সোমবার, এপ্রিল ২২

হিটলারকে হারাতে জেমস বন্ডের বুদ্ধি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস টানটান এই অপারেশনের গল্প হার মানায় স্পাই থ্রিলারকেও।

শমীক ঘোষ

এপ্রিল ৩০, ১৯৪৩। দিনটা ভালো যাচ্ছিল না হোসের। সকাল থেকে দেখা নেই একটাও সার্ডিনের। আকাশ মেঘলা। তীরের দিক থেকে বয়ে আসছে হাওয়া। জলটা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে উত্তাল করে দিচ্ছে সমুদ্রটাকে। এমন দিন সার্ডিন ধরার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।

হোসে রে মারিয়া। বয়স তেইশ বছর। নিরক্ষর। স্পেনের উপকুল আন্দালুসিয়ার ছোট্ট গ্রাম পুনতা আমব্রিয়ায় বাড়ি। হোসে’র কাজ সমুদ্রে সার্ডিন মাছ স্পট করা। আর সেটা করতেই সে তার ছোট্ট ডিঙি নৌকা ‘আনা’-তে চড়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল সমুদ্রে। হোসের পেছনে আরেকটা বড় নৌকা। ‘লা কালিনা।’ হোসে সার্ডিনের ঝাক দেখতে পেলেই ‘লা কালিনা’ থেকে জাল ফেলবে জেলেরা।

চার বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। সারা বিশ্বব্যাপী। তবে স্পেনের এই অংশে এখনও এসে পৌঁছায়নি তার আঁচ। শুধু সমুদ্রের জলে মাঝে মাঝে ভেসে আসে পোড়া তেল। কাঠের টুকরো। অন্য জঞ্জাল। দূর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। তবে মাছের বিক্রিও কমে গিয়েছে। হোসের ভয়, শেষ পর্যন্ত না বিক্রি করে দিতে হয় ‘আনা’ আর ‘লা কালিনা’কে।

সমুদ্রে ভাসতে ভাসতেই হোসে হঠাৎ দেখতে পেল লাশটাকে। প্রথমে সে ভেবেছিল বোধহয় কোনও মরা সামুদ্রিক প্রাণী। কিন্তু কাছে আসতেই স্পষ্ট হল, এটা মানুষ। চোয়ালের কাছটা ঢেকে গিয়েছে শ্যাওলায়। কপালটা কালো হয়ে গিয়েছে। বোধহয় সমুদ্রের ছায়াহীন কড়া রোদে বেদম পুড়ে গিয়ে। চোয়াল আর নাকের চামড়া পচতে শুরু করেছে। হোসের মনে হয়েছিল, মানুষটা কোনও অ্যাক্সিডেন্টে পুড়ে গিয়েছে।

উইলিয়াম মার্টিনের লাশ

লাশটাকে তারা টেনে এনেছিল বিচের ওপর। প্রায় ছয় ফুট লম্বা লোকটা। খাকি টিউনিক আর ট্রেঞ্চ কোট পরা। পায়ে শক্ত মিলিটারি বুট। ব্রিটিশ আর্মির ইউনিফর্ম। তার ওপরে লাইফ জ্যাকেট আর লোকটার কবজিতে শক্ত করে বাঁধা একটা চেন। তার অন্যপ্রান্তে লাগানো একটা অ্যাটাচি।

প্রায় তিন মাসের পুরোনো লাশটা। পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। লাশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা হোসে জানত না যে সে ইতিহাস হয়ে গিয়েছে।

স্পেনের সমুদ্র সৈকতের খুব কাছে চলে এসেছিল হিজ ম্যাজিস্টিস শিপ সেরাফ। সাধারণ জাহাজ নয়। সাবমেরিন। নাবিকরা ভয় পাচ্ছিল আর একটু হলেই হয়ত ঠোকা খাবে পাড়ের মাটির সঙ্গে। কিন্তু অকুতোভয় লেফটেন্যান্ট বিল জোয়েল। যে করেই হোক সাবমেরিনটাকে নিয়ে আসতে হবে একদম বিচের কাছাকাছি।

