শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ঘন ঘন বায়ুনিঃসরণ প্রমাণ করে আপনি সুস্থ আছেন

 

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উনিশশো সত্তরের দশকে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেনানায়ক ইয়াকুবু গওন।  সরকারি সফরে এসেছেন ব্রিটেনে। রানি এলিজাবেথ স্বয়ং এসেছেন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া রেলস্টেশনে অভ্যর্থনা জানাতে। সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াকুবুকে নিয়ে  বাকিংহাম প্যালেসের দিকে এগিয়ে যাবে মহারাণীর রাজকীয় অশ্ববাহী শকট। প্রেসিডেন্ট ইয়াকুবুকে নিয়ে মহারাণী এলিজাবেথ যেই শকটে উঠে মেরু শিয়ালের পশমে মোড়া গদীতে উপবেশন করেছেন, অমনি একটি আরবী ঘোড়া সশব্দে বায়ুনিঃসরণ করলো।  মহারাণী এলিজাবেথ পড়লেন অস্বস্তিতে। তিনি ইংল্যান্ডের রাণী, সরাসরি কীভাবে ক্ষমা চাইবেন!  তাই তিনি স্মিত হেসে প্রেসিডেন্ট গওনকে বললেন, “আমি দুঃখিত, এদেশে আপনার শুরুটা খুব ভালো হলো না।” প্রেসিডেন্ট ইয়াকুবু  নাকি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেছিলেন, “আপনার ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া আমি ভেবেছিলাম, ওটা নিছকই একটি ঘোড়ার কাণ্ড”। অস্বস্তিতে গুম মেরে গিয়েছিলেন মহারাণী এলিজাবেথ। তাঁর নিশ্চয়ই ঘোড়াটাকে চাবকাতে ইচ্ছে করছিল।

 ঘৃণা করে সমাজ

সত্যিই মানব সমাজে বায়ু নিঃসরণকে একটি অতি ঘৃণ্য কাজ বলে মনে করা হয়। জনসমক্ষে এটি সশব্দে করলে তো সম্মানের বারোটা বেজেই গেলো। এমনকি নিঃশব্দে করলেও উপস্থিত সবাই একে অপরকে সন্দেহ করবেনই করবেন। এ দায় কেউই নিজের কাঁধে নিতে চান না। কিন্তু জানেন কি এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজটি আদৌ খারাপ নয়, অনেক ক্ষেত্রে জীবনদায়ীও। তবুও  সমাজে সাধারণ মানুষ থেকে জ্ঞানীগুণীরা এই বায়ু নিঃসরণকে নিন্দার চোখে দেখে আসছেন। তাই তো বাংলা সাহিত্যে কৈশোরের প্রেমের সঙ্গে বায়ুনিঃসরণের তুলনা করা হয়েছে।

 “পশ্চাৎ দ্বারা নির্গত বায়ু যেমন সুগন্ধের হয় না,
                                          অপ্রাপ্ত বয়সে প্রেমও তেমনি পরিপক্ক হয় না বা ভবিষ্যত সুফল বয়ে আনে না…..”

বায়ু নিঃসরণ কেন হয়!

আমাদের শরীরে খাদ্য পরিপাকের পরিণতি হিসেবে মলের সঙ্গেই এই বায়ু সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই বায়ু মলনালীতে ধীরে ধীরে সঞ্চিত হয়। এবং মলনালীর বায়ু ধারণ ক্ষমতার বেশি বায়ু মলনালীতে জমে গেলে মলদ্বারের পেশী ঠেলে এই বায়ু নির্গত হয়। বায়ুনিঃসরণ এমন একটি কাজ, যা করলে শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু স্থান কাল ভেদে এর জন্য জীবনে প্রত্যেককেই কখনও না কখনও লজ্জায় পড়তে হয়েছে। তবে,

লজ্জার দিন বোধহয় শেষ

কারণ, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ঘন ঘন বায়ুনিঃসরণ  প্রমাণ করে আপনি সুস্থ আছেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে নীচের তথ্যগুলি পড়ুন।

