সেটা না করে অল্প ঝোঁকাচ্ছেন। ফলে শরীর নিজের মতো করে তার অভিযোজন করছে।  ঘাড় পিঠের পেশি করোটিতে তার প্রভাব পড়ছে।  আর তৈরি হচ্ছে শিঙের মতো অংশ।

সাঈদ এবং শাহর দুজনেই বলছেন, স্কুলগুলোতে ছোট থেকেই শেখানো দরকার কীভাবে কোনদিকে শরীর ঝুঁকিয়ে ভার বহন করতে হবে।  তাহলে আর এই সমস্যা হয় না।  আর সারাদিন যদি প্রচুর ভার বহন করতেই হয়, তাহলে অন্তত রাতে এমন কিছু ব্যায়াম করতে হবে যাতে পিঠের উপর দিকে মেরুদণ্ডে চাপটা লাঘব হয়।  এক্ষেত্রে আরও বলা হয়, কেউ যদি অন্তত সারাদিনে একবার তাঁর হাতগুলো ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং বিপরীতেও ঘোরান তাহলে সমস্যা সামান্য হলেও কমতে পারে।  এমন কি এভাবে এই ব্যায়াম করতে গেলেই আপনি বুঝতেও পারবেন, আপনার ঘাড়ের কাছে আদৌ কোনও শিং গজিয়েছে কি না।

সিদ্ধান্ত আপনারই।  কী চাইবেন, শিং না মোবাইল আসক্তিতে রাশ!

Comments are closed.