রবিবার, অক্টোবর ২০

ভারতে ৫০ শতাংশেরও বেশি মহিলা হার্টের রোগে ভোগেন, সময় থাকতে সচেতন হতে হবে

কই মাছের প্রাণ বলা হয় যাঁদের, তাঁদের হৃদযন্ত্র আসলে কতটা ছটফটানি সহ্য করতে পারে, বা আদৌ পারে কি? হ্যাঁ, মহিলাদের হৃদয়ের কথাই হচ্ছে।  এই হৃদয় সম্পর্কে আপনি সচেতন তো? কখন এ বিষয়ে সতর্ক হবেন? যে মানুষটি রান্নাঘর আর অফিসের মিটিং একসাথে সামলে চলেছেন প্রতিটা দিন, তাঁর হৃদয় তো ভালো রাখতেই হবে।  কী করা উচিত, মহিলাদের হার্ট ভালো রাখতে? তাঁদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কতটা? কী কী করতে হবে এক্ষেত্রে মুশকিল আসান করতে, তা নিয়েই দ্য ওয়াল কথা বলল বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট হেমন্ত গর্গের সাথে।  জানুন কী বললেন ডাক্তারবাবু…..

দ্য ওয়াল: একটা প্রচলিত ধারণা আছেছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হৃদরোগের ঝুঁকি কম হয়।  এটা কি ঠিক?

ডাঃ গর্গ: ভুল।  মহিলাদের করোনারি অ্যাটাকের ঝুঁকি মোটেই পুরুষদের চেয়ে কম নয়।

দ্য ওয়াল: বাংলা ও ভারতের ক্ষেত্রে মেয়েদের মধ্যে হৃদরোগের প্রবণতা কি বাড়ছেকেন?

ডাঃ গর্গ: হ্যাঁ, পুরুষের অনুপাতে মহিলাদের মধ্যে হৃদরোগ বাড়ছে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন, স্থূলত্ব, ডায়াবেটিসের প্রবণতা বৃদ্ধি, ধূমপান, স্ট্রেস বৃদ্ধি, ফাস্ট ফুডের উপর ভরসা বৃদ্ধি ইত্যাদি, মহিলাদের মধ্যেও এই রোগের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।

দ্য ওয়াল: মেয়েদের কোন বয়সে এই রোগ বেশি হয়?

ডাঃ গর্গমহিলাদের মেনোপজের পর হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  আর ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের মতো রোগ থাকলে মহিলাদের মেনোপজের আগেও হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা হতে পারে।  তখন আর হরমোনের সুবিধাগুলো তাঁরা পান না।
ভারতে পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি মহিলা হার্টের রোগে ভোগেন।  তার মধ্যে ৪৮ শতাংশেরই বয়স ৪৫-৬০ বছরের মধ্যে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই বয়সের প্রায় সব মহিলারই লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা অস্বাভাবিক।  লো ডেনসিটি প্রোটিন (LDL), হাই ডেনসিটি প্রোটিন (HDL) ও ট্রাইগ্লিসারাইড (Triglyceride)পরীক্ষায় দেখা গেছে, উত্তর ভারতের প্রায় ৩৩.১১ শতাংশ ও পূর্ব ভারতের প্রায় ৩৫.৬৭ শতাংশ মহিলার ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল খুব বেশি, আবার দক্ষিণ ভারতের ৩৪.১৫ শতাংশ মহিলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে তাদেরLDL ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি।  কাজেই মেনোপজের পর এই সমস্যা বাড়ে, তবে কোনও কোনওক্ষেত্রে জীবনযাত্রার কারণে এই বিপদ মধ্য তিরিশেও আসতে পারে।

দ্য ওয়াল: মেয়েদের মধ্যে হৃদরোগের কি কোনও আলাদা কারণ থাকে?

ডাঃ গর্গ: বহুল পরিচিত ঝুঁকির কারণগুলি ছাড়াও অল্প বয়সী মহিলাদের অন্য কয়েকটি কারণও রয়েছে।

ধূমপান, ওরাল গর্ভনিরোধক ব্যবহার, ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ওভারি, এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে হরমোনজনিত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও এখন প্রিমেনোপসাল পিরিয়ডের মধ্যে হৃদরোগের প্রবণতা বাড়ছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে হিস্টেরেক্টোমি সম্পর্কে এখন অনেক বেশি জানেন লোকজন।  যাঁরা ৩৫ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সে হিস্টেরেক্টমি করিয়েছেন তাদের এস্ট্রোজেন হরমোনের ক্ষতির জন্য কনজিস্টিভ হার্টের সমস্যা ৪ থেকে ৬-গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  করোনারি আর্টারি ডিজিজের প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দ্য ওয়াল: মেনোপজের পরে কি এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়?

ডাঃ গর্গ: হ্যাঁ, অবাকভাবে, এস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষা মেনোপজের পরে কমে যায় মহিলাদের ক্ষেত্রে।  তাই মেনোপজের পরে এই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হঠাৎই বেড়ে যায়।

আরও জানুন কী বলছেন ডাক্তারবাবু—-

দ্য ওয়াল: হৃদরোগের যে লক্ষ্মণ বা সিম্পটমসে ক্ষেত্রে কি মেয়েদের মধ্যে কোনও আলাদা কিছু থাকে? 
ডাঃ গর্গ: হ্যাঁ, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সাধারণত বুকে ব্যথা ছাড়াই এই ধাক্কা আসার সম্ভাবনা বেশি।  শ্বাসকষ্ট, পেটের অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, ঘাম, মাথা ঘোরা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো কিছু লক্ষণকে এক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব দিতে হবে।  পুরুষদের তুলনায় এক্ষেত্রে জটিলতা বেশি, তাই সমস্যার সমাধান সঠিক সময়ে না খুঁজলে রোগীকে বাঁচানোও মুশকিল হয়ে যায়।  এক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান ধমনী ছাড়াও ছোট ধমনীগুলোতে কিছু বাধা থাকে অনেক সময়ে, তাই সচেতন হতে হবে অনেক বেশি।

দ্য ওয়াল: মেয়েদের মধ্যে কি রোগ হওয়ার আগে কোনও ইঙ্গিত পেলে সেটা চেপে যাওয়ার বা পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতা বেশি?
ডাঃ গর্গ: হ্যাঁ, ভারতে মহিলারা সংসার সামলাতে গিয়ে নিজেদের খুব কম গুরুত্ব দেন।  তাঁরা নিজের প্রয়োজনগুলো ভুলে যান এবং তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করেন।  ভারতে বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারে সদস্যদের চিকিত্সার জন্য অর্থ ব্যয় করতে চায় না।  এখন যদিও ধীরে ধীরে ছবি কিছুটা বদলাচ্ছে।  শহারঞ্চলে তুলনামূলকভাবে সমস্যা কম।  তবে সার্বিকভাবে মহিলাদের অনেকটা বেশি সচেতন হতে হবে।

দ্য ওয়াল: এই রোগ কে দূরে রাখতে কিছু জেনারেল পরামর্শ আছে কি?

ডাঃ গর্গ: আপনার কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড স্তর নিয়ন্ত্রণে রাখুন।  নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখুন, স্বাস্থ্যকর ডায়েটে থাকুন, ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়ন্ত্রণে থাকুন, ধূমপান এবং অ্যালকোহলের অভ্যাস এড়িয়ে চলুন, স্ট্রেস এড়ান, বিএমআই ২৫-এরও কম রাখুন, পর্যাপ্ত ঘুমোন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Comments are closed.