বুধবার, নভেম্বর ১৩

গুন্ডামি, প্রতিবাদ, ভোগান্তি– এর শেষ কোথায়! ফের প্রশ্ন তুলে দিল এনআরএস

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

সাম্প্রতিক সময়ের যে নিকৃষ্টতম ঘটনাটির সাক্ষী থাকল এনআরএস– এ নিয়ে বোধ হয় দ্বিমত হবেন না কেউই। মাথার খুলির সামনের অংশ তুবড়ে গিয়ে কোমায় চলে যাওয়া জুনিয়র চিকিৎসক পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের রক্তাক্ত ছবিটি বোধ হয় চিরকালের জন্য কালো দাগ রেখে গেল এ রাজ্যের চিকিৎসার ইতিহাসে। কোনও অপরাধ না করা এমনকী ঘটনায় আদৌ জড়িত না থাকা ২৪ বছরের ছেলেটির ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের গায়ে সোমবার রাতে রক্তের ছাপ লেগে গেল যাদের জন্য, তাদের প্রতি নিন্দার কোনও ভাষাই বোধ হয় যথেষ্ট নয়।

কিন্তু মঙ্গলবার সকালে এই ঘটনার জেরে শুরু হওয়া প্রতিবাদ যে ভাবে বহু রোগীকে বিপদে ফেলল, তা-ও বোধ হয় কাম্য ছিল না হাসপাতালগুলিতে। তবে বিক্ষুব্ধ ও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙা হবু চিকিৎসকদের প্রতিবাদের ক্যানভাসে ঋজু, স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ হয়ে ফুটে রইল একটিই প্রশ্ন। আর কত! আর কত বর্বরতার সাক্ষী হবেন চিকিৎসকেরা! এর শেষ কোথায়!

তাঁদের দাবি, শেষ কয়েক বছরের চিকিৎসক-নিগ্রহের তালিকায় চোখ রাখলে, সোমবারের ঘটনাটি ৩১তম। একই সঙ্গে নৃশংসতমও বটে। তাঁদের অভিযোগ, গত ৩০ বারই একই রকম বাঁধা বুলিতে আশ্বাস পেয়েছেন তাঁরা, এমনটা আর ঘটবে না। প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, উপযুক্ত পদক্ষেপ করা হবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু সেই সবই আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির স্তরে থেকে গিয়েছে। কার্যকর হয়নি। হলে এমন দিন বারবার দেখতে হতো না।

ফলে এই বারে যে ধৈর্য্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গিয়েছে, তা দৃশ্যতই স্পষ্ট। এ ঘটনার দায় কার, তা নিয়ে বিতর্কের যতই অবকাশ থাকুক না কেন, ট্যাংরা-তিলজলা এলাকা থেকে এখাধিক ট্রাকে ভর্তি হয়ে আসা কয়েকশো গুন্ডা যে নেহাৎ ৮৫ বছরের বৃদ্ধ মহম্মদ সাহিবের মৃত্যুতে সমব্যথী হয়ে উদভ্রান্তের মতো ডাক্তার পেটাতে আসেনি, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ঘটনার নিন্দা করার ভাষা নেই।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, নিকৃষ্টতম ঘটনার প্রতিবাদও যদি একই রকম আতঙ্ক ও অসহায়তা তৈরি করে, তবে তা কি কোনও স্থিতিশীলতা আনতে পারে? নাকি সে প্রতিবাদ কোনও পরিবর্তন আনতে পারে? মারের পাল্টা মার যেমন সমাধান নয়, চোখের পাল্টা চোখ যেমন উত্তর নয়, তেমনই চিকিৎসকের মার খাওয়ার পাল্টা হিসেবে পরিষেবা বন্ধ করাও কি সমাধান? প্রশ্ন তুলেছেন এনআরএস-এর বাইরে অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতরে কাতরাতে থাকা বৃদ্ধা মাকে নিয়ে আটকে পড়া ছেলে। “আমার বৃদ্ধা মা কী দোষ করেছেন!”– প্রশ্ন তাঁর।

চোখে পড়ে, হাসপাতালে ঢুকতে একই ভাবে বাধার মুখোমুখি হন বারুইপুরের যুবক, যাঁর সদ্যপ্রসবা স্ত্রীয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন তিনি। বন্ধ গেটের মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ফেলেন, ‘কী করছেন আপনারা! আমরা আপনাদের কী ক্ষতি করেছি!’

প্রশ্ন ওঠে, সতীর্থ চিকিৎসক পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের মার খেয়ে মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যাওয়া নিয়ে কি সত্যিই যথেষ্ট সংবেদনশীল এই হবু ডাক্তাররা? তাই যদি হবে, তা হলে কেন এত পাল্টা অসহযোগিতা, এত ঔদ্ধত্য। হ্যাঁ, এই অভিযোগই উঠেছে মঙ্গলবার দিনভর এনআরএসে উপস্থিত অ-চিকিৎসক মানুষগুলির তরফে।

রাগ-ক্ষোভ-ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। সোমবারের ঘটনার পরে তা খুব একটা অসঙ্গতও নয়। কিন্তু চিকিৎসার মতো একটা পরিষেবায় যদি এতটা অসহিষ্ণুতা জন্মায়, যার জন্য সারা রাজ্যের সাধারণ রোগী এবং রোগী পরিবার তীব্র অসহায়তার সামনে পড়ে, তা হলে তার দায় কার?

বারবার, রাজ্যের নানা প্রান্তে গুন্ডামি করে চিকিৎসক পেটানোর যে ধারা এ বাংলা দেখছে, সে দায় কি তা হলে প্রতিটা সাধারণ মানুষ নিতে বাধ্য? হাসপাতালের বাইরে নাকে-হাতে নল নিয়ে কাতরাতে থাকা রোগীরাও?

“আমরা আর কত সহ্য করব?”– প্রশ্ন বদলায় না আন্দোলনকারীদের তরফে।
উত্তর? নেই।

সরকার, কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন– সকলে এখনও চুপ। আগামী কাল গোটা রাজ্য জুড়ে আরও বড় কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন তাঁরা। এর জেরে যে অন্য কোনও রোগী সমস্যায় পড়বেন না, তার জেরে যে পাল্টা বিপদ ঘনাবে না, তা নিশ্চিত করে এখনও বলতে পারি না আমরা কেউ। তা হলে কি প্রতিবাদ ও পাল্টা প্রতিবাদের পর্ব দেখতে এ রাজ্য প্রস্তুত? এ রাজ্য কি প্রস্তুত আরও অনেক মৃত্যুর দায় নিতে?

প্রশ্ন ঘুরছে চিকিৎসা মহলের দরবারে।

ছবি: শুভজিৎ নস্কর

আরও পড়ুন…

রোগীমৃত্যু, হেনস্থা, ক্ষমা চাওয়া– ওয়ার্ডের ভিতরে মিটে যেত সবই, তবু ট্রাকে করে এসে ডাক্তার পেটাল কয়েকশো গুন্ডা!

Comments are closed.