শনিবার, মার্চ ২৩

পঞ্চাশ পেরোলে কেন প্রস্টেটের সমস্যা হয় পুরুষদের, কী-ই বা তার সমাধান?

মহিলাদের ‘মেনোপজ’ এর মতো পুরুষদেরও হয় ‘অ্যান্ড্রোপজ’, আর তাতে সমস্যাও অনেক।  কী সেই সমস্যা, কী ভাবে আটকানো যায় একে, কেনই বা হয় এই সমস্যা যাকে আমরা প্রস্টেট-এর সমস্যা বলে জানি। কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট ডঃ অমিত ঘোষের সঙ্গে। কী বললেন তিনি দ্য ওয়াল-কে……

দ্য ওয়াল: প্রস্টেটের সমস্যা কী? কেন হয়?
ডঃ অমিত ঘোষ: পুরুষের সেক্স গ্ল্যান্ডই হল প্রস্টেট। টন্সিল যেমন শরীরের একটা গ্ল্যান্ড, তেমনই এটাও একটা গ্ল্যান্ড, এই গ্ল্যান্ড নিয়েই পুরুষ জন্মায়, মহিলাদের এই গ্ল্যান্ড থাকে না।  বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের হর্মোনের বদলের জন্য যেমন “মেনোপজ” হয়, পুরুষেরও ৫০ বছরের পর হর্মোনের পরিবর্তনের জন্যই অ্যান্ড্রোপজ হয়।  তখনই প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের আকারে পরিবর্তন আসে।  মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডার এবং মূত্রনালী বা ইউরেথ্রার জংশনে আংটির আকারে থাকে।  সুপুরির মতো সাইজের হয়।  ফলে যখনই প্রস্টেট গ্ল্যান্ড বড় হতে শুরু করে তখনই সেটা মূত্রনালিকে চেপে ধরে।  ইউরিন ক্লিয়ার হয় না তাতে।  ফলে ৫০-এর পরে এই সমস্যা হয় পুরুষদের।  একে ডাক্তারি পরিভাষায় হলা হয় “এনলার্জড প্রস্টেট” বা “বি পি এইচ” অর্থাৎ “বিনাইন হাইপারট্রফি অফ প্রস্টেট”।

দ্য ওয়াল: উপসর্গ কী কী?
ডঃ অমিত ঘোষ: বয়স ৫০ বছর পেরোলে এই গ্ল্যান্ড ফুলে যায় বলে ইউরেথ্রাকে চেপে ধরে, তাই ইউরিন পাস করার করার সমস্যা হয়।  গতি কমে যায়, বারবার যেতে হয়।  দিনের বেলা বারবার টয়লেটে যেতে হয়।  রাতের বেলা যেটা হয় তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় nocturia… অর্থাৎ গতি কমে যায়।  ফলে দেরি হয় পুরোটা বের হতে।  বারবার যেতে হয় কারণ একবারে পরিষ্কার হয় না।  এভাবে বারবার হতে হতে ইউরিনটা জমে যায় তলপেটে। ব্যথা হতে থাকে। তাকে বলা হয় retention of urine.
এই জমে থাকা ইউরিনেই যদি সংক্রমণ হয়, তাতে ইউরিন্যারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হয় হয়। জমা জলে যেমন মশা জন্মায়, তেমনই এক্ষেত্রেও জমে থাকা ইউরিনে ব্যাকটিরিয়া জন্মে ইউ.টি.আই. হয়।  পুরুষ মহিলা দুজনেরই হতে পারে ইউ.টি.আই.।  ব্যথা হতে শুরু করে তলপেটে।  তাই সমস্যা হলে শুরুতেই যেতে হবে ডাক্তারের কাছে।

