বিরোধী কণ্ঠ না শোনার ট্রাডিশন ভাঙলেন রাজ্যপাল, ভূমিকা স্নেহশীল অভিভাবকের

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি জানতেন বিক্ষোভ হবেই। হয়েছেও তাই। সত্তর বছর পেরিয়ে যাওয়া রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় আধঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ভয়ংকর উত্তেজিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। প্রত্যাশিত ভাবেই তাঁর দিকে উড়ে এল চোখা চোখা প্রশ্ন। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ঢুকেছিল কেন? লাইব্রেরিতে ঢুকে ওভাবে মারধর করল কেন? এর পাশাপাশি এনআরসি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলই।

    আচার্যের সীমাবদ্ধতা অনেক। ছাত্রদের ঘেরাওয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এমনটা একেবারেই সম্ভব নয়। রাজ্যপাল সেকথা শুরুতে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি সংবিধান মানতে বাধ্য। তার সঙ্গে আছে প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা। পরে একসময় বলেছেন, যদি ছেলেমেয়েরা তাদের কথা আমাকে বোঝাতে পারে, তাহলে সরকারকেও পরোয়া করব না। দরকারে বুক পেতে বুলেট নিতে রাজি আছি।

    যে রাজ্যে প্রশ্ন তুললেই শুনতে হয়, ‘তুমি মাওবাদী’, সেখানে রাজ্যপালের এই ভূমিকা ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন অনেকে। তাঁরা বলছেন, কয়েক মাস আগেই নীলরতন সরকার হাসপাতালে অনশনে বসেছিলেন ছাত্ররা। তার আগে মারমুখী পেশেন্ট পার্টির হাতে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন তাঁদের সহপাঠী পরিবহ মুখোপাধ্যায়। ছাত্রদের দাবি ছিল, সরকারকে উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজে কলেজে এসে বলে যেতে হবে, ডাক্তারি ছাত্রদের বহিরাগতদের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি দায়বদ্ধ।

    আরও পড়ুন: বিক্ষোভের মধ্যেই আচার্য রাজ্যপাল ও ছাত্রদের বেনজির সওয়াল-জবাব! সাক্ষী রইল যাদবপুর

    মুখ্যমন্ত্রী যাননি। বরং ছাত্রদের প্রতিনিধিদের গিয়ে দেখা করতে হয়েছিল নবান্নে। মমতা ব্যতিক্রম নন। যাদবপুরে এর আগে কোনও আন্দোলনেই সরকারপক্ষের কেউ যাননি। বরং গিয়েছে পুলিশ।

    ২০১৪ সালে যাদবপুরে তৎকালীন উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে জোর আন্দোলন হয়েছিল। তার নাম ‘হোক কলরব’। সরকারের কেউ যাওয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি। পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে লাঠিচার্জ করেছিল।

    ২০০৫ সালেও একইরকম হয়েছিল। তখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিল পুলিশ। ছাত্রছাত্রীদের লাঠিপেটা করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন নির্বিকার। বলেছিলেন, ছাত্ররা বেয়াদপি করলে পুলিশ ঢুকবেই।

    ডিসেম্বরের শীতের বিকালে সেই ট্রাডিশন ভাঙলেন রাজ্যপাল। নিজে বিক্ষোভের মধ্যে তো গেলেনই, ছাত্রছাত্রীদের আমন্ত্রণও জানিয়ে এলেন রাজভবনে।

    এর আগে তিনি একবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেবার বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। তাঁকে বাঁচাতেই আচার্যের ছুটে যাওয়া। তিনি কেন আগ বাড়িয়ে গেলেন? এই বলে নিন্দায় মুখর হয়েছিলেন অনেকে। এর পরে বার বার তিনি মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে রাজ্যপাল বিরোধে জড়িয়েছেন। অনেকে বলেছিল, ধনকড় কেন্দ্রের লোক। রাজ্য সরকারকে কারণে অকারণে খোঁচা দেওয়ার জন্য তাঁকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে ভূমিকা নিলেন, তাতে রাজনীতির মালিন্য ছিল না। বরং স্নেহশীল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করলেন তিনি। অবাধ্য ছেলেমেয়েদের ধৈর্য ধরে বোঝালেন।

    পর্যবেক্ষকদের মতে, জগদীপ ধনকড়ের এই আচরণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আগামী দিনে যখনই ছাত্রছাত্রীরা বা অন্য কেউ আন্দোলন করবে, অনেকে বলবেন, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা গিয়ে তাদের বোঝাচ্ছেন না কেন? রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাজ্যপাল যদি বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন, বাকিরা পারবেন না কেন?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More