শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ‘যোগ’ সফল, বলছে বিজ্ঞান

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের সনাতন ধর্ম শিক্ষার মতে আত্মশুদ্ধির প্রধান পথই হলো যোগসাধনা। দেহ ও মনকে শুদ্ধ করে নিজেকে চেনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয় যোগ। চার্বাক দর্শন ছাড়া ভারতের প্রায় সব দর্শন স্বীকার করে যোগ হলো নিজেকে চেনার শ্রেষ্ঠতম উপায়। স্মৃতি, বেদ, উপনিষদ ও পুরাণেও যোগের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার হয়েছে।

    ‘যুজ্’ ধাতুর সঙ্গে ‘ঘঞ্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘যোগ’ শব্দটি এসেছে । ‘যুজ্’ ধাতুর দু’টি অর্থ, সংযোগ ও সমাধি প্রভৃতি। ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার (নফসের সঙ্গে রুহ-এর মিলন) সংযোগ বা মিলনকে যোগ বলেছেন।

    ভারতীয় আধ্যাত্মদর্শনে অন্যতম প্রভাবশালী দর্শন হলো যোগ দর্শন। এই দর্শনের সূত্রকার মহর্ষি পতঞ্জলি। তিনি তাঁর যোগসূত্র’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় সূত্রে বলছেন-

    যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’।- (যোগসূত্র)
    অর্থ : : চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ।

    চিত্তবৃত্তি-নিরোধের জন্যই চিত্তশুদ্ধি, সংযম ও ধ্যানের অবতারণা। যোগের সাহায্যে কাম, ক্রোধ, মোহ, অনুরাগ, স্নেহ এই পাঁচটি চিত্তবৃত্তি পরিহার করতে পারলে মানুষের মুক্তি লাভ হবে।  যিনি যোগ পদ্ধতির সাহায্যে নাভি, মস্তক, কণ্ঠ, হৃদয়, বক্ষ, চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা প্রভৃতি স্থানে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগ করাতে পারবেন তিনিই মুক্তি লাভ করবেন।

    আমরা  যোগ (YOGA)মানেই শারীরিক কসরৎ বা ব্যায়াম ভাবি। আসলে যোগ কিন্তু একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শরীর, মন, ও আত্মাকে সর্বোচ্চ স্তরে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল। যোগ হচ্ছে ভারতের আধ্যাত্মিক চিন্তায় মানসিক ও শারীরিক কলুষতা দূর করার একটা পথ।

    অন্যদিকে, বিজ্ঞানও মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করে মানুষের আয়ু বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের অনেক আগে থেকে ভারতীয় যোগদর্শন সেই কাজটি কয়েক হাজার বছর ধরে করে আসছে। সেটা কিন্তু মেনে নিয়েছে বিজ্ঞান।

    বিজ্ঞানের চোখে যোগের সাফল্যের ব্যাখ্যা

    যোগ মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে
    এখন মানুষের মানসিক চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর থেকে নিখরচায় মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হল যোগ। মানব শরীরের স্নায়ুতন্ত্র ও বিভিন্ন হরমোন মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিলেও, বহুদিন ধরে চাপ বা স্ট্রেস থাকলে সেই ক্ষমতা  বিপর্যস্ত  হয়ে পড়ে। কিছু হরমোন স্ট্রেস বাড়ানোর কাজ শুরু করে দেয়। ফলে মানুষটি আরও মানসিক চাপে ভুগতে শুরু করে। এই অবস্থায় যোগ মানসিক চাপের উৎসে পৌঁছয়, শরীর ও মনে প্রশান্তি আনে। নিয়মিত যোগাভ্যাসে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও কলাকোষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। মানসিক চাপ চিরতরে সরে যায় জীবন থেকে। ফলে মানসিক চাপ থেকে সৃষ্টি হওয়া রোগগুলিও কমে যায়।

     যোগ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে ভারসাম্য আনে
    স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের (autonomic nervous system) দুটো ভাগ আছে। স্বতন্ত্র (sympathetic nervous system) ও পরাস্বতন্ত্র (parasympathetic nervous system)। সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম আপৎকালীন অবস্থা বা বিপদের সময় যে শারীরিক পরিবর্তনগুলি ঘটায়। যেমন চোখের তারারন্ধ্রকে প্রসারিত করা, রক্তনালীকে সংকুচিত করা, হৃদগতি বাড়িয়ে দেওয়া, ঘামের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেওয়া।