এইচএমস সেরাফের নাবিকরা

অনেক দূরে দূরে ভাসছে সার্ডিন ধরা জেলেদের নৌকাগুলো। জুয়েল হিসেব করেছিলেন অন্তত এক কিলোমিটার দূরে। আকাশ এমনিতেই মেঘলা। ভোর রাতের আলোয় সাবমেরিনটাকে দেখার কথা নয় তাদের। জলের ওপর ভেসে উঠল এইচ এম এস সেরাফ। খুলে ফেলা হল একদম ওপরের দরজাটা। জুয়েল আর কয়েকজন বেরিয়ে এলেন একটা বিরাট ক্যানিস্টার নিয়ে। রবারের ভেলায় চড়ে এগিয়ে এলেন সাবমেরিনটার থেকে দূরে। তারপর ক্যানিস্টার খুলে বার করলেন কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভেতরে রাখা মৃতদেহটাকে।

লেফটেন্যান্ট জুয়েল তড়িঘড়ি লাশটার কবজিতে লাগানো অ্যাটাচির মধ্যে রেখে দিলেন জরুরী কাগজপত্রগুলো। খুব সন্তর্পণে লাশটার পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন অ্যাটাচি কেসটার চাবিটাও। তারপর লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে লাশটাকে তাঁরা ভাসিয়ে দিলেন সমুদ্রে।

সেদিন দুপুরের দিকেই খবর পেলেন স্পেনের ব্রিটিশ কনসুলেটের ভাইস কনসাল ফ্রান্সিস হ্যালডেন। স্প্যানিশ সেনবাহিনীর তাকে জানালো, একজন ব্রিটিশ অফিসার মেজর (অ্যাক্টিং) উইলিয়াম মার্টিনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে জেলেরা। খুব সম্ভবত তিনি যুদ্ধে মারা গিয়েছেন। সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তাঁর লাশটা এসে পৌঁছেছে স্পেনের তীরে। পাওয়া গিয়েছে একটা অ্যাটাচি কেসও। লাশটাকে মোটর লঞ্চে করে নিয়ে আসা হবে হুয়েলভা শহরে।

উইলিয়াম মার্টিনের আইডেনটিটি কার্ড

হ্যালডেন আশ্বস্ত হলেন। এই খবরটার আশাতেই বসে ছিলেন তিনি। ডিপ্লোম্যাটিক কেবলে এই খবরটা পাঠিয়ে দিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সদর দফতরে। পালটা কেবলও এল। অ্যাটাচিটা খুব দরকারি। যে কোনও মূল্যেই যেন সেটা উদ্ধার করেন হ্যালডেন। এই কেবলগুলো চলল বেশ কয়েকদিন ধরে। আগে থেকেই লিখে রাখা হয়েছিল এই কেবলগুলো। ব্রিটিশরা জানত, কোডে লেখা এই কেবলগুলো পড়তে শিখে গিয়েছে জার্মানরা। এই সব খবর পৌঁছাবে তাদের কাছে।

মে মাসের ২ তারিখে হ্যালডেনকে স্প্যানিশরা ডেকে পাঠালেন হুয়েলভা শহরে। মেজর মার্টিনের মৃতদেহের পোস্টর্মটেম হবে। হ্যালডেন, ডাক্তারদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন। প্রচণ্ড গরম। তার মধ্যে এই মৃতদেহটা পচে দুর্গন্ধ বার হচ্ছে। তাঁরা তো জানেনই যুদ্ধে মারা যাচ্ছে বহু সৈন্য। কি আর নতুন পাওয়া যাবে পোস্টমর্টেম করে। তার বদলে শান্তিতে লাঞ্চ করে আসতে পারেন তাঁরা। ডাক্তাররা হ্যালডেনে কথা শুনলেন। লাঞ্চ করে এসে পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা লিখে ফেললেন তাঁরা। সমুদ্রে ডুবে শ্বাস আটকে মারা গিয়েছেন ‘মেজর মার্টিন’।

সেদিনই পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হল মেজর মার্টিনের। তাঁকে কবর দেওয়া হল হুয়েলভা শহরের এক কবরখানায়।

