মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

সঠিক লাইফস্টাইল ও চিকিৎসায় মুক্তি পেতে পারেন বন্ধ্যত্ব থেকে

জীবনগাড়ি এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলেই চান। চান ফটোফ্রেমে হাসিখুশি পরিবারের ছবি উজ্জ্বল হয়ে থাক। কিন্তু অনেক সময় সন্তানলাভের স্বপ্ন সফল হয় না। সব কিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও সন্তান আসতে চায় না। কী কী কারণে সন্তানহীন হয়ে থাকতে হয় কোনও দম্পতিকে, কী-ই বা তার চিকিৎসা, এ সব নিয়ে কথা বলতে বিশিষ্ট গায়নোকলজিস্ট ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জীর চেম্বারে দ্য ওয়াল।

কী বললেন ডাক্তারবাবু?

দ্য ওয়াল: বন্ধ্যত্ব আসলে কী?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: এক বছর ধরে পুরুষ ও মহিলা শারীরিক সম্পর্ক মানে আনপ্রোটেক্টেড সেক্সের পরেও যদি সন্তান আসায় সমস্যা হয়, তাকে আমরা বন্ধ্যত্ব বলতে পারি। তবে আজকাল আমরা এই শব্দটা ব্যবহার করি না। সাবফার্টাইল বলা হয়। মানে ফার্টিলিটি কম। সন্তান না হওয়া ২৫ শতাংশ পুরুষদের কারণে, ৫০ শতাংশ মহিলাদের কারণে আর বাকি ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়াই সমস্যার। নারী ও পুরুষের সব প্যারামিটার ঠিক থাকা সত্ত্বেও বাচ্চা আসে না অনেক সময়। আনএক্সপ্লেইনড থেকে যায়। মহিলাদের কারণে যে ৫০ শতাংশ, তার মধ্যে ২৫ শতাংশ ফিমেল এগ ফ্যাক্টর আর বাকি ২৫ শতাংশ ফ্যালোপিয়ান টিউব ফ্যাক্টর কাজ করে।

দ্য ওয়াল: পুরুষদের ক্ষেত্রে ইনফার্টিলিটির কারণগুলো কী কী?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী:  পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রথম কারণ স্পার্ম প্রোডাকশন না হওয়া। সিমেন কাউন্টও কম হতে পারে। কাউন্ট ঠিক থাকলেও মোটিলিটি কম, মানে, স্মার্মগুলো ঠিক মতো এগিয়ে যাচ্ছে কি না দেখা দরকার। আবার সেগুলোতে গঠনগত ত্রুটি থাকতে পারে, বা মর্ফোলজি খারাপ হতে পারে। এ সব থেকেও সন্তান আসতে অসুবিধে হতে পারে। ইরেকশনাল সমস্যা থাকতে পারে।তাতে শারীরিক মিলনে অসুবিধে হতে পারে। এ ছাড়া, থাইরয়েড, সুগার থেকেও সমস্যা হয়।

দ্য ওয়াল: “ইরেকশন” সমস্যায় সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম কতটা থাকে?

ডঃ মল্লিনথ মুখার্জী: শারীরিক মিলনের সময় ইরেকশন বেশিক্ষণ স্থায়ী না হওয়া বা প্রথম থেকেই শরীর সাড়া না দিলে তাকেই ইরেকটাইল ডিসফাংশন বলে। মূল কারণ নানা ধরনের স্ট্রেস। হরমোনাল ওষুধ, সায়কায়াটিক ও প্রস্টেটের ওষুধ খেলেও এমন হতে পারে। এটা শারীরিক না মানসিক সমস্যা তা বোঝার জন্য সাধারণত নকটারনাল পেনাইল টিউমেসেন্স বা এনবিটি বলে একটা পরীক্ষা করা হয়। গভীর রাতে বা খুব ভোরে পেনিস শক্ত হয়ে থাকে কি না টয়লেট করতে যাওয়ার সময় সেই পরীক্ষা করা হয়। যদি দেখা যায় শক্ত হচ্ছে তার মানে সেই ব্যক্তির কোনও শারীরিক সমস্যা নেই। সমস্যাটি মানসিক। সে ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করতে হবে। স্ট্রেস কমাতে হবে। নেশা করা চলবে না, রাত জাগা চলবে না। খাওয়াদাওয়া ঠিক করে করতে হবে। বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক রাখতে হবে।

দ্য ওয়াল: মহিলাদের ক্ষেত্রে কোথা থেকে আসে সমস্যা ? 

