শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

মোদীর মুখ দিয়ে আর রাজ্য জেতা যাবে না, আঞ্চলিক মজবুত নেতাও চাই

শঙ্খদীপ দাস

লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদী একাই তিনশ পেরিয়েছেন ছ’মাসও হয়নি, দুই রাজ্যে বিধানসভা ভোটে ভাল মতো ধাক্কা খেল বিজেপি। হরিয়ানায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অর্জন করতে পারল না। আর মহারাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আগের তুলনায় আসন কমে গেল অনেকটাই। অথচ মোদী ও অমিত শাহ প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছিলেন, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা—এই দু’রাজ্যেই দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জিতে ক্ষমতায় ফিরবে বিজেপি।

ভোটের ফলাফলই বলছে সেই আশায় বালতি বালতি জল ঢেলে দিয়েছেন ভোটাররা। কিন্তু কেন? মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে কী এমন ঘটে গেল যে বিজেপির রেখচিত্র পড়তে শুরু করল!

উত্তরে বলতে হয়, এই দেওয়াল লিখন ছিলই। লোকসভা ভোটে বিজেপি একাই তিনশ আসনে জেতার পরেও দ্য ওয়াল-এর প্রকাশিত মতামতে বারবার বলেছি, রাজ্যের ভোট তথা বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু এতটা ‘কেক ওয়াক’ হবে না। তার প্রধান দুটি কারণ আপাতত চোখে পড়ছে। এক, রাজ্যস্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা এবং দুই, মজবুত আঞ্চলিক নেতৃত্বের বড়ই অভাব। শুধু মোদীর মুখ দিয়ে আর রাজ্য জেতা যাবে না।

মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানা এই দুটি রাজ্যেই গত পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি। মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবীশ সরকার ও হরিয়ানায় মনোহরলাল খট্টরের এমন কোনও পারফরম্যান্স নেই যা বাঁধিয়ে রাখার মতো। বরং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছিল। ভালমতোই ছিল। তবে সেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সত্ত্বেও মহারাষ্ট্রে বিজেপির অ্যাডভান্টেজ ছিল। কারণ লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পর মনোবল তলানিতে ঠেকে গেছিল বিরোধীদের। মারাঠা ও জাঠ মুলুকের যুদ্ধে প্রায় ওয়াক ওভারই দিয়ে দিয়েছিলেন রাহুল-সনিয়া। এতটাই যে, এনসিপির সঙ্গে জোটে থেকেও শরদ পওয়ারের সঙ্গে সনিয়া বা রাহুলের কোনও যৌথ সভা পর্যন্ত হয়নি। আজকের ফলাফল দেখে হয়তো গান্ধী পরিবারের অন্দরমহলে হাত কামড়ানো চলছে।

বস্তুত দুই রাজ্যেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া যে রয়েছে তা হয়তো বুঝেছিলেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহও। হতে পারে সেই কারণেই স্থানীয় বিষয় ছেড়েছুড়ে ৩৭০ ধারা বিলোপ, এনআরসির মতো ইস্যু নিয়ে গলা ফাটানো চলছিল। আবার কাকতালীয় ভাবে ভোটের আগের দিনই পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি শিবির ভেঙেছে ভারতীয় সেনা। শুধু তাই নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় লোকসভা ভোটে সোনা ফলিয়েছিলেন মোদী, বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে সেখানেই বিরোধী শিবিরের নেতা ভাঙিয়ে আনার খেলা শুরু করে দেয় গেরুয়া শিবির। রহস্যজনক ভাবে ভোটের ঠিক আগে ঘরে বসে যান মুম্বই কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা সঞ্জয় নিরূপমও।

আসলে রাজ্যস্তরে ভোটের এই ধারাটা টিপিক্যাল ২০১৯-এর বৈচিত্র্য নয়। লোকসভা ভোটের মাত্র পাঁচ মাস আগে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড় ও রাজস্থানে বিধানসভা ভোট হয়েছিল। ওই তিন রাজ্যেও ঠিক এই একই কারণে হেরেছিল বিজেপি—প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা।

এ ছাড়া হরিয়ানায় বিপর্যয় বা মহারাষ্ট্রে ধাক্কার দ্বিতীয় বড় কারণটি অবশ্যই রাজ্য স্তরে মজবুত নেতার অভাব। জাঠ অধ্যুষিত হরিয়ানায় অনেক দিন ধরে বিজেপি-র কোনও বলিষ্ঠ নেতা নেই। যে কজন নেতা ছিলেন, রাজনীতিতে তাঁদের সবারই উচ্চতা কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র সিংহ হুডার তুলনায় বেশ কম। মহারাষ্ট্রের ছবিটাও ভিন্ন নয়। গেরুয়া শিবিরে যে ক’জন নেতা রয়েছেন, তাঁদের তুলনায় কংগ্রেস ও এনসিপির নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চতা ও ওজন অনেক বেশি। তা সে শরদ পাওয়ার হোন বা অশোক চৌহান বা পৃথ্বীরাজ চৌহান। শিবসেনা প্রমুখ বালাসাহেব ঠাকরে এবং বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজন ও গোপীনাথ মুণ্ডের মৃত্যুর পর গেরুয়া শিবিরে মজবুত ও সার্বিক গ্রহণযোগ্য নেতার ঘোর অভাব রয়েছে।