ততক্ষণে অবশ্য জার্মান গুপ্তচর সংস্থা অবওহের জেনে গিয়েছে অ্যাটাচিটার কথা। কিন্তু তাদের প্রচুর চাপের মুখেও স্প্যানিশরা অ্যাটাচির ভেতরের কাগজপত্রের খোঁজ দিতে রাজি নয়। ৫ মে, এই অ্যাটাচিটাকে মাদ্রিদে পাঠানোর ব্যবস্থা হল। ভেতরের জিনিসপত্রের ছবি অবশ্য তুলে ফেলেছেন জার্মানদের প্রতি সহানুভূতিশীল স্প্যানিশ বাহিনীর একাংশ। কিন্তু অ্যাটাচির মধ্যে ছিল একটা বন্ধ খামও। সেই খামটা খোলাই হয়নি। অবওহেরের সর্বোচ্চ প্রধান অ্যাডমিরাল উইলহেলম ক্যানারিসের ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিলেন। অবশেষে রাজি হল স্প্যানিশরা। বিশেষ উপায় বন্ধ খামের ভেতর থেকে বার করে আনা হল চিঠিগুলো। সেগুলোকে শুকিয়ে নিয়ে ছবি তুলে নেওয়া হল। তারপর আবার ২৪ ঘন্টা ধরে চিঠিগুলো চুবিয়ে রাখা হল সমুদ্রের জলে।

চিঠিগুলো পেয়ে হতভম্ভ জার্মানরা। মেজর মার্টিন আসলে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা চিঠি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইম্পিরিয়াল জেনারাল স্টাফের উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর্চিবাল্ড নাই সেই চিঠিটা লিখেছেন আলজেরিয়া আর টিউনিশিয়ায় অ্যামেরিকা আর ব্রিটেনের যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারাল স্যার হ্যারল্ড অ্যালেকজান্ডারকে। সেই চিঠিতেই লেখা আছে, মিত্র শক্তির ইউরোপের সম্ভাব্য জায়গা হল গ্রিস।

১১ তারিখ অ্যাটাচিকেসটা ফেরৎ পেলেন ভাইস কনসাল হ্যালডেন। ভেতরের খামটা অক্ষত। কিন্তু খুলে দেখলেন সমস্ত চিঠিপত্র ঠিক থাকলেও ভেতরে রাখা একটা চোখের পাতার লোম নেই। হ্যালডেন হেসে ফেললেন। এই চোখের পাতার লোমটা রাখাই হয়েছিল জার্মানরা খামটা খুলেছে কিনা দেখতে।

হিটলারকে নাৎসি স্যালুট সৈন্যদের

আর ঠিক তিন দিন পরে, মে ১৪, ১৯৪৩ এ জার্মান ফুয়েরার হিটলারের সঙ্গে দেখা করতে এলেন জার্মানির সব থেকে উচ্চপদস্থ সেনানায়ক, গ্র্যান্ড অ্যাডমিরাল কার্ল ডোনিটজ। তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু সেই চিঠি। বৈঠকের পর ঠিক হল গ্রিস ও সমগ্র বালকানকে বাঁচাতে সিসিলি থেকে সৈন্য সরিয়ে নেবে জার্মানি। মিত্রদেশ ফ্যাসিস্ত ইতালির রাষ্টনায়ক মুসোলিনি যাই বলুক না কেন, মিত্রশক্তি সিসিলি আক্রমণ করবে না।

ঐ দিনেই ইংল্যান্ডের ব্লেচলে পার্কে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা ভেঙে ফেললেন দু’দিন আগে পাওয়া জার্মান সেনার একটা বেতার বার্তার কোড। সেই বেতারবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, অ্যামেরিকা আর ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের লক্ষ্য বালকানে গ্রীস, করসিকা আর সার্ডিনিয়া।

শুধু হিটলার কেন? জার্মানি, স্পেন বা ইতালির কেউই জানতেন না ট্রাউট মেমোর কথা।

১৯৩৯ সালে লেখা এই মেমোতে লেখা ছিল, ‘ট্রাউট মাছ ধরার জন্য সারাদিন ছিপ ফেলে বসে থাকে ট্রাউট শিকারী। সে প্রায়শই জায়গা বদল করে। বদলে ফেলে টোপ আর চারও। কোনও মাছকে ভয় দেখিয়ে থাকলে প্রায় আধ ঘন্টা চুপ করে বসে থাকে। কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য হল যে কোন মূল্যে মাছগুলোকে লোভ দেখিয়ে নৌকার কাছে নিয়ে আসা। আর প্রতিমুহূর্তেই এই লক্ষ্য নিয়ে একের পর এক কাজ করে যায় সে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে লেখা হয়েছিল এই মেমো। ট্রাউট শিকার উপমা মাত্র। প্রকাশিত হয়েছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ইনটেলিজেন্স বিভাগের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল জন গডফ্রের নামে।

