সোমবার, নভেম্বর ১৮

গোমড়াথেরিয়াম – ২

সর্বভূতেষু

সন্দীপ বিশ্বাস

এবারের দেশে আসাটা একটু অন্যরকম ওদের । প্রায় প্রতিবছরই একবার আসার চেষ্টা করে, কিন্তু তা শীতে । কলকাতার গরমে আসতে ইচ্ছা করে না মোটেই । গত শীতে একটু হাওয়াই বেড়াতে গিয়েছিল, তাই আসা হয় নি । তাছাড়া সৌম্যর বিয়ের প্রাথমিক দেখাশোনা সবই হয়ে গেছে – দিদি একবার প্রস্তাবিত পাত্রীটিকে দেখে “হ্যাঁ” না বললে পাকা কথা দেওয়া যাচ্ছে না – তাই এবার জুন মাসের গরমে আসা । মোটামুটি তিন সপ্তাহের বেশি ছুটি পায় না অয়ন বা সোহিনীর কেউই । নীল এবার দশে পা দেবে, স্কুলের চাপ বাড়তে শুরু করেছে । এরপর শীতে আসা ক্ৰমশঃ কঠিন হয়ে উঠবে বোঝাই যায়, কারণ তখন স্কুলের ছুটি খুব বেশিদিন থাকে না । তাই সবকিছু বিