এ বছর ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া খুব জরুরি, চার ধরনের ভাইরাস ঠেকায় এই টিকা

করোনার জ্বর আর ইনফ্লুয়েঞ্জার জ্বরের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। শুরুতে কোভিড সংক্রমণকে ভাইরাল ফ্লু বলেও গুলিয়ে ফেলছিলেন ডাক্তাররা। পরে নিজের আসল রূপ দেখাতে থাকে করোনা। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস রোগ বাঁধালেও তার ছাপ ছেড়ে যায়। অর্থাৎ রোগের লক্ষণ বোঝা যায়, কিন্তু করোনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপিচুপি রোগ ছড়ায়।

৫৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঋতু বদলে জ্বর, সর্দি-কাশির হানায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আছে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট। আর ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরা পড়লে তো কথাই নেই। আরও এক সংক্রামক ভাইরাস যা শরীরকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। এতদিন ভাইরাল ফ্লু নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছিল মানুষজন, এ বছরে চেপে বসেছে করোনাভাইরাস। ইনফ্লুয়েঞ্জার সমগোত্রীয় না হলেও রোগের ধরনে মিল আছে। আবার করোনার কোপে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি তথা ভাইরাল ফ্লুয়ের সব উপসর্গই পরপর দেখা দেয়। করোনাভাইরাস এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস যে একসঙ্গে শলা পরামর্শ করে শরীরে হানা দেবে না, সে গ্যারান্টি কে দিতে পারে। তাই বছরটাই ফ্লু ভ্যাকসিনের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনার জ্বর আর ইনফ্লুয়েঞ্জার জ্বরের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। শুরুতে কোভিড সংক্রমণকে ভাইরাল ফ্লু বলেও গুলিয়ে ফেলছিলেন ডাক্তাররা। পরে নিজের আসল রূপ দেখাতে থাকে করোনা। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস রোগ বাঁধালেও তার ছাপ ছেড়ে যায়। অর্থাৎ রোগের লক্ষণ বোঝা যায়, কিন্তু করোনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপিচুপি রোগ ছড়ায়। শরীরে সংক্রমণ থাকলেও তার প্রকাশ নেই। হঠাৎ করেই একদিন প্রবল জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা হার্ট অ্যাটাক। খাদ্যনালীতে সংক্রমণ বা কিডনি ফেলিওর। চিকিৎসার আগেই মৃত্যু হচ্ছে রোগীর। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাকে রোখার টিকা এখনও আসেনি। কিন্তু ইফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাল ফ্লু-কে কাবু করার টিকা বাজারে আছে। যদিও এই টিকা করোনা থেকে কতটা সুরক্ষা দেবে সেটা বলা যাচ্ছে না, তবে প্রতিরোধের একটা উপায় যে গড়ে তুলবে সেটা নিশ্চিত। কোভিড সংক্রমণে যে রোগগুলো হচ্ছে তার থেকে কিছুটা হলেও রেহাই দিতে পারবে।


করোনা তাড়াবে না, তবে শরীরের ঢাল হতে পারে ফ্লু ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাসের সঙ্গে পরিচয় হালে। এতদিন ভাইরাল ফ্লু নিয়েই আতঙ্কে ভুগতেন মানুষজন। শীতের দেশগুলিতে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ খুবই বেশি। ‘আমেরিকান লাঙ অ্যাসোসিয়েশন’  তাদের একটি সমীক্ষায় বলেছিল, প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের দাপটে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় আমেরিকায়। বিশ্বজুড়েই ভাইরাল জ্বরের কারণে প্রতি বছর মৃত্যু হয় বহু মানুষের। তাই ডাক্তাররা, ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে রাখতে বলেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস করোনার মতো অত দ্রুত ছড়ায় না। অসুখ ধরা পড়ে ২-৩ দিনের মধ্যে। ১০৩-১০৪ ডিগ্রি জ্বর উঠতে পারে, সেই সঙ্গে মাথা যন্ত্রণা, গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি, পেশীর ব্যথা, খিঁচুনি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। বাড়াবাড়ি হলে নিউমোনিয়ার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। ফ্লু ভ্যাকসিন সেক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইসব উপসর্গ দেখা গেছে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও। যদিও করোনার সংক্রমণে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগে ৭-১৪ দিন, কখনও বা তারও বেশি। অনেক সময় উপসর্গ দেখাই দেয় না। জ্বর হলেও নামতে চায় না, ওষুধে কাজ করে না খুব একটা, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয় রোগী। কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লু ভ্যাকসিনে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা কিছুটা হলেও এইসব রোগ থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে। করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে না এই ভ্যাকসিন, তবে কোভিড সংক্রমণের কারণে যে রোগগুলি হচ্ছে বা হওয়ার ঝুঁকি থাকছে তার থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে। কিছুটা হলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে পারবে এই ভ্যাকসিন, যা এই সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

ফ্লু ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে?

