বুধবার, আগস্ট ২১

আমরা সবাই বিশ্বাসহীনতায় ভুগছি……

সোহিনী চক্রবর্তী

প্রথম ছবি পরিচালনা করার সময় প্রযোজককে বলেছিলেন, “আমার কিচ্ছু লাগবে না। শুধু ক্যামেরাটা ভাড়া করে দিন।” ছবি শেষে উপার্জন হয়েছিল এক টাকা। সেটাও আবার ভাগ করে নিয়েছিলেন পার্টনারের সঙ্গে।পকেটে এসেছিলো ৫০ পয়সা। কিন্তু তার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক হিট ছবি। বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের মনেও তাঁর জায়গা এখন পাকাপোক্ত। তিনি পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, thewall.in -এর সঙ্গে দিলেন দিলখোলা আড্ডা।

 

‘হামি’ শুনলেই আপনার প্রথম কী মনে হয়?

>আমার ছোটবেলা। আমার স্কুলের দিনগুলো। বরানগরে কাটানো আমার শৈশব। আক্ষরিক অর্থে ওগুলোই আমার কাছে ‘হামি’-র সমান। বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র আমি। স্কুলের মাঠে খেলা থেকে নানারকম দুষ্টুমি এইসবই মিশে রয়েছে হামিতে।

মিশনের প্রভাব শিবপ্রসাদের জীবনে কতটা?

>প্রচুর। মিশনে না পড়লে হয়তো আমি জীবনকে এ ভাবে দেখতামই না। এখন যেভাবে আমি ভাবি, জীবনকে দেখি সবটাই মিশনের জন্য। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো বরানগর মিশনের ওই স্কুল জীবনটা।একদিকে মিশনের কড়া অনুশাসন। সঙ্গে আবার রয়েছে উদার চিন্তার বিকাশ। ভাবুন একবার বছরে ৬টা নাটক হতো আমাদের সময়ে। কবিতা কম্পিটিশন হতো। আর একটা কথা না বললেই নয়, মিশনেই আমি সমাজের সব স্তরের মানুষকে আমার সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম। এটা একটা বড় পাওনা। আর একটা মজার ঘটনা আছে। আমার কাছে এটা একটা রহস্যও বটে। আমাদের সঙ্গে তখন মিশনে ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত একটি মেয়ে পড়তো। নাম কঙ্কনা মহাপাত্র। এখন এটা কোনও অভিভাবক ভাবতে পারবে বলুন? কিন্তু তখন পেরেছিল। তার কারণ মিশন। মিশনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।

জিডি বিড়লার ঘটনা নিয়েই কি ‘হামি’?

>না। সমসাময়িক অনেক ঘটনা নিয়েই ‘হামি’ গল্পটা বানানো। কোনও বিশেষ একটি স্কুলের ঘটনা নিয়ে নয়। দেখুন অভিভাবক আর স্কুল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের জায়গাটা এখন একেবারে তলানিতে গিয়ে থেকেছে। শুধু স্কুল বা অভিভাবক নয় সমাজের সবক্ষেত্রেই বিশ্বাসের বড় অভাব। আমরা সবাই ভীষণ ভাবে বিশ্বাসহীনতায় ভুগছি। যে খাবার এতদিন খেয়ে এলাম এখন শুনছি সেটা নাকি ভাগাড়ের। প্রতিপদে মনে হচ্ছে ঠকছি। কিন্তু সব খারাপের মধ্যেও তো কিছু ভালো রয়েছে। আর সেই ভালোটা দেখানোর জন্যই ‘হামি’। আমি চাইলেই খুব সিরিয়াস মোড়কে হামি বানাতে পারতাম। কিন্তু হাসতে হাসতে কঠিন কথা সহজ করে বলাটাই তো আসল মজা। আর ওটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।

লাল্টু দত্ত থেকে লাল্টু বিশ্বাস। বারেবারে লাল্টুই কেন?

>রামধনুর লাল্টু আর হামির লাল্টু কিন্তু মতাদর্শে এক। জীবনটা এঁদের কাছে ভীষণ সহজ সরল। অত জটিলতা এঁরা বোঝেন না। ইনফ্যাক্ট আমি আমার আশেপাশে প্রতিনিয়ত এ ধরণের লাল্টুদের দেখতে পাই। আর এঁদের মধ্যে কিন্তু ‘এতো খারাপের মাঝেও অনেক কিছু ভালো রয়েছে’-এই বিশ্বাসটা আছে। আর এই বিশ্বাসের জন্যই লাল্টুরা বারবার ফিরে আসে।

বাচ্চাদের নিয়ে দু’টো ছবি করলেন। কোনও মজার ঘটনা?