● পুরুষের চেয়ে মহিলারা কম বার বায়ু নিঃসরণ করেন।

● একজন সাধারণ সুস্থ সবল মানুষ দিনে ১২ বার বায়ু নিঃসরণ করেন।

●  যে পরিমাণ বায়ু একবারে নিঃসৃত হয়, তাতে একটা বেলুন ফোলানো যায়।

● বায়ু নিঃসরণের জন্য একদম লজ্জিত হবেন না। কারণ এটা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। যদি আপনার হজম ঠিকঠাক হয় তবেই আপনি বায়ু নিঃসৃত করবেন। যদি আপনি মনে না করতে পারেন, শেষ কবে বায়ু নিঃসরণ করেছেন, তাহলে এক্ষুণি ডাক্তারের কাছে যান। আপনার শরীর ভালো নেই।

●  গুহ্যদ্বার দিয়ে নিঃসৃত বাতাসের মূল উপাদান হলো হাইড্রোজেন সালফাইড। যেটি আমাদের কোষের ভেতরে থাকা শক্তি উৎপাদনকারী অঙ্গাণু  মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্ষতি হতে দেয় না। তাই নিঃসৃত বায়ুর গন্ধ যতই আপনার কাছে অসহনীয় হোক। শরীরের পক্ষে তা শুভ।

● মহিলাদের বায়ু নিঃসরণ পুরুষদের তুলনায় সংখ্যায় কম হলেও, তাঁদের নিঃসরণ করা বায়ুতে পুরুষদের তুলনায় গন্ধ বেশি থাকে। কারণ মহিলাদের দ্বারা নিঃসৃত বায়ুতে হাইড্রোজেন সালফাইডের পরিমাণ বেশি থাকে।

● আপনার নিঃসৃত বায়ুর গতিবেগ জানেন ?  প্রতি সেকেন্ডে ১০ ফুট।

● গুহ্যদ্বারের পেশি (anal sphincter)  যত শক্তপোক্ত  ও টাইট হবে, বায়ু নিঃসরণের শব্দ ততো বেশি হবে। কারণ বাতাসকে অনেক লড়াই করে বেরোতে হচ্ছে।

● যদি আপনি প্রচুর চুইংগাম চিবোন, সোডা জাতীয় পানীয় পান করেন, কাঁচা স্যালাড খান, মুলো, ফুলকপি, ব্রকোলি, বাঁধাকপি ইত্যাদি সবজি খান, বোতল থেকে ঢক ঢক করে জল পান করেন, বেশি মিষ্টি খান, আপনার বায়ু নিঃসরণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কুছ পরোয়া নেহি, আপনার ভালোর জন্যই এটা হচ্ছে।

● আমাদের রোজকার জীবনে আমরা সবচেয়ে বেশি বায়ু নিঃসরণ করি ঘুমন্ত অবস্থায়।   .

● এ বার একটা ক্যুইজ, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বায়ু নিঃসরণ করে কোন প্রাণী?  উত্তর হলো উইপোকা। দেখতে ছোট হলেও পৃথিবীর সব প্রাণীর তুলনায় বায়ু নিঃসরণে তারা এগিয়ে। বায়ু নিঃসরণের দৌড়ে ফটোফিনিশে দ্বিতীয় হয়েছে উট। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান দখল করেছে জেব্রা ও গরু।

● নিউ সাউথ ওয়েলসের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ক্লেয়ার কলিন্স, মানবদেহ থেকে বায়ুনিঃসরণ ( farting)  নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত, ”বায়ু নিঃসরণকে জোর করে আটকালে পেটের মধ্যে অস্বস্তি তো হয়ই, এর ফলে পেট ফাঁপতে থাকে। আটকে দেওয়া বায়ুর কিছুটা পুনরায় আমাদের অন্ত্রের প্রাচীরে শোষিত হয় এবং আমাদের রক্ত সংবহনতন্ত্রে মিশে যায়। রক্তের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে ফুসফুসে আসে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের সময়  মুখ দিয়ে এই দুর্গন্ধযুক্ত বায়ু নির্গত হয় তা। বাকিটা পায়ুপথ দিয়েই নির্গত হয়।

●  ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির বিশ্ববিখ্যাত গবেষক স্টাইন ভাহোম, তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তে বলেছেন, ‘‘দেখা গিয়েছে যাঁরা স্বাস্থ্যকর খাবার খান তাঁরা প্রায়শই গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণ করে থাকেন। এবং যাঁরা স্বাস্থ্যকর খাবার খান না তাঁদের মধ্যে বায়ু নিঃসরণেরর প্রবণতা কম থাকে। ঘন ঘন বায়ু নিঃসরণের ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। ক্যান্সার, টাইপ টু ডায়বেটিস, স্ট্রোক, এমনকি হার্টের অসুখও দূরে থাকে।

Shares

Comments are closed.