বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

কাশ্মীরের অবন্তীপুরে ১২০০ বছরের ঐতিহাসিক বিষ্ণু মন্দির! দেখভাল করছেন আজিজ

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

প্রথম দেখায় মনে হয়, যেন টাইম মেশিনে চড়ে কয়েকশো বছর পিছিয়ে গিয়েছি। ভুল ভাঙে অচিরেই। টাইম মেশিনে চড়ে আমি পিছোইনি, সময়টাই আটকে রয়েছে কয়েকশো বছর আগে। ফলে বর্তমানের চোখে ধরা পড়া দৃশ্য যেন ইতিহাসের একটা টুকরো।

কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অবন্তীপুর। বহুকাল আগে, মহারাজা অশোকের সময়ে এই অবন্তীপুরই ছিল কাশ্মীরের রাজধানী। সেখানেই রয়েছে রাজ্যের একমাত্র বিষ্ণু মন্দির।

ইতিহাস বলছে, কাশ্মীর মুসলিম শাসনাধীনে আসে ১৪ শতকে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান থেকে ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে জোজিলা গিরিপথ দিয়ে এসে কাশ্মীর দখল করে নেন সম্রাট কর্ণ সেনা। শোনা যায়, তাঁর সেনাপতি, নৃশংস অত্যাচারী দুলুচা তাঁর চলার পথে সমস্ত শহর, গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলে। সেই সময় থেকেই কাশ্মীরের হিন্দুদের সংকট শুরু হয়।

তাঁর পরে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণকারী রাজা রিনচিন কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক হয়েছিলেন। এর পরে ক্ষমতায় আসেন শাহ মীর। কাশ্মীরের মুসলিম শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন ছিলেন সহনশীল, তেমনই অনেকে ছিলেন চরম অসহিষ্ণু। কাশ্মীরের সপ্তম মুসলিম শাসক সিকান্দার শাহ মিরি (১৩৮৯-১৪১৩) ছিলেন চরম অত্যাচারী। শোনা যায়, তিনি সমস্ত মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং হিন্দুধর্ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন উপত্যকায়। আর তার পরেই ধ্বংস হয়ে যায় এই বিষ্ণু মন্দিরও।

তবে মন্দির ধ্বংসের কারণ সেই অত্যাচার নাকি ১৪২৬ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্প, তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।

মন্দিরের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক মহম্মদ আজিজ। ১০ বছর কাজ করছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে। সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছেন এই মন্দিরের। এতদিন মন্দিরের দায়িত্বে ছিলেন এক পাঞ্জাবি মানুষ। সম্প্রতি, অগস্ট মাস থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে কাশ্মীর জুড়ে অশান্তি শুরু হওয়ার পরে তিনি চলে গিয়েছেন এলাকা ছেড়ে। তাই তাঁরই দায়িত্ব বর্তেছে মহম্মদ আজিজের উপরে।

মহম্মদ আজিজ।

বড় যত্ন করে ঘুরে ঘুরে দেখালেন গোটা বিষ্ণু মন্দির। আজিজ জানালেন, আজ থেকে ১২০০ বছর আগে এই অবন্তীপুরই রাজধানী ছিল কাশ্মীরের। উৎপলা বংশের রাজা অবন্তীবর্মা দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছিলেন কাশ্মীর বিজয়ে। তিনিই স্থাপন করেন দু’টি মন্দির। শিব মন্দির এবং এই বিষ্ণু মন্দির। এই বিষ্ণু মন্দির থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত শিব মন্দিরটি। অবন্তীবর্মার নাম অনুযায়ীই এই জায়গার নাম হয় অবন্তীপুর।

আজিজ বললেন, “প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ৫০০ বছর পরে, ১৪২৬ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে গোটা অবন্তীপুর ছারখার হয়ে গিয়েছিল। এই মন্দিরও ধ্বংস হয়ে যায়। শেষমেশ মাটির তলায় চলে গিয়েছিল গোটা মন্দিরটি। শুধু প্রধান ফটক মাটির ওপরে দেখা যেত। তার পর থেকে ওই অবস্থাতেই ছিল মন্দিরটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভুলেও গিয়েছিল। ১৯১৩ থেকে ১৯২৩ সালে বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সঙ্গী দয়ারাম সাহানি খনন শুরু করেন ওই ফটকের সূত্র ধরে। তাতেই সকলকে অবাক করে আত্মপ্রকাশ করে এই গোটা বিষ্ণু মন্দির। জানা যায় ইতিহাসও।”

ভাবা যায়, কাশ্মীরের একমাত্র বিষ্ণু মন্দির উদ্ধারকাজেও জড়িয়ে আছে বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদের নাম!

