কেমন আছেন মাস্টারমশাই?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সায়ন্তন যশ

    মাস্টারমশাই শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভাসে ধুতি-ফতুয়া পরা এক মূর্তিমান প্রতিচ্ছবি, যাঁর দিকে তাকালেই অন্তরে একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার ভাব জেগে ওঠে। সম্মানের নিরিখে তাঁরা সমাজের উচ্চস্তরের মানুষ, কিন্তু আর্থিক স্বচ্ছলতার বিচারে তাঁদের অবস্থা বেশ শোচনীয়।

    তবে শব্দটা এখন খুব বেশি শোনা যায় না। গত শতাব্দীতেও গ্রামাঞ্চলে কিংবা মফস্বল শহরে বিভিন্ন পাঠশালায় তাঁরা শিক্ষা দিতেন। আর এই শিক্ষাদানের বৃহত্তর গন্ডিতে একদল শিক্ষক আছেন যাঁরা স্কুল-কলেজের বাইরে থেকেও সমাজে মানুষ তৈরির কাজে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আর এই বিশেষ শিক্ষকগোষ্ঠীই এখন গৃহশিক্ষক বা প্রাইভেট টিউটর নামে পরিচিত। শুধু তাই নয়, গৃহশিক্ষকতা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের একশ্রেণির শিক্ষিত বেকারদের একমাত্র জীবিকা।

    সরকারের তরফে যতই কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দেওয়া হোক না কেন, আজও বহু শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী তাদের কর্মহীনতা ঘোচাতে গৃহশিক্ষকতাকেই পেশা হিসাবে বেছে নেয়। এই পেশায় শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দায়-দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে থাকলেও কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সকাল-সন্ধ্যায় এবাড়ি থেকে ওবাড়ি ঘুরে ছাত্র তৈরির কাজ করেন তাঁরা। অথচ পান থেকে চুন খসলেই অভিভাবকদের হাজার কথাও শুনতে হয় তাঁদেরই, কেন ছেলে বা মেয়েকে স্কুলের পরীক্ষায় এক থেকে দশে পাওয়া গেল না! পয়সা দিয়ে তাঁকে রেখে কি লাভ হচ্ছে! ইত্যাদি। ছেলেমেয়ে কেন ঠিকমতো পড়াশোনা করছে না তার দায়ও বরাবর তাঁদের কাঁধেই থাকে। কিন্তু এই করোনা আবহে তাঁরা কেমন আছেন, সে খবর ক’জন রাখেন!

    গৃহশিক্ষকরা মূলত সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে পড়েন। অর্থাৎ এঁরা নিম্নবিত্তদের চেয়ে বিত্তবান অথচ মধ্যবিত্তের মতো স্বচ্ছল নন। উচ্চবিত্তদের জমানো পুঁজি ভাঙিয়ে সংসার চলছে, বিভিন্ন জায়গায় মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীরা মাইনের টাকাও পাচ্ছেন। অন্যদিকে নিম্নবিত্তের জন্য চলছে একাধিক সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণের ব্যবস্থা। আর এই মধ্যস্থানীয় হয়েই গৃহশিক্ষকরা পড়েছেন গভীর সংকটে। এঁরা সম্মান রক্ষার্থে কারও কাছে হাত পাততে কিংবা ত্রাণ নিতেও পিছপা হন, আবার অন্যদিকে যা কিছু সামান্য সঞ্চয় ছিল তাও প্রায় শেষ। এবার এঁদের দিন গুজরান হবে কী করে!

    সরকারি স্তরে এবিষয়ে এখনও কোনো উচ্চবাচ্য নেই। একের পর এক বিভিন্ন দোকান খোলা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বিভিন্ন শপিং মল, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মার্কেটিং কমপ্লেক্স সবই খুলেছে নিয়ম মেনে। সতর্কতাবিধি মাথায় রেখে রাস্তায় যান চলাচলও অনেকটা সচল হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিরিয়াল-সিনেমার শ্যুটিংও শুরু হয়েছে। মোটের উপর যাঁদের নিয়মিত অর্থ জোগানের কোনও উপায় নেই, তাঁদের সকলকেই স্বাভাবিক জীবিকায় ফেরানোর চেষ্টা করেছেন সরকার। কিন্তু এই শিক্ষিত বেকার গৃহশিক্ষকদের বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেই কেন? শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে এই করোনার আবহে কাজ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে আর্থিক দৈন্যদশার সঙ্গে লড়াই করছেন রাজ্যের অগণিত গৃহশিক্ষক।