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: মেয়েদের ফ্যালোপিয়ান টিউব আর এগ প্রবলেম থাকে। ফ্যালোপিয়ান টিউব ঠিক আছে কি না দেখতে পরীক্ষা করা হয়। টেস্টের সময ভয় পেলে দেহ সঙ্কুচিত হয়ে যেতে পারে। তাই প্রথমেই ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা অনেক সময় বোঝা যায় না। দু-তিনবার পরীক্ষা করা উচিত। আর বাচ্চা নষ্ট হলে বা অ্যাবর্ট করলে ওয়াশ করা হয়। তার থেকে অনেক সময় ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক হয়ে যেতে পারে। পরে আর বাচ্চা হয় না। তাই চেষ্টা করা উচিত ওয়াশ না করে ওষুধ দিয়ে পরিষ্কার করার। কখনও সখনও আগে কোনও পেটের অপারেশন বা বারবার গর্ভপাত করালে ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এগ প্রবলেমের ক্ষেত্রে বয়সটা একটা ব্যাপার। বয়স যত বাড়ে, মেনোপজ়ের দিকে যত এগোয়, তত ডিম্বাণু কমতে থাকে। হরমোনের পরীক্ষা করে সেটা বুঝতে হয়। অনেক সময় এই সব সমস্যা থেকে বাচ্চা আসতে চায় না, বা এলেও নষ্ট হয়ে যায়। বার বার সার্জারি করালে ওভারিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ডিম্বাণুও কমে যায়। এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলেও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে। আর একটা জিনিস আজকাল অনেক মহিলার হয়, তা হলো পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিস। হরমোনের ডিসঅর্ডার থাকলে পিসিওডি হতে পারে। তাতে এগ রিলিজ়ে ও প্রেগন্যান্সিতে সমস্যা হতে পারে। ক্যানসার য়েমন ঠিক সময়ে ধরা পড়লে অনেক সময়ে সারিয়ে ফেলা যায়, এটাও সঠিক চিকিৎসায় আয়ত্তে আনা যায়।

এই “পিসিওডি “নিয়েই ডাক্তারবাবু ঠিক কী বলছেন শুনুন

দ্য ওয়াল: প্রেগন্যান্সির সঠিক সময় কী?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: ২০ থেকে ৩৫। একে পিক ফার্টাইল টাইম বলি ডাক্তারি পরিভাষায়। প্রথম বাচ্চা ৩০-এ হলে পরের বাচ্চা ৩২-৩৩-এ নেওয়া যায়। তবে খুব দেরি করা ঠিক নয়। অন্তত ৩৩-এ প্রথম বাচ্চা নিয়ে নেওয়া ভালো। খুব দেরি করলেও। ৩০ থেকেই প্ল্যানিং দরকার। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে কোনও সময়ের বাধা নেই, তবে স্পার্ম ভালো কোয়ালিটির হওয়াটাই এ ক্ষেত্রে জরুরি।

দ্য ওয়াল: স্পার্ম বা বীর্যে শুক্রাণুর মাত্রা কী হওয়া উচিত ?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: সিমেন অ্যানালিসিসে তার ঘনত্ব দেখলে একএকবার ইজাকুলেশনে ২-৪ এমএল অবধি হওয়া উচিত, আর প্রতি এমএলে অন্তত ২৫-৩০ হাজার স্পার্ম থাকা উচিত। এছাড়াও এতে ৬০-৬৫ শতাংশ অ্যাক্টিভ মোটিলিটি থাকা উচিত। উচিত। ৬৫ শতাংশ “ওভার মর্ফোলজিক্যাল” স্পার্ম থাকা উচিত। ঘনত্বের সঙ্গে সুস্থ সচল স্পার্ম খুব জরুরি।