দ্য ওয়াল: সাময়িক সমাধানের রাস্তা কতক্ষণ থাকে?
ডঃ অমিত ঘোষ: প্রথমেই অপারেশনের দরকার হয় না।  বাড়তে থাকলেই অপারেশন তা নয়, রোগীর অসুবিধে কতটা হচ্ছে  সেটা এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ।  শুরুতে ওষুধ দিয়ে সারানো যেতেই পারে।  তবে এক্ষেত্রে গ্ল্যান্ড কতটা ফুলছে এবং মূত্রনালীকে কতটা চেপে ধরছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।  সাধারণত প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের ১০-১৫ গ্রাম ওজন হয়, ২০-৩০ গ্রাম হতে শুরু করলে তখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।  ধীর গতি, বারবার টয়লেটে যেতে হলে, ব্যথা শুরু হলে বুঝতে হবে ব্লাডারের মধ্যে হয়তো প্রস্টেট গ্ল্যান্ডটা ঢুকে গেছে।  তখন অবশ্যই যান ডাক্তারের কাছে।  শুরুতেই ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়।  এরপরেও না সারলে তখন অপারেশন করতে হয়।

দ্য ওয়াল:  যে কোনও বয়সের পুরুষেরই কি এই সমস্যা হতে পারে?
ডঃ অমিত ঘোষ: সাধারণত বয়স ৫০ পেরোলে এই সমস্যা হয়।  তবে কখনও কখনও তার আগেও এই সমস্যা দেখা যায়।  সেটা খুব কম হয়।  চিকিৎসা করার পর সেক্স লাইফ ঠিক থাকলেও প্রজনন ক্ষমতায় অসুবিধে আসে।  reproduction হয় না।

দ্য ওয়াল: ছোটবেলার কোনো চোট বা আঘাত কতটা প্রভাব ফেলে?
ডঃ অমিত ঘোষ: না, চোট বা আঘাতের প্রভাব মূত্রনালীতে থাকলেও প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের উপর থাকে না।

দ্য ওয়াল: প্রস্টেট গ্ল্যান্ড ফুললে সেটা থেকে ক্যানসারের আশঙ্কা কতটা থাকে?
ডঃ অমিত ঘোষ: দুভাবে বড় হয় প্রস্টেট গ্ল্যান্ড, এক নাক-চোখ-হাত-পায়ের মতো।  “বি পি এইচ” অর্থাৎ “বিনাইন হাইপারট্রফি অফ প্রস্টেট” বলা হয় একে।  যা পুরুষের ৫০ বছরের পরে হয়।  আরেকটা একদমই আলাদা, ক্যানসার প্রস্টেট।  এখন বাড়ছে অনেক বেশি।  একটা মাত্র ব্লাড টেস্ট করলেই বোঝা যায় আজকাল ক্যানসার প্রস্টেট হয়েছে কি না! আজকাল জনসংখ্যা বাড়তে থাকার কারণে এই ক্যানসার প্রচুর হচ্ছে।  তবে এটা একেবারেই আলাদা একটা বিষয়, এর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই সাধারণ প্রস্টেটের।  ক্যানসার প্রস্টেটের জন্য prostate specific antiegen test বা psa test করতে হয়।  এই অ্যান্টিজেন ০-৪ হলে সাধারণ, তার উপরে থাকলে সেটাই চিন্তার।  ডাক্তাররা ডিজিট্যাল রেক্ট্যাল এক্সামিনেশনের মাধ্যমে বুঝতে পারেন এর অপারেশন দরকার কি না।  কাজেই পরীক্ষা করা খুবই সহজ।

দ্য ওয়াল: এই গ্ল্যান্ডের আকারে পরিবর্তন কতটা বিপজ্জনক?
ডঃ অমিত ঘোষ: বিপজ্জনক তো বটেই।  তবে হর্মোনাল ইনফ্লুয়েন্সে এই সমস্যা হয়।  মানুষের শরীরে নারী পুরুষ দুরকম হর্মোনই থাকে।  যেমন ৫০-এর পরে হর্মোনাল পরিবর্তনের জন্য মেনোপজ আসে মহিলাদের, ফলে তাদের লাবণ্য কমতে থাকে, গলার স্বরে পুরুষালি ভাব আসে।  তেমনি পুরুষদেরও শরীরে মহিলা হর্মোনের প্রভাব বাড়তে থাকে।  তাই প্রস্টেটের সমস্যা হয়।  টেস্টোস্টেরন এ সময়ে কমতে থাকে পুরুষদের।  মহিলা হর্মোনের প্রভাব বাড়তে থাকে।  আর সমস্যা বাড়তে থাকে।