পরিস্থিতি যখন এমনই তখন পাঁচ বছর আগে হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখকেই সামনে রেখে ভোটে গিয়েছিল বিজেপি। তখন সবে কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছেন মোদী। হানিমুন চলছে। সেই রেশ থাকতে থাকতেই দুই রাজ্যে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল বিজেপি। তার পর মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবীশকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিল, হরিয়ানার তখতে বসিয়েছিল মনোহরলাল খট্টরকে। এমন দু’জন নেতা—সর্বভারতীয় রাজনীতিতে যাঁদের কেউ চিনতেনই না। এমনকী রাজ্যেও বহু মানুষ ধারনা করতে পারেননি, এঁরাও মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন! কেননা রাজ্য রাজনীতিতে তাঁদের কস্মিনকালে কোনও কর্তৃত্ব ছিল না।

মোদী-অমিত শাহ হয়তো ভেবেছিলেন, এমন নেতাই ভাল। যা বলব তাই শুনবেন। বরং মেরুদণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা কম হলে, জনভিত্তি মজবুত হলেই অসুবিধা।

সেই ফর্মুলা তখনকার মতো হয়তো ঠিক ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর তা আর খাটল না। মোদীর ইমেজকে সামনে রেখে মেরুকরণ ও জাতীয়তাবাদের রাজনীতি দিয়ে আর গেরুয়া ঝড় তোলা সম্ভব হল না দুই রাজ্যে। ফড়নবীশ ও খট্টরের মুখটাও বিচার্য বিষয় হয়ে গেল। যার মোদ্দা অর্থ পরিষ্কার। মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে গিয়েছে। শুধু মোদীর মুখকে ব্যবহার করে আর রাজ্যে রাজ্যে অশ্বমেধ সম্ভব নয়। বরং আঞ্চলিক মজবুত ও গ্রহণযোগ্য নেতা দরকার।

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এই রসায়ন নতুন নয়। রাজ্যস্তরে মজবুত আঞ্চলিক নেতারাই যে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেছেন তা অতীতে বার বার প্রমাণিত হয়েছে। একবার ভেবে দেখুন কংগ্রেস জমানায় রাজ্যস্তরে কেমন সব তাবড় নেতা ছিলেন! উত্তরপ্রদেশে গোবিন্দবল্লভ পন্থ, কমলাপতি ত্রিপাঠি, হেমবতী নন্দন বহুগুণা, এনডি তিওয়ারি। মধ্যপ্রদেশে শ্যামাচরণ শুক্ল, অর্জুন সিং, দিগ্বিজয় সিং। মহারাষ্ট্রে যশবন্ত রাও চৌহান, বসন্তদাদা পাটিল, শরদ পওয়ার প্রমুখ।

পরবর্তী কালে আডবাণী-বাজপেয়ীরাও সেই একই সূত্রে বিজেপির শক্তি বাড়িয়েছেন দেশজুড়ে। মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিংহ চৌহান, ছত্তীসগড়ে রমন সিং, রাজস্থানে বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া, গুজরাতে নরেন্দ্র মোদী হয়ে উঠেছিলেন রাজ্যস্তরে গ্রহণযোগ্য মজবুত নেতা।

কিন্তু মুশকিল হল, সনিয়া গান্ধীর জমানায় কংগ্রেসের যে রোগ ধরেছিল এখন মোদী জমানাতেও তারই সংক্রমণ শুরু হয়েছে বিজেপিতে। হাইকম্যান্ড সংস্কৃতি যেমন কংগ্রেসের রাজ্যস্তরে আঞ্চলিক নেতৃত্বকে দুর্বল করেছে, তেমনই এখন মোদী-অমিত শাহদের দাপটেও রাজ্য স্তরে বিজেপি-র দাপুটে নেতার বড় অভাব। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ ছাড়া সবাই জো হুজুর টাইপ। দেবেন্দ্র ফড়নবীশ, মনোহরলাল খট্টরও তাঁদের দলেই পড়েন।

সন্দেহ নেই মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা বিধানসভার ফলাফল তৃণমূলকেও সাহস যোগাচ্ছে। তারা হয়তো এই ফলাফলে রূপোলি রেখে দেখতে শুরু করেছে। বাংলায় শাসক দলের অনেক নেতাই মনে করছেন, উনিশের লোকসভা ভোটে জাতীয় স্তরে মোদীর সামনে বিরোধীদের কেউই বিকল্প হয়ে উঠতে পারেননি। সেই পরিস্থিতিতে বাংলা থেকেও বিজেপি ১৮ টা আসন জিতে নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু লোকসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে বিজেপির রাজ্য স্তরে কোনও শক্তিশালী মুখ এখনও নেই। রাজ্যের ভোটে মোদীর মুখের ম্যাজিক আর চলবে না। একুশের ভোটের আগে বিজেপি কোনও মজবুত নেতাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিকল্প হিসাবে তুলে ধরতে না পারলে অ্যাডভান্টেজে থাকবে তৃণমূলই।
হতে পারে বিজেপির মধ্যেও এই মন্থন শুরু হয়ে যাবে শিগগির।

Comments are closed.