কম্যান্ডার ইয়ান ফ্লেমিং

এই জন গডফ্রের আপ্তসহায়ক ছিলেন তরুণ অফিসার ইয়ান ফ্লেমিং। বুদ্ধিমান এই অফিসার ব্রিটেনের নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট পদে। কদিনের মধ্যেই প্রমোশন পেয়ে কম্যান্ডার। এই ইয়ান ফ্লেমিংকে অবশ্য আমরা চিনি বিশ্ববিখ্যাত স্পাই থ্রিলারের রচয়িতা হিসাবে। হ্যাঁ জেমস বন্ড ০০৭ চরিত্রটার তাঁরই সৃষ্টি।

ঐতিহাসিকদের মতে এই ট্রাউট মেমোর ছত্রে ছত্রে আছে সেই লেখক ইয়ান ফ্লেমিং এর ছাপ। যুদ্ধের সময়ে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য ৫১টা উপায় বাৎলানো হয়েছিল ওই মেমোতে। এর মধ্যে আঠাশ নম্বরটা ছিল আরেক প্রাক্তন ইনটেলিজেন্স অফিসার এবং লেখক বাসিল থমসনের লেখা থেকে প্রভাবিত। এই পরামর্শটির পাশে ব্র্যাকেটে লেখা ছিল খুব সুখকর নয়।

পরামর্শটি ছিল এরকম – একটা মৃতদেহকে বৈমানিক হিসাবে সাজিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া যেতে পারে। দেখে মনে হবে যেন যুদ্ধের মাঝে কোনও দুর্ঘটনায় বা শত্রু আক্রমণে মারা গিয়েছে লোকটা। আর তার পকেটে রেখে দেওয়া হবে ভুল তথ্য। সেই তথ্য বিভ্রান্ত করবে শত্রুকে। এমন মৃতদেহ সংগ্রহ করাই যেতে পারে নৌবাহিনীর হাসপাতাল থেকে।

এই উপায়টা প্রথমে পছন্দ হয়নি কারো।

এরপর চার বছর কেটে গিয়েছে। যুদ্ধে হিটলার প্রায় অপ্রতিরোধ্য। তাঁর নাৎসি জার্মানির হাতে একে একে পতন ঘটেছে বিশ্বের বহুদেশের। ১৯৪২ সালে, আফ্রিকায় প্রথম সাফল্যের মুখ দেখল মিত্রবাহিনী। ঠিক হল পরবর্তী আক্রমণ করতে হবে ইউরোপেই। কিন্তু কোথায় করা যায়? দুটো সম্ভাব্য আক্রমণের জায়গা স্থির হল। ইতালির পায়ের কাছে দ্বীপ সিসিলি। অথবা মেডিটেরেনিয়ানের গ্রিস ও তার আশপাশের দেশগুলো। মিত্রশক্তির রণকৌশল ঠিক করার লোকের প্রত্যেকেই একমত। আক্রমণ করতে হবে সিসিলিতেই।

কিন্তু বাদ সাধলেন খোদ ব্রিটিশ প্রাইমমিনিস্টার চার্চিল। মিত্র শক্তি যে সিসিলি আক্রমণ করবে সেটা একটা বোকা লোকও বুঝতে পারবে।

টমি গান হাতে চার্চিল

অতএব ঠিক হল বিভ্রান্ত করতে হবে হিটলারকে। এই বিভ্রান্ত করার জন্য শুরু করা হল অপারেশন বার্কলে।

আর এর কিছুদিন আগেই সেপ্টেম্বর মাসে স্পেনের উপকূলে ভেঙে পড়ল অ্যামেরিকান বিমান। এই বিমানে ছিলেন অ্যামেরিকার লেফটেন্যান্ট জেমস হ্যাডেন টার্নার। টার্নার ছিলেন কুরিয়ার। যুদ্ধের অনেক গোপন নথি তিনি নিয়ে যাচ্ছিলেন জিব্রালটারে। এই বিমানেই ছিলেন একজন ফরাসী এজেন্টও।

সমুদ্রের স্রোতে ভেসে টার্নারের দেহ আটকেছিল স্পেনের উপকূলে। সেই দেহ উদ্ধার করে স্প্যানিশরা। উদ্ধার করে ফরাসি এজেন্টের নথিও। কদিন পরেই ফেরৎ আসে টার্নারের দেহ। বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারেন, টার্নারের নথি খোলেনি স্প্যানিশরা। কিন্তু একই সময়ে ব্রিটেনের গুপ্তচরেরা জানতে পারেন, যে ফরাসি এজেন্টের নথি কিন্তু স্প্যানিশদের থেকে হাতে পেয়েছিল জার্মানরা। স্পষ্ট হয় স্পেন আর জার্মানির গোপন আঁতাত।

চামলি আর মন্টাগিউ

আর এরপরেই ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা সংস্থা এম আই ৫-এ কর্মরত চার্লস চামলির মাথায় খেলে ইয়ান ফ্লেমিং-এর দেওয়া সেই পুরোনো আইডিয়া। লন্ডনের কোনও হাসপাতাল থেকে নেওয়া মৃতদেহের ফুসফুসে জল পুরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় সমুদ্রে। দেখে মনে হবে যেন কোনও বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে লোকটা। আর তার পকেটে পুরে দেওয়া জাল নথি দিয়ে সহজের বিভ্রান্ত করা যেতে পারে শত্রুপক্ষকে।

চামলির সঙ্গে এই কাজে লেগে পড়েন আরেক এম আই ৫-এর অফিসার ইয়েন মন্টাগিউ। তাঁদের সাহায্য করেন ব্রিটেনের গুপ্তচর সংস্থা এম আই ৬ এর অফিসার ফ্র্যাংক ফলি। তাঁরা যোগাযোগ করেন প্রখ্যাত প্যাথোলজিস্ট স্যার বার্নার্ড স্পিলবারির সঙ্গে। স্পিলসবারি জানান, বিমান দুর্ঘটনায় মৃতদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই মৃত্যু ঘটে শক থেকে। তাই ফুসফুসে জল না থাকলেও কোনও অসুবিধা নেই। আর রোম্যান ক্যাথলিক স্প্যানিশরা ধর্মবিশ্বাসের কারণেই পোস্টমর্টেম এড়িয়ে যায়। খুব দরকার না পড়লে খুব ভালো ভাবে পোস্টমর্টেম করবে না তারা।

কিন্তু মৃতদেহ কোথায় পাওয়া যাবে? চামলি যোগাযোগ করেন লন্ডনের উত্তর ডিসট্রিক্টের করোনার বেন্টলি পারচেজের সঙ্গে। তবে যুদ্ধের জন্য অনেক মৃতদেহ পাওয়া গেলেও সেই শবটাকে এমন কাজে ব্যবহার করা সহজ নয় মোটেই। কারণ মৃতদেহ অনেক হলেও সবারই দাবিদার আছে।

অবশেষে পাওয়া গেল একটা মৃতদেহ। দরিদ্র, প্রায় উন্মাদ গ্লাইন্ডার মাইকেলের। দারিদ্র আর অবসাদে ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল মাইকেল। বেন্টলি পারচেজ জানালেন, আপাতভাবে অনেকদিন সমুদ্রে ভেসে থাকা শবের মধ্যে সামান্য বিষ পাওয়া গেলে সন্দেহ হবে না পোস্টমর্টেম করা ডাক্তারের। তবে এই শবদেহ রাখতে হবে ফ্রিজের ভেতর ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর থেকে কম তাপমাত্রায় জমে যাবে মৃতদেহ। আর যে করেই হোক তিন মাসের মধ্যেই শেষ করে ফেলতে হবে অপারেশন। তার পর মৃতদেহ পচে নষ্ট হয়ে যাবে।

এই অপারেশনের নাম দেওয়া হল মিনসমিট। বাংলায় মাংসের কিমা। লেগে পড়লেন চামলি আর মন্টাগিউ। লাশের জন্য বেছে নেওয়া হল জনপ্রিয় মার্টিন নামটা। তৈরি করা হল নকল পরিচিত ক্যাপ্টেন (অ্যাক্টিং মেজর) উইলিয়াম মার্টিনের। তিনি রয়্যাল মেরিনসের কম্বাইন্ড অপারেশন হেডকোয়ার্টারে কর্মরত। এম আই ৫-এর ক্লার্ক জিন লেসলির ছবি তুলে তাঁকে সাজানো হল এই কাল্পনিক উইলিয়াম মার্টিনের প্রেমিকা ‘প্যাম’। প্যামের দুটো নকল প্রেমপত্রও তৈরি করা হল। জোগাড় করা হল হিরের আংটি কেনার একটা ৫৩ পাউন্ডের আসল রসিদ। তৈরি করা হল নকল মার্টিনকে লেখা তাঁর বাবার একটা চিঠি। পারিবারিক উকিলের লেখা একটা চিঠিও তৈরি করা হল। ব্রিটেনের লয়েড ব্যাংকের একটা ৭৯ পাউন্ডের ঋণশোধ করার নোটিসও জোগাড় হল। এই সমস্ত চিঠি লেখা হল বিশেষ কালিতে, যাতে জলে ধুয়ে যাবার পরও সেইগুলো পড়া যায়।