প্রস্টেটের সমস্যা আর কী কী রোগ ডেকে আনতে পারে, জানুন ডাক্তারবাবুর কাছেই

দ্য ওয়াল: শুক্রাণু তৈরিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এই সমস্যা? পুরুষের বন্ধ্যত্ব এই সমস্যার জন্য কতটা দায়ী?
ডঃ অমিত ঘোষ: টেস্টিস শুক্রাণু তৈরি করে।  টেস্টিস আলাদা একটা অঙ্গ।  তাই প্রস্টেটের সমস্যায় শুক্রাণু তৈরিতে কোনও সমস্যা হয় না।  প্রস্টেটের কাজ হল তৈরি হওয়া শুক্রাণুকে ব্যবহার না হওয়া পর্যন্ত তরতাজা রাখার ফ্লুইডটা কিছুটা দেওয়া।  তাই সরাসরি এর কোনও প্রভাব সে অর্থে নেই।  প্রস্টেট বাদ দেওয়া হলে সমস্যা হতে পারে প্রজননে, কিন্তু প্রজনন হবে না এমনটা নয়।
প্রস্টেট বাদ দিলেও সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটি থাকে, শুক্রাণুর কোনো সমস্যা হয় না। প্রস্টেট বাদ দিলে বা ওষুধ দিলে সিমেন ইজাকুলেশন হয় না, কিন্তু তৈরি হয়।  সিমেন তখন ব্লাডারে গিয়ে মূত্র দিয়ে বেরিয়ে যায়।  কারণ প্রস্টেট গ্ল্যান্ডটা থাকে না তখন।  তবে এক্ষেত্রে বয়সকালে এই সমস্যা থাকে বলে সিমেনের সমস্যাটা বিশেষ সমস্যার হয় না।  কিন্তু ইয়ং এজে কারো এ জাতীয় সমস্যা হলে সেক্ষেত্রে তার সিমেনটা কাজে লাগানোই যায় ধরে রেখে।  সেক্ষেত্রে টেস্টটিউব বেবি তৈরি করতে কোনও সমস্যাই হয় না।

দ্য ওয়াল: অপারেশনের পরে বন্ধ্যত্ব কাটতে পারে?
ডঃ অমিত ঘোষ: মাইক্রোসার্জারি করা হয়।  সাধারণত TURP বা trance urethral resection of prostate করা হয়। এতে মেরুদণ্ডে ইঞ্জেকশন দিয়ে অবশ করে অপারেশন করা হয়।  সাধারণত জ্ঞান থাকে এই অপারেশনের সময়। এছাড়া লেজার অপারেশনও করা যায়।  ২-৪ সপ্তাহে মানুষ হেঁটে চলে বেড়াতে পারেন।  তবে অপারেশনের পরে শুক্রাণু তৈরি হবে, কিন্তু ইজাকুলেশন হবে না।  মানসিক সমস্যা হয় অনেক সময়।  অর্গ্যাজম হবে কিন্তু ইজাকুলেশন হবে না।  কারণ গ্ল্যান্ডটাই আর থাকে না।

দ্য ওয়াল: ঘরোয়া কোনও সমাধানের রাস্তা আছে না অপারেশনই একমাত্র রাস্তা ?
ডঃ অমিত ঘোষ: না কোনও সমাধানের রাস্তা সেভাবে নেই।  শুরুতে ওষুধ দিয়ে না কমলে অপারেশনই একমাত্র রাস্তা।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Shares

Comments are closed.