শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

লক্ষ্মী ঝাঁপির কড়ি মোটেও ফেলনা নয়, জানুন অমূল্য কড়ি-কাহিনি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পানসুপারি, কদমা-বীরখণ্ডী দেওয়া নৈবেদ্য, খরুলি আর কড়ি। মানে টাকা-কড়ির কড়ি। লক্ষ্মীপুজো এলেই শব্দগুলো পরপর মনে পড়ে যায়। আচ্ছা, একটা কড়ি মানে ঠিক কত, মানে সেই কড়ি দিয়ে কতটা জিনিস কেনা যেত?

কড়ি

ঠিক কবে থেকে কড়ির প্রচলন তা বলা সম্ভব নয়, তবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, অন্তত দশ হাজার বছর আগে বিনিময়ের মাধ্যম ছিল কড়ি। তবে যে সে কড়ি দিয়ে কেনাবেচা করা যেত না। মালদ্বীপ থেকে আনা সাদা রঙের কড়িই টাকা হিসাবে ব্যবহার করা হত। কোনও কড়ি খুব হালকা রঙেরও হত। এই সব কড়ির বৈজ্ঞানিক নাম সাইপ্রিয়া মনেটা।

মেসোপোটেমায় টাইগ্রিসে যে রঙিন কড়ি পাওয়া যেত, সেই কড়ি বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হত না, কারণ নদী থেকে যে কেউ কড়ি সংগ্রহ করতে পারেন। রঙিন ও আকারে বড় সেই কড়ি মূলত গয়নায় ব্যবহার করা হত। এর বৈজ্ঞানিক নাম সাইপ্রিয়া টাইগ্রিস।

বিনিময়ের কড়ি

শুধু ভারত নয়, উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও বিচ্ছিন্ন ভাবে কড়ি ব্যবহার করা হত বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে।
একটা কড়ি দিয়ে কতটা জিনিস কেনা যেত, সেটা অবশ্য একটা বড় প্রশ্ন। ৪০টি কড়িতে এক পয়সা হত। তখন এক পয়সার চল্লিশ ভাগের এক ভাগেরও দাম ছিল। বৈতরণী পার হতে আজও কড়িই লাগে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, জীবন শেষে পার হতে হয় বৈতরণী নদী, তাতে দিতে হয় পাঁচটা কড়ি। সেই কড়ি মাটির কলসে দিয়ে শেষ বিদায় জানাতে হয় প্রিয়জনকে।

টাইগ্রিসের কড়ি

মরাহাজা শব্দটা আজকাল আর শোনা যায় না। যখন স্বাস্থ্যপরিষেবা এত ভালো ছিল না তখন সন্তান জন্মের পরেই মারা যাওয়া ছিল একরকম স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই সন্তানকে তাই নিকটজনকে দান করে দিয়ে তাকে কড়ির বিনিময়ে কিনে নিতেন মা। বিজোড় সংখ্যার কড়ি দিয়েই কেন কেনা হত, তা অবশ্য জানা নেই। কড়ির সংখ্যা দিয়ে নাম হত সন্তানের – এককড়ি, তিনকড়ি থেকে ন’কড়ি পর্যন্ত।
কড়ি ছিল হাল্কা, তাই কড়ির ভিতরে শিশা ঢেলে অনেক সময় তা ভারী করে নেওয়া হত।

একক কড়ি

কচ্ছের কড়ি

মুদ্রার একক যেমন টাকা-আনা-পয়সা-ডলার… তেমনি টাকার একক ছিল কড়িও। গুজরাতের কচ্ছ একসময় ছিল করদ রাজ্য। ব্রিটিশ আমলে সেই রাজ্যে যে মুদ্রা চলত, তার নাম ছিল কড়ি। ২৪ দোকড়ায় হত ১ কড়ি। কড়ি হত রুপোর, ওজন মোটামুটি পৌনে পাঁচ গ্রাম। আর ব্রিটিশদের রুপোর টাকার ওজন ছিল সাড়ে এগারো গ্রামের সামান্য বেশি। একটু হিসাব কষলেই কচ্ছের কড়ির মূল্য বার করে ফেলা যাবে।
কড়ি ছিল আফ্রিকাতেও। তাই পশ্চিম আফ্রিকার ঘানার আধুনিক মুদ্রাতেও সেই কড়ির ছবি থাকে, এখনও। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচাকে নিয়েও পয়সা আছে।

গ্রিসের ১ ইউরো

পেঁচার পয়সা

পেঁচা উড়লে নাকি বাতাস কাঁপে না। অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে তুলে নেয় মেঠো ইঁদুরের প্রাণ। সম্পদও আসে নিঃশব্দে, যায়ও একই ভাবে। সম্পদ পাহারা দিতে হয় নিঃশব্দে, বিনিদ্র থেকে। সম্ভবত সেই জন্যই দেবী লক্ষ্মীর বাহন হল পেঁচা।


(বাঁ দিকে), লক্ষ্মীর সরা, (ডান দিকে) তেত্রাদাখম (মানে চার দ্রাখমা)

পেঁচা শুধু একা দেবী লক্ষ্মীর বাহন নয়, গ্রিসের জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী এথেনার বাহনও। গ্রিসের নানা মুদ্রায় সেই পেঁচা ঘুরেফিরে এসেছে। একদম প্রাচীন যুগে তেত্রাদাখম (মানে চার দ্রাখমা) থেকে হাল আমলের গ্রিসের এক ইউরোতেও রয়েছে পেঁচা – ঠিক সেই পেঁচা যেটা খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ বছর আগেও গ্রিসের তেত্রাদাখমে ছিল।

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

তাহু ফল, ঐশ-রোষ ও পিগমি সমাজ

Comments are closed.