    অন্যদিকে, প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম, সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের বিপরীত কাজ করে। একে অপরের পরিপূরক হয়ে শরীরকে সুস্থতা দেয়। এই দুই তন্ত্রের ভারসাম্যের অভাব ঘটলে অসুস্থতা দেখা যায়। যোগের ফলে এই দু’প্রকার অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা পায় ও সার্বিক স্বাস্থ্যর উন্নতি ঘটে।

    হোমিওস্ট্যাটিক অবস্থাকে পুর্নবিন্যাস করে 

    আশপাশের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে, মানুষের শরীরের আভ্যন্তরীণ পরিবেশের সামঞ্জস্য বজায় রাখাকেই  হোমিওস্ট্যাটিস্ বলে।
    মানব শরীরের প্রত্যেকটা কোষ ও কলা আশপাশের পরিবর্তনের সঙ্গে অল্পবিস্তর মানিয়ে নিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে তার কাজ করে চলে। আমাদের কিছু কিছু টিস্যুর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম, আবার কিছু কিছু টিস্যুর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বেশি। যখন আমাদের দেহে হরমোনের ক্ষরণ হয়, তখন এই দুই ধরণের টিস্যুর মধ্যে প্রতিক্রিয়া (ফিডব্যাক) তৈরি হয়। এই প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাকগুলোই কোষকে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে দেয়। অগোছালো ও বেপরোয়া জীবনযাত্রা, এই পদ্ধতির স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করে দেয়। তখন নিয়মিত যোগাভ্যাস মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থার সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনে।

    জীবনযাত্রার মানের উন্নতি
    যোগ মানুষের মনের শান্তি, আনন্দ, সুখ ও আত্ম-সচেতনতা নিয়ে আসে। এই পজিটিভ অনুভূতিগুলো আমাদের সুস্থ্য জীবনযাত্রার অন্যতম ভিত। এমনকি, যাঁরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন ( দুরারোগ্য রোগী বা মুমূর্ষু রোগী) তাঁদের জন্যও যোগ খুব উপকারি, কিছুটা হলেও তাঁদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দূর করতে যোগ সক্ষম। যোগ, আমাদের শরীরের শিথিলতা, ধীর ও স্থির শ্বাসপ্রশ্বাস এবং শান্ত মন ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করে তোলে।

    ভারতীয় গবেষক প্রমাণও দিয়েছেন

    বেঙ্গালুরুর   NIMHANS  এর গবেষক ডঃ রামজয়ম জি (Dr Ramajayam G) তাঁর গবেষণায় মানব শরীরে যোগাভ্যাস জনিত উপকারিতার স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যোগাভ্যাস করলে কিছুদিনের মধ্যে মানব শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।ডঃ রামজয়ম বলছেন, যোগাভ্যাস করলে,

    ●রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার(immune system) উন্নতি হয়

    ●রক্তের চাপ (ব্লাড প্রেসার) নিয়ন্ত্রণে থাকে

    ●হার্টের গতিবেগ বা রেট কম হয়

    ●অক্সিজেন ব্যবহারের হার বাড়ে

    ●হজম ক্ষমতা বাড়ে

    ●শরীরে বিষের (toxic substance) উৎপাদন কমিয়ে দেয়

    ●নার্ভ ও মাসলের যোগাযোগেরও (neuro-muscular coordination) উন্নতি হয়

    ● হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে

    আমরা জানি বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক চিরকালই শীতল। একে ওপরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে এসেছে শত শত বছর ধরে। কিন্তু এটাও বাস্তব, মানুষের শরীর ও মনকে  চুড়ান্ত ভাবে সক্রিয় অবস্থায় নিয়ে যেতে যোগের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের দ্বিমত নেই।  ‘ক্লেশ তিমির বিনাশো যোগ প্রদীপ’ অর্থাৎ যোগ প্রদীপের প্রভায় শারীরিক ও মানসিক ক্লেশ দূর হয়। মানছে বিজ্ঞানও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More