মন্দিরের কারুকার্যে বারবার ফিরে আসে বিভিন্ন রকম তিনকোনা আকার। একটা পাথরে খোদাই করা রয়েছে, রাজা অবন্তীবর্মার মূর্তি। তাঁর দু’পাশে দুই রানি, এবং দুই বাঘ। এই মন্দিরের কারুকার্যের সঙ্গে মিল রয়েছে মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দিরেরও। তবে অবাক ব্যাপার, গোটা মন্দির নির্মাণে ব্যবহার করা হয়নি কোনও চুন, বালি বা ওই ধরনের কিছু। কোনও গাঁথনিই নেই গোটা মন্দিরে। অদ্ভুত সুচারু এবং শৈল্পিক ভাবে ইটের সঙ্গে ইট ‘ইন্টারলক’ করে বানানো হয়েছে সুবিশাল মন্দির। ৩৫ ফিট উঁচু গেটও এমন ভাবেই বানানো। ইট আর কাঠ দিয়ে। কোনও গাঁথনি বা প্যাঁচ বা স্ক্রু-জাতীয় কিছু নেই। তবু খাপে-খাপে বন্ধ করা যেত সেই গেট, কোনও আলাদা তালা-চাবি ছাড়াই।

দেখুন, মন্দিরের ভিডিও।

মহম্মদ আজিজ জানালেন, মন্দিরের ভিতরে রয়েছে পাঁচটা ছোট মন্দির। তার মধ্যেই যেটি বড় এবং প্রধান, সেটি বিষ্ণু মন্দির। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পায়ের নীচে ছিল শেষনাগ। পাঁচটা মন্দিরের সমাহার বলে এই মন্দিরকে পঞ্চপাণ্ডবও বলা হয়। কিন্তু মহাভারতের পাণ্ডবদের সঙ্গে এই মন্দিরের কোনও সম্পর্ক নেই। যদিও অনেকেই পঞ্চপাণ্ডব শুনে এই ভুলটা করেন। কিন্তু মহাভারতের ভূগোল বলে, পাণ্ডবরা হিমাচলপ্রদেশ দিয়ে স্বর্গের পথে চলে গিয়েছিল। তাঁদের সেই পথে স্বর্গারোহিণী নামের শৃঙ্গও রয়েছে হিমাচলে।

পাঁচটি মন্দিরের মধ্যে বিষ্ণু মন্দিরে একটি বিশাল রুপোর বিষ্ণুমূর্তি ছিল বলে জানালেন আজিজ। তবে সে মূর্তি ব্রিটিশরা নিয়ে চলে যায়। বাকি চারটি মন্দির থেকে যে আরও চারটি মূর্তি উদ্ধার হয়, সেগুলি শ্রীনগরের মিউজ়িয়ামে রাখা আছে।মহম্মদ আজিজের দাবি, গোটা কাশ্মীরে বেশ কিছু কালী ও শিব মন্দির থাকলেও, এত পুরনো বিষ্ণু মন্দির এই একটিই আছে।

তবে শুধু ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, অন্য একটি বিষয়ের জন্যও এই বিষ্ণু মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ বিশেষ আকর্ষণীয়। সেই বিষয়টি অবশ্য নেহাতই আধুনিক। ১৯৭৫ সালে এখানেই শ্যুটিং হয় গুলজ়ারের আঁধি সিনেমার বিখ্যাত একটি গানের। আরডি বর্মনের সুরে লতা মঙ্গেশকর ও কিশোরকুমারের গাওয়া ‘তেরে বিনা জ়িন্দেগি সে কোয়ি…’ গানের পটভূমিতে সঞ্জীব কুমার এবং সুচিত্রা সেনকে দেখা যায় এই মন্দিরেই।

গোটা কাশ্মীর জুড়ে যখন দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত হয়েছে হিন্দু ধর্ম, বিতাড়িত করা হয়েছে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের, তখন দীর্ঘ সময় মাটির নীচে ঘুমিয়ে থেকেছে এই আশ্চর্য সুন্দর এবং ঐতিহাসিক মন্দির। খনন করে উদ্ধার হওয়ার পরেও কম অশান্তি চলেনি উপত্যকায়। কিন্তু ইতিহাস আঁকড়ে থেকে গিয়েছে এই ধ্বংসাবশেষটুকু।

বিকেলের আলো ক্রমে মরে আসে। উপত্যকা জুড়ে জেঁকে বসে শীতের হাওয়া। ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে করতে আরও এক বার মনে পড়ে যায়, অশান্তি ও ক্ষোভের এই আবহে এক বিষ্ণু মন্দিরকে আগলে রাখছেন অন্য ধর্মের এক মানুষ। ইতিহাসের কি কোনও ধর্ম হয়!

Comments are closed.