আলি-লাভলির জিমন্যাস্টিকসের ভিডিও ভাইরাল, কিন্তু বাকিরা? প্রশ্ন ‘দ্রোণাচার্য’র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    তারা সোশ্যাল মিডিয়ার সেলিব্রিটি। স্কুলে যাওয়ার পথে তাদের অসাধারণ ভল্ট খাওয়ার ভিডিও শহর-দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে জিমন্যাস্টিকস সম্রাজ্ঞী নাদিয়া কোমামেচির কাছে। প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রশংসাই বিশ্বের দরবারে চিনিয়ে দিয়েছে দুই রত্নকে– লাভলি এবং আলি। গার্ডেন রিচের হাইড রোড এলাকায়, সিপিটি কোয়ার্টার বস্তির দুই ছেল-মেয়ে।

    কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি তাদের যাত্রা। সরকারের নজর পড়েছে তাদের উপর। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (সাই)-তে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ার সঙ্গে তাদের বাস্তব জীবনের ফারাক লক্ষ যোজন। প্রথমে ভাবা গেছিল, এলাকায় পৌঁছে তাদের খোঁজ করলেই হয়তো সকলে দেখিয়ে দেবেন ঠিকানা। কিন্তু ডক এলাকার শ্রমিক বস্তির চেহারা এ সব থেকে অনেক দূরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কী ভাইরাল হয়েছে, কে নাদিয়া কোমামেচি– তাই দিয়ে এই মানুষগুলোর কিছু যায় আসে না। এসে যায় দু’বেলা দু’মুঠো ভাত দিয়ে।

    অপরিসীম দারিদ্র্য। ছোট্ট ঘুপচি ঘরে মাদুর পাতা। চার-পাঁচ জনের বাস ওই ঘরের ভিতরেই। বাইরে ফালি রান্নাঘর, আরও বাইরে কমন টয়লেট। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ১২ মাস জমে থাকে জল-কাদা। ভ্যাপসা গন্ধে আচ্ছন্ন চার পাশ। এখান থেকেই, রোজ ভরপেট না খেয়ে, এই ছেলে-মেয়েগুলো এমন সুন্দর জিমন্যাস্টিকস শিখেছে! এই অসাধ্য সাধনের পেছনে কে আছেন!

    লাভলি আর আলি একযোগে উত্তর দিল, শেখর স্যার। শেখর রাও। গার্ডেন রিচের বিএনআর রেল কলোনির বাসিন্দা, ২৭ বছরের এক যুবক। শৈশব-কৈশোর জুড়ে থাবা বসিয়েছে দারিদ্র্য। রেলের সিগন্যাল ম্যান বাবার ছেলে শেখর, কোনও দিনই সুযোগ পাননি নাচ শেখার। তবে ইচ্ছে ছিল, চেষ্টা ছিল। আর ছিল প্রতিভা। তাই জন্যই প্রথাগত ভাবে নাচ না শিখেও, নাচের প্রতি অদ্ভুত দক্ষতা ছিল তাঁর। দেখে দেখেই তুলে নিতেন কঠিন স্টেপস। গ্র্যাজুয়েশনের পরে যখন চাকরি মিলছে না, কপাল ঠুকে চলে গিয়েছিলেন হায়দরাবাদে, কোরিওগ্রাফি কোর্স শিখতে। শিখে এসে টুকটাক কাজও পেতে শুরু করে টলিউডে।

    কিন্তু শেখরের চোখে তখন আরও বড় স্বপ্ন। ক্যামেরার পেছনের কোরিওগ্রাফার হয়ে নয়, ডান্সার হয়ে পর্দা মাতাতে চান তিনি। একের পর এক রিয়্যালিটি শো-তে অডিশন, কয়েক রাউন্ড পরে ব্যর্থতা। শেষমেশ নিজের এলাকাতেই একটা ডান্স অ্যাকাডেমি খোলেন শেখর। কিন্তু ওই এলাকায়, বেশির ভাগ খেটে খাওয়া মানুষের পরিবার থেকে, কে আসবে নাচ শিখতে! তা-ও আবার আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, ২০১৪ সালে! ফের ব্যর্থতা, ফের হতাশা।