সাধারণত তিন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস হানা দেয় মানুষের শরীরে। সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা যাতে জ্বর-সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একে বলে মরসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা যা ঋতু বদলের সময় জাঁকিয়ে বসে। দ্বিতায় হল জুনোটিক ইনফ্লুয়েঞ্জা যা প্রাণী থেকে ছড়াতে পারে যেমন বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু। তৃতীয় হল, মহামারীর আকার নিতে পারে এমন ইনফ্লুয়েঞ্জা। যেমন ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছিল এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়ার ১৪ দিন পর থেকেই রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নিষ্ক্রিয় স্ট্রেন থেকে তৈরি টিকা রক্তরসে মিশে গিয়ে বি-কোষকে সক্রিয় করে তোলে। মেমরি বি-কোষ জেগে ওঠে। ‘অ্যাডাপটিভ ইমিউন রেসপন্স’ তৈরি হয় শরীরে। যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় রক্তে তার স্থায়িত্বও বেশি। করোনার অ্যান্টিবডির মতো কম দিন টিকে থাকে না। একবার ফ্লু ভ্যাকসিন নিলে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা পাওয়া যায়।

 

চার ধরনের ভাইরাসের সঙ্গে লড়ে ফ্লু ভ্যাকসিন

চার রকমের ফ্লু ভ্যাকসিনের শট আছে। একে বলে কোয়াড্রিভ্যালেন্ট ফ্লু ভ্যাকসিন। একই সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (H1N1)ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (H3N2) ভাইরাস ও দু’রকমের ইনফ্লুয়েঞ্জা বি ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন। ট্রাইভ্যালেন্ট ভ্যাকসিনের ডোজও আছে যা এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাস, এইচ৩এন২ ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাস ও এক রকম ইনফ্লুয়েঞ্জা বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ট্রাইভ্যালেন্ট ফ্লু ভ্যাকসিন ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য খুবই জরুরি। প্রবীণদের শরীরে এই ভ্যাকসিনের ডোজ জোরালো রোগ প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোয়াড্রিভ্যালেন্ট ফ্লু ভ্যাকসিনের অনেক রকম শট আছে যেমন আফলুরিয়া কোয়াড্রিভ্যালেন্ট, ফ্লুয়ারিক্স কোয়াড্রিভ্যালেন্ট, ফ্লুলাভাল কোয়াড্রিভ্যালেন্ট ও ফ্লুজ়োন কোয়াড্রিভ্যালেন্ট। নানা বয়সীদের জন্য ভ্যাকসিনের শট নির্ধারিত আছে। যেমন আফলুরিয়া কোয়াড্রিভ্যালেন্ট কম ডোজে ৬ মাসের শিশুকে দেওয়া যায়। আবার এই ভ্যাকসিনেরই জেট ইঞ্জেকশন দেওয়া যায় ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের। তখন ডোজের মাত্রা বয়স অনুপাতে ঠিক করেন ডাক্তাররা। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে ল্যাবরেটরিতে সংশ্লেষ করে তার থেকে ফ্লুসেলভ্যাক্স কোয়াড্রিভ্যালেন্ট টিকা তৈরি হয়। এই টিকা চার বছর ও তার বেশি বয়সীদের দেওয়া হয়।


এ বছর ফ্লু ভ্যাকসিন ‘মাস্ট’

৬ মাস বয়সের পর থেকেই ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া যায়। প্রতি বছর এই টিকা নিয়ে রাখা শরীরের সুরক্ষার জন্য জরুরি। বিশেষজ্ঞরা এ বছরটাকেই বেশি জোর দিচ্ছেন। সংক্রামক ভাইরাসের সঙ্গে লড়ার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি বেশিরভাগেরই। ভাইরাল স্ট্রেনের সঙ্গে শরীরকে পরিচয় করাতেই ফ্লু ভ্যাকসিনের শট নেওয়া জরুরি। করোনার টিকা আসতে এখনও দেরি আছে। ততদিনে ফ্লুয়ের টিকা শরীরের বি-কোষ ও টি-কোষকে সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করবে। সবটা না হলেও ভাইরাসের প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর মতো শক্তি জোগাবে শরীরকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্টোবরের পর থেকই ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়। এ বছর আবার করোনার প্রভাবও আছে। তাই দুই ভাইরাসের হামলা থেকে বাঁচতে আগেভাগেই সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। অনেক ফার্মা কোম্পানি সেপ্টেম্বর থেকেই ফ্লু ভ্যাকসিনের শট দিতে শুরু করবে। শিশু ও কম বয়সীদের সেপ্টেম্বর থেকেই ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া হবে। প্রবীণ ও হাই-রিস্ক গ্রুপের সদস্যদের অক্টোবর থেকে টিকা দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যেকেরই উচিত টিকার ইঞ্জেকশন নিয়ে রাখা। সর্দি-কাশি, জ্বর বা নিউমোনিয়ার প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। শ্বাসের সমস্যা রয়েছে যাদের তাদের ক্ষেত্রে এই টিকা খুবই উপযোগী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More