>পুরোটাই তো মজার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই মজা। একটা ঘটনা বলি। এক বাচ্চা রোজ টাই চিবিয়ে খায়। তো টিচার তাকে বলছে তোমায় স্কুল থেকে আর একটাও টাই দেওয়া হবে না। সব শেষ হয়ে গিয়েছে। তাতে বাচ্চাটি বলে ‘আন্টি তুমি চাপ নিও না। মাকে বলবো এই টাইটা জেরক্স করে তোমায় অনেক টাই দিতে।’ আসলে বাচ্চারা তো এমনটাই হয়। সহজ-সরল। তবে একটা কথাই বলবো ‘হামি’ আমার খুব কাছের ছবি। ইচ্ছে থাকলেও সবটা দেখাতে পারিনি। আফটার অল সিনেমা তো। আর এমন সুন্দর সব জিনিসের জন্য একটা সিনেমা বড্ড কম।

সাধারণ মানুষের রোজনামচাই আপনার ছবির বিষয় কেন?

>কেন নয় বলুন? আমিতো একজন সাধারণ মানুষ। আর পাঁচটা লোকের সমস্যাগুলো তো আমাকেও নাড়া দেয়। আর যে জিনিসটা আমাকে রোজ হন্ট করছে সেটা নিয়ে আমি ছবি করবো এটা তো গর্বের কথা। তাই না? মানুষ যদি ছবি দেখতে এসে সেটার সঙ্গে নিজেকে মেলাতেই না পারে তাহলে আর আমি কী ছবি বানালাম। আর ছবি তো আমার কাছে আমার সন্তান। তাই নিজের সবটুকু দিয়ে সবার ভালোলাগার মতো করেই সিনেমা বানানোর চেষ্টা আমি করি। এখন কিছু মানুষের ভালো লাগবে। কিছু মানুষের লাগবে না। এটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার।

পকেটে ৫০ পয়সা থেকে আজকের শিবপ্রসাদ। জীবন কতটা পাল্টেছে?

>একটুও না। একদম একই আছে। আজও আমি আমার সিনেমার জন্য নৈতিকতা বজায় রেখে সবটা করবো। আমি ‘হয় না’ তে বিশ্বাসী নই। আর যখন যা কিছু অনৈতিক হবে আমি তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবোই।আজকে যখন আমাকে কার্যত হুমকি দেওয়া হয় যে বিশেষ কোনও একটি হলকে বর্জন করতে হবে, নাহলে বাকি আরও সাতটা হল আমি পাবো না, সেখানেও আমার ক্ষেত্রে কিন্তু নীতিবোধটাই আগে কাজ করবে। সাতটা হল যায় যাক। কিন্তু ওই একটা হল আমার চাই।

অনেকে বলে আপনি পলিশড হরনাথ চক্রবর্তী। কী বলবেন?

>দেখুন আপনি ভালো কাজ করবেন আর লোকে দু’টো বাজে কথা বলবে না সেটা হয় না। ধোনি একটা ম্যাচ ফ্লপ করলেই লোকে সমালোচনা শুরু করে। ইউটিউবে গুপী গাইন বাঘা বাইনের ভিডিওতেও বেশ কিছু ডিসলাইক রয়েছে। এখানেও ব্যাপারটা সেরকমই। ইনফ্যাক্ট এটা থাকাটা দরকার। আর হরদার সঙ্গে তুলনা হওয়ায় আমি একটুও লজ্জিত নই। বরং গর্বিত। কারণ হরদাই প্রথম ‘ইচ্ছে’ দেখে বলেছিলেন, ‘শিবু এ ছবিতে কিন্তু মাস আছে।’ তখন কথাটা বুঝিনি। এখন বুঝি। আর দেখুন দশ বছর তো হয়ে গেলো। করে তো খাচ্ছি রে বাবা। সেটাও দর্শকদের ভালোবাসা পাশে নিয়েই। তাই যাঁরা নিন্দে করেন তাঁদের বলবো কিছু করে দেখালে ভালো লাগবে। দেখুন ‘ইচ্ছে’ দেখে বহু প্রযোজক হল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ইনফ্যাক্ট এক নামজাদা প্রযোজক তো বলেছিলেন ‘আমার ছবিটা দেখে ঘেন্না হলো। এরম একজন মোটা মেয়েকে আপনি সিনেমায় নিলেন?’ তবে সবাই যে খারাপটাই বলেন বা বলেছেন তা নয়। এমন অনেকে আছে যাঁরা একসময় বলতেন রিমেক ছবি করলে টাকা দেবেন, তাঁরাই আজ আমার স্বকীয়তার প্রশংসা করে বলেন ‘শিবু তুইই ঠিক ছিলি’। এগুলোই তো পাওনা বলুন।

উদাহরণে আসছে ধোনি-বিরাট। মেসি রোনাল্ডো নয় কেন?

>ক্রিকেটটা আমি নিয়মিত দেখি। আসলে একসময় খেপ খেলতাম তো। ওটাই আমার রোজগার ছিল। সিনেমা না বানালে ওটাই করতাম আমি। আমার স্ট্রেস কাটানোর ওষুধও ক্রিকেট। এখন তো আর সেভাবে মাঠে গিয়ে খেলা হয় না। তাই বাড়িতেই প্লে স্টেশনে আমি প্রায় রোজ ক্রিকেট খেলি।

Leave A Reply