    শুধু সিলেবাস কিংবা লেখাপড়ার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরাই নন, লকডাউনের জাঁতাকলে গৃহবন্দি হয়েছেন অঙ্কন, আবৃত্তি, নৃত্য, সঙ্গীত প্রভৃতি নান্দনিক বিষয়ের গৃহশিক্ষকরাও। স্কুল সিলেবাসের বাইরে বিভিন্ন নান্দনিক বিষয়ে শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে তৈরি করেন, একঘেয়েমি জীবনে একটু মন ভালো রাখার সন্ধান দেন। আজ তাঁদের ঘরের নূন্যতম রসদটুকুও প্রায় বাড়ন্ত। তাঁরা জানেন না এই লকডাউন উঠলে কবে আবার মানুষ তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে মঞ্চে তুলবে কিংবা আবার কবে এক্সিবিশন থেকে কিছু অর্থ উপার্জন হবে। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারি অনুদান পান ঠিকই, তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় এতটাই কম যে তা দিয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংসার চলে না।

    রাজ্য তথা দেশের কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে আপাতত খুলছে না, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারের তরফেই। আর এতেই চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়েছে গৃহশিক্ষকদের কপালে। কারণ এখনও সরকার পড়াশোনার বিষয়টিকে কোনও ছাড়পত্র দিচ্ছে না। শহরাঞ্চলের গৃহশিক্ষকরা যদিও অনলাইন ক্লাস করিয়ে কিংবা নোটস পাঠিয়ে তাঁদের শিক্ষাদান ও অর্থ উপার্জন উভয় পথই চালু রেখেছেন।

    কিন্তু এক্ষেত্রে মূলত প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের গৃহশিক্ষকরা পড়েছেন ঘোর বিপদে। কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষ যখন দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোটাতেই হিমসিম খাচ্ছেন, তখন তাঁদের কাছে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিংবা অতিরিক্ত টাকা খরচ করে নেট প্যাক রিচার্জটা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ প্রৌঢ় কিংবা বয়স্ক শিক্ষকও কেবল খাতায়-কলমে কিংবা বোর্ডে চক নিয়েই স্বচ্ছল। তাই আজ হাজার ত্যাগ স্বীকার করেও তাঁরা গৃহবন্দী। তাঁরা চক্ষুলজ্জায় কোথাও হাত পাততেও পারেন না, আবার ছাত্রছাত্রীদের পরিবারের আর্থিক দৈন্যদশা দেখে তাঁদের কাছে মাইনের দাবিও করতে পারেন না। প্রচলিত কথায়, এদের “বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না।”

    এখন সময় এসেছে গৃহশিক্ষকদের বিষয়টিকেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার। গৃহশিক্ষকরা সকলেই উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক। তাঁরা নিশ্চয়ই এমন কিছু করবেন না যাতে করে সমাজ কিংবা দেশের ক্ষতি হয়। তাই সরকারেরও উচিত তাঁদের রুজি রোজগারের পথটিকেও সুগম করা। বিকল্প হিসেবে আট-দশজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে ছোট ছোট ব্যাচ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কিংবা ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি গিয়ে এক-দু’জনকে নিয়ে পড়ানোর বিষয়ে ছাড়পত্র দেওয়া যায় কিনা, সে কথা ভাবা যেতে পারে। এতে করে প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের গরিব ছাত্রছাত্রী এবং গৃহশিক্ষক, উভয়পক্ষই উপকৃত হবেন। এছাড়া অভিভাবকদের আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে তাঁরাও গৃহশিক্ষকদের মাইনে বন্ধ না করে পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। এমনকি সরকারেরও উচিৎ পড়ানোর বিষয়ে ছাড়পত্র দেওয়ার পাশাপাশি কিছু অর্থসাহায্য দিয়েও গৃহশিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর।

    কারণ সভ্যতার পরিবর্তনে সমাজজীবনে পরিবর্তন এলেও, মাস্টারমশাইদের ঘরের আর্থিক সংকটের ছবিটার কোনো পরিবর্তন হয়নি আজকের ডিজিট্যাল ভারতেও।

    চিত্রাঙ্কণ: অনসূয়া দাঁ

    (লেখক নানা বিষয়ক লেখালেখিতে যুক্ত, মতামত তাঁর নিজস্ব।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More