জার্মানির নান থেকে পাকিস্তানের মাদার টেরেসা! ডক্টর রুথ ফাউ-এর জন্মদিনে বিশেষ ডুডল গুগলে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: রোগীর শুশ্রূষা করছেন এক মহিলা। পিছনে একটা বড় জানলা, সূর্য উঠছে আকাশ লাল করে। এমনই একটি ছবি রয়েছে আজ গুগল ডুডলে। ক্লিক করলে জানা যাচ্ছে, ‘পাকিস্তানের মাদার টেরেসা’ ডক্টর রুথ ফাউয়ের জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতেই এই বিশেষ ডুডল প্রকাশ করেছে গুগল।

    রুথ ফাউ জন্মেছিলেন ১৯২৯ সালে, জার্মানিতে। তাঁর জার্মানি থেকে পাকিস্তানে আসে এবং সেখানেই সেবার কাজে নিজেকে ব্রতী করার গল্প আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। পাকিস্তানে দীর্ঘ দিন ধরে কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করে ‘মাদার টেরেসা’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের ১০ অগাস্ট মারা যান এই চিকিৎসক তথা সেবিকা।

    ১৯৬০ সালে জার্মানি থেকে ভারতে আসছিলেন ৩১ বছরের রুথ। কিন্তু ভিসা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে পাকিস্তানের করাচিতে তিনি আটকে যান কিছু দিনের জন্য। আর এই আটকে যাওয়াই বদলে দেয় তাঁর জীবন, সেই সঙ্গে তিনিও বদলে দেন আরও হাজার হাজার মানুষের জীবন।

    রুথের ছোটবেলা কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে। মিত্রবাহিনীর বোমা হামলায় ধ্বংস হয় তাঁর শহর, তাঁর বাড়ি। যুদ্ধের শেষে পরিবার-সহ তাঁদের চলে যেতে হয় সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানিতে। চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন তাঁরা। জানা যায়, রুথের সামনেই মারা গিয়েছিল তার ছোট ভাই। ১৯৪৯ সালে, ২০ বছর বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পালিয়ে যান পশ্চিম জার্মানিতে এবং সেখানেই ডাক্তারি পড়তে শুরু করেন।

    জানা যায়, ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি নাকি ঈশ্বরের ডাক পেয়েছিলেন। তাই তিনি নিজেকে ঈশ্বরের জন্য নিবেদিত করতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসকের পাশাপাশি তাই তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন এক জন নান হিসেবেও। যোগ দেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান মহিলাদের সংঘে। সেই সংঘই ১৯৬০ সালে তাঁকে দক্ষিণ ভারতে পাঠায় কাজের জন্য, কিন্তু তিনি আটকা পড়েন করাচিতে।

    করাচিতে থাকার সময়ে, হঠাৎই এক দিন তিনি পৌঁছে যান তখনকার ম্যাকলয়েড রোডে, কুষ্ঠরোগীদের একটি কলোনিতে। সমাজ থেকে বহিষ্কৃত মানুষগুলিকে রীতিমতো অমানবিক এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে দেখেন। ঘরের গা দিয়ে বয়ে গেছে নালা, সেখানে ছুটছে ইঁদুর। কখনও কখনও ইঁদুরে কামড়ে নিয়ে চলে যেত কুষ্ঠরোগীদের আঙুল, সাড় না থাকার কারণে বুঝতেও পারতেন না তাঁরা। এ সব দেখে তীব্র ভাবে বিচলিত হন তিনি। ঠিক করেন, এখানেই থেকে যাবেন তিনি, এই মানুষগুলির সেবা করবেন।

    পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রুথ ফাউ জানিয়েছিলেন, ১৯৬০ সালে দেখা কুষ্ঠ রোগীদের সেই কলোনি-ই তাঁকে তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিতে সাহায্য করেছিল।

    এক বছরের মধ্যেই তাঁর উদ্যোগে এবং ক্যাথলিক সংঘের সহায়তায় করাচিতে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কুষ্ঠ-হাসপাতাল। পাকিস্তানের প্রথম এই কুষ্ঠ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রোগী এবং রোগীর পরিবারকে নানা রকম সাহায্য করতে শুরু করে তারা। পাকিস্তান ছাড়িয়ে পাশের দেশ আফগানিস্তানেও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এই হাসপাতালের।

    পাকিস্তানের মতো একটি দেশে ছয়ের দশকে তিনি যে খুব সহজে এই সব কাজ করতে পারেননি, তা বলাই বাহুল্য। কুষ্ঠ রোগকে তখন শুধু রোগ হিসেবেই না, বরং বড় কোনও পাপের শাস্তি হিসেবে দেখা হতো সমাজে। তাদের সাহায্য কিংবা চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসত না কেউ। তাদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হতো সমাজ থেকে।

    ডক্টর রুথ প্রথম দিকে সব চেয়ে বেশি যে কাজটি করেছেন, তা হলো ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সচেতন করা, বোঝানো।তিনি প্রতিটি রোগীর বাড়িতে গিয়ে, তাদের পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলেছেন, বুঝিয়েছেন যে কুষ্ঠ রোগ নিরাময়যোগ্য। ঘরে বন্দি করে রাখা রোগীদের নিয়ে এসেছেন তাঁর হাসপাতালে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেতে শুরু করেন তিনি।

    ডক্টর রুথ ফাউয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং চেষ্টার ফলে সরকারও তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে সরকারের সহায়তায় কুষ্ঠ রোগের প্রকোপ থাকা প্রদেশগুলোতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুষ্ঠ চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। বালুচিস্তান, সিন্ধ, উত্তর পাকিস্তান, পাক অধিকৃত কাশ্মীর, এমনকী আফগানিস্তান পর্যন্ত গিয়েছেন তিনি কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগীদের তাঁর হাসপাতালে নিয়ে আসতেন। চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার, ভালো থাকার জায়গা এবং শিক্ষার ব্যবস্থাও করতেন।

    ১৯৭৯ সালে ডক্টর রুথ পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। সম্মানিত হন বিশেষ পুরস্কারে। ডক্টর রুথের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানে কুষ্ঠরোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। সেরে যাওয়া রোগীদের সামাজিক ভাবে গ্রহণযোগ্যও করে তোলেন তিনি।

    তাঁর চেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) পাকিস্তানের কুষ্ঠরোগ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পৌঁছেছে বলে স্বীকৃতি দেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারত তখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি এই অসুখ। রুথের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানে কুষ্ঠরোগ এবং এর কারণে মৃত্যুর হার একেবারেই কমে গিয়েছে পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়। ১৯৮০ সালে পাকিস্তানে ১৯,৩৯৮ জন কুষ্ঠরোগের জন্য চিকিৎসাধীন ছিল। সেখানে ২০১৬ সালে সে সংখ্যা কমে হয়েছে মাত্র ৫৩১!

    কুষ্ঠ রোগীদের পাশাপাশি মানবতার জন্যও সারা জীবন কাজ করে গেছেন ডক্টর রুথ। ২০০০ সালে বালুচিস্তানের খরা, ২০০৫ সালে কাশ্মীরের ভূমিকম্প কিংবা ২০১০ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা– প্রতিটি ঘটনাতেই দাঁড়িয়েছেন আক্রান্তদের পাশে। ২০১০ সালের বন্যার পর ৮১ বছর বয়সেও নিজে গিয়ে ঘরহারা মানুষের সাথে দেখা করেছেন ডক্টর রুথ, কথা বলেছেন তাদের সাথে, শুনেছেন তাদের প্রয়োজনের কথা।

    বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও নানা রকম অসুখে ভুগতে শুরু করেন রুথ। ২০১৭ সালের ১০ অগাস্ট হাসপাতালে মারা যান তিনি। কিন্তু সারা বিশ্বের সামনে রেখে যান সেবা ও মানবতার এক অনন্য নিদর্শন। তাই তাঁর জন্মদিনে বিশেষ ডুডল বানিয়ে সম্মান জানাচ্ছে গুগলও। সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দিচ্ছে তাঁর জীবনের কাহিনি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More