দ্য ওয়াল: পুরুষত্বহীনতা বা ইমপোটেন্সি আসলে কী? সারিয়ে তোলা যায় কি?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী:: “ইমপোটেন্ট” একটা “ভেগ ওয়ার্ড”। আসলে যে মানুষের কোনওদিন “ইরেকশন” হয়নি তাকে এই তকমা দেওয়া যায়।বাস্তবে সেটা খুব একটা হয় না। কিন্তু ইরেকশন হলেও স্পার্ম নেই যার, সেওতো “ইমপোটেন্ট”। আক্ষরিক অর্থে যে যৌনকাজে অক্ষম তাকে বলা হয় “ইমপোটেন্ট”। এক্ষেত্রে মিলনে অক্ষম না, মিলন ধরে রাখতে অক্ষম, না মিলন হলেও তার স্পার্ম বেরোচ্ছে না, অথবা বেরোলেও তার কোয়ালিটি খারাপ অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। আর পুরোটাই লাইফস্টাইল আর ফুডহ্যাবিট ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। সেগুলো দেখে ট্রিটমেন্ট করলে সারিয়ে ফেলা সম্ভব ।

দ্য ওয়াল: শীঘ্রপতন, ধাতুপতন এগুলো কেন বলা হয়? সমস্যাটা ঠিক কী? সারানো সম্ভব?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: শীঘ্রপতন বা ধাতুপতন ইত্যাদি অনেক কথা শোনা যায় ঠিক। আসলে টেক্স্টবুক ডেফিনেশন বলছে এক থেকে দেড় মিনিটই স্বাভাবিক। তারপরে যদি স্পার্ম রিলিজ হয়, তাহলে অবশ্যই তার ভয় বা শঙ্কার কারণ নেই। কারণ জীবন “পর্নোগ্রাফি” নয়। তাই স্বাভাবিক কী সেটা জানা উচিত। অ্যালকোহল, ধূমপান, ক্যানাবিস বা গাঁজা এগুলো থেকে দূরে থাকা উচিত। নয়তো বন্ধ্যত্ব আসতেই পারে। বাচ্চা হওয়ার পর চাইলে করুন কিন্তু তার আগে নয়।তাতে অবশ্যই প্রভাব পড়বে স্পার্মের উপর।

দ্য ওয়াল: ঘরোয়া কোনও পদ্ধতি আছে যাতে স্পার্ম কাউন্ট বাড়ানো যায়?

ডঃ মল্লিনাথ মুখার্জী: সাধারণ খাওয়া, দুধ, দই, ছানা, ভাত, ডাল, তরকারি, ডিম, ফল খান। সুস্থ থাকুন সার্বিক ভাবে। সারা সপ্তাহ ঘরোয়া খাবারের পরে এক দুদিন রোল-ফুচকা জাতীয় খেলে ক্ষতি নেই। তবে রোজ ওটাই খেলে ক্ষতি। সার্বিক ভাবে সুস্থ থাকতে সময়মতো খেতে হয় খাবার। আর অ্যালোপ্যাথিতে ঘরোয়া টোটকা কিছু নেই। পরিবেশ দূষণ, ভুলভাল খাওয়ার অভ্যাস বা টাইট জিন্স পরা, পকেটে মোবাইল রাখা, বাইক খুব বেশি চালানো ইত্যাদি কোনও না কোনওভাবে নেগেটিভ এফেক্ট দেয়। তাই চেষ্টা করতে হবে এগুলো এড়িয়ে চলতে। খুব গরম জলে স্নান না করা উচিত পুরুষদের। তাদের টেস্টিকল শরীরের বাইরে থাকাতে খুব গরম জল বিপদ আনতে পারে। স্পার্ম কাউন্ট কমে যেতে পারে।

অর্থাৎ সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক জীবন পেতে ঠিকঠাক লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্যকর ফুড হ্যাবিট খুব জরুরি। আর বন্ধ্যত্ব চিন্তার বিষয় হলেও আজকাল সারিয়ে ফেলার উপায়ও অনেক আছে। তাই প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে চলুন।

 

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

 

 

Shares

Comments are closed.