    কিন্তু তখনও তিনি নিজেও জানতেন না, এই ব্যর্থতার পেছনেই লুকিয়ে রয়েছে অন্য কারও সাফল্যের গল্প।

    এই গলিতেই থাকে লাভলিরা।

    বিএনআর কলোনির ভিতরে ‘ইটারনিটিস ডান্স অ্যাকাডেমি’র ভাঙাচোরা ক্লাবঘরে বসে নিজের জীবনের গল্প শোনাচ্ছিলেন শেখর। বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। পরপর কয়েক দিন ধরে টানা পরিশ্রম চলছে, শেখরের চোখে-মুখে ছাপ স্পষ্ট। বলিলেন, “অসংখ্য মানুষ যোগাযোগ করছেন ওদের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে। রোজ কিছু না কিছু খবর, ছবি, শ্যুটিং। সাহায্যের আশ্বাস, দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি– লেগেই আছে। কিন্তু…”

    হ্যাঁ, লাভলি-আলিকে বিখ্যাত করে তোলার পিছনের যে শিক্ষক রয়েছেন, সেই শেখর রায়ের মধ্যে একটা ‘কিন্তু’ থেকে গেছে এই গোটা পর্ব জুড়ে। এই কিন্তুর খোঁজ পেতে আমাদের আবারও এক বার যেতে হবে ফ্ল্যাশব্যাকে।

    ২০১৪ সালে শেখরের ডান্স অ্যাকাডেমিও যখন চলল না, তখন পাড়ায় পাড়ায় নানা অনুষ্ঠানে নাচের ডাক পড়ত শেখরের। সে রকমই এক বার গিয়েছিলেন সিপিটি কোয়ার্টারে। স্টেজে নাচতে নাচতে খেয়াল করেছিলেন, তাঁর সঙ্গেই স্টেজের নীচে এবং ওপরে নাচছে আরও অনেক বাচ্চা। কী তাদের এনার্জি, কী তাদের মুভমেন্ট!

    তখনই মাথায় এসেছিল পরিকল্পনা। এই বাচ্চাগুলোকে নাচ শেখালে কেমন হয়! “কয়েক দিন পরে নিজের উদ্যোগেই এলাকায় একটা ট্যালেন্ট হান্টের আয়োজন করি। বেছে নিই ৬০টা বাচ্চাকে। শেখাতে শুরু করি নাচ। বিনা পয়সায়। ওটাই তখন আমার অক্সিজেন।”– বললেন শেখর।

    তবে এত সহজ ছিল না মোটেই। যে পরিবারে নুন আনতে ভাত ফুরিয়ে যায়, সে পরিবারের ছেলে-মেয়েদের কাছে পড়াশোনাটাই একটা বিলাসিতা। তার ওপরে রোজ বিকেলে নাচ! ওই সময়টা তো পড়লে কাজে দেবে! শেখর বললেন, “বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতাম। বলতাম, আপনাদের তো পয়সা দিতে হচ্ছে না, জামা-জুতোও কিনে দিতে হচ্ছে না। বিকেলে কেবল একটা ঘণ্টার জন্য চাইছি এদের। অনেকে রাজি হতেন,অনেকেই হতেন না। এই করতে করতেই ওরা ভাল শিখতে শুরু করল। দুয়েকটা প্রতিযোগিতায় ট্রফি আনল। খানিক নরম হলেন কিছু বাবা-মা। তবু শুনতে হতো, এই ট্রফি দিয়ে কী হবে! পয়সা তো আসবে না।”

    হাল ছাড়েননি শেখর। টলিউডে টুকটাক কোরিগ্রাফির কাজ করে যা আয় হতো, তার সবটাই বাচ্চাদের পেছনে দিতেন। তাদের জামা, তাদের জুতো, কখনও বা খাবারও। কখনও আবার পড়াতেন, বিনামূল্যেই। কিন্তু এ সবই হতো বড় দৈন্যতায়। ভাঙাচোরা মেঝে, আয়না ভেঙে গিয়েছে। খুলে পড়ে গিয়েছে দরজা। একটাই ম্যাট, শতচ্ছিন্ন হয়ে নারকেল ছোবড়ার কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। কয়েকটি কাঠের পাটাতন রাখা, তার উপরেই লাফঝাঁপ।

    আলি-লাভলি সহ প্রায় ৬০-৭০টা বাচ্চা ওখানেই শেখে নাচ। আর নাচের মুভমেন্ট তুলতে গিয়েই জিমন্যাসটিকসের কিছু ভল্ট, ফ্লিপ শিখে ফেলা। “আমি খুব খারাপ শিক্ষক, জানেন। আমায় বাচ্চারা আড়ালে ‘খড়ুস’ বলে। ওরা যখন প্র্যাকটিস করতে গিয়ে পড়ে যায়, ব্যথা পায়, খুব চেঁচাই আমি। বকি। বলি, ‘পড়েছো তো কী হয়েছে! মরে তো যাও নি! ওঠো, আবার করো।’ কিন্তু ভেতরে ভেতরে কষ্টে বুক ভেঙে যায় আমার। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে একটা সামান্য ম্যাটের সুরক্ষাও তো দিতে পারি না! কেউ তো পাশে নেই!”

    এইখানেই কাঁটা বিঁধে রয়েছে শেখরের। আলি আর লাভলির সাফল্যে খুব খুব খুশি হয়েও, বারবার মনে হচ্ছে, বাকি এতগুলো বাচ্চা কি একটুও কিছু ডিসার্ভ করে না। বলছিলেন, “আলি আর লাভলির স্কুল থেকে অভিযোগ এসেছিল, ওরা যেখানে সেখানে ভল্ট খাচ্ছে, ওদের যেন বারণ করি। সে দিন স্কুলে যাওয়ার সময়ে আমি ওদের শাস্তি দিয়েছিলাম। ব্যাগ পিঠে নিয়ে, স্কুল ড্রেস করে রাস্তায় জিমন্যাস্টিক করতে হবে। করতে না পারলে, আর কোনও দিন রাস্তায় এ সব করবে না ওরা। আমি নিশ্চিত ছিলাম, ওরা পারবে না। পড়ে যাবে।”

    দেখুন ভিডিও।

    কিন্তু শেখরকেও চমকে দিয়েছিল ওরা। তার পরে খুব ক্যাজুয়্যালি ফেসবুকে ভিডিওটা পোস্ট করেন তিনি। যেমন রোজই বিভিন্ন বাচ্চার প্র্যাকটিসের নানা ভিডিও পোস্ট করেন, সে রকমই। জানতেন না, এই জায়গায় পৌঁছবে সব কিছু। কিন্তু এত আনন্দেও শেখরের আক্ষেপ, “আলি বা লাভলির থেকেও আরও বেশি প্রতিভার বাচ্চা আছে আমার কাছে। ওরা এই আকাশ-ছোঁয়া সাফল্য না পাক, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও কি পাবে না!”

    লাভলির পরিবার

    সত্যিই তো, আলি আর লাভলির ভল্ট খাওয়ার ভিডিও বাই চান্স ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নাদিয়া কোমামেচি হয়ে পৌঁছেছে ক্রীড়া মন্ত্রক পর্যন্ত। ছেলে-মেয়ে দু’টির দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছে হাজার হাজার হাত। কিন্তু শেখরের আক্ষেপ একটাই। “আমার বাচ্চা তো কেবল ওরা দু’জন নয়। আমার বাচ্চা এতগুলো। আমি বড় কিছুই চাইছি না, চাইছি ওরা শেখার সময়ে মিনিমাম সুরক্ষাটুকু পাক। তার পরে ওদের প্রতিভাই ওদের পৌঁছে দেবে বড় মঞ্চে।”

    বলতে বলতেই ক্লাব রুম ভর্তি হয়ে যায়। আটটা বেজে গেছে, ক্লাস করতে এসে গেছে সকলে। এখন অবশ্য শেখর স্যারের গুরুত্বই আলাদা। কয়েক দিন আগেও বাড়ি থেকে ধরে আনতে হতো যে সব বাচ্চাদের, তাদেরই এখন বাড়ির লোকেরা সঙ্গে করে এসে দিয়ে যাচ্ছে নাচের ক্লাসে। শেখর স্যারকে বলে যাচ্ছেন, “আমার ছেলেটাকেও একটু দেখবেন স্যার!”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More