প্যামের ছবি

এতেই থামলেন না চামলি আর মন্টাগিউ। মাইকেলের সঙ্গে চেহারার মিল আছে,  এম আই -৫ এর ক্যাপ্টেন রনি রিডের ছবি তুলে তৈরি করা হল নকল পরিচয়পত্র। নতুন পরিচয়পত্র দেখে যাতে সন্দেহ না হয়, সেজন্য আসল পরিচয়পত্র হারিয়ে ফেলার পর ইস্যু করা ডুপলিকেট ব্যবহার করা হল। মন্টাগিউ পরের কয়েকদিন ধরে ক্রমাগত সেই পরিচয় পত্রগুলো প্যান্টে ঘষে ঘষে যতটা সম্ভব পুরোনো আদল আনার চেষ্টা করলেন।   চামলি নিজেই পরে ঘুরলেন এই ইউলিয়াম মার্টিনের নতুন ইউনিফর্ম। যাতে সেটা দেখে একদম নতুন না লাগে।

যুদ্ধবিঘ্নিত ইংল্যান্ডে তখন আন্ডারওয়্যার রেশন করা হচ্ছে। জোগাড় করা হল অক্সফোর্ডের নিউ কলেজের ওয়ার্ডেন, সদ্যমৃত হার্বার্ট ফিশারের উলের আন্ডারওয়্যার।

সংবাদ পত্রে ছাপা মেজর উইলিয়াম মার্টিনের মৃত্যুসংবাদ

এতেই শেষ নয়। যতটা সম্ভব আসল পরিচিতি দিতে, মেজর মার্টিনের পকেটে রাখার জন্য জোগাড় করা হল একটা স্ট্যাম্পের বই, একটা সিলভার ক্রশ আর একটা সেন্ট ক্রিস্টোফারের মাদুলি। পকেটে রাখা হল সিগারেট, দেশলাই, পেন্সিল, চাবি আর একটা শার্ট কেনার রসিদ। এর সঙ্গে রাখা হল সিনেমা হলের টিকিটের অংশ। আর নৌবাহিনীর ক্লাবের চারদিনের বিল। ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল লন্ডনে কী কী করেছে মেজর মার্টিন তার একটা আভাস রাখা হল।

আর তারপর দেহটা পুরে ফেলা হল ২১ পাউন্ড ওজনে একট্যা ক্যানিস্টারে। ড্রাই আইস সমেত। এই ড্রাই আইস গলে বার হবে কার্বন ডাই অক্সাইড। ফলে পচবে না বডিটা।

১৪ মে, জার্মানির বেতারের কোড ভাঙার পর, অ্যামেরিকায় প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একটা মেসেজ পেলেন। ‘মিনসমিট ছিপ, বড়শি এবং টোপ সমেত গিলে ফেলেছে সঠিক লোকেরা।’

উন্মাদ, আত্মহত্যা করা, গরিব একটা লোকের মৃতদেহই বিপথে চালিত করল হিটলারকে। সিসিলি থেকে বেশিরভাগ সেনাই তিনি সরিয়ে নিলে গ্রিসে।

২৫ জুলাই সিসিলি আক্রমণ করল মিত্রশক্তি। সহজেই এই যুদ্ধ জিতে নিল তারা। সিসিলির পতনের পর, স্পেনের রাজা সরিয়ে দিলেন ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিকে। ইউরোপের ভেতর ক্রমে ক্রমে এগোতে থাকল মিত্রবাহিনী।

হিটলারকে হারানোর এই বুদ্ধি আসলে সেই ইয়ান ফ্লেমিং-এর। শুধু জেমস বন্ডের লোমহর্ষক স্পাই থ্রিলারই নয়, তাঁর কল্পনাশক্তি কাজে লেগেছে সত্যিকারের যুদ্ধেও।

 

Shares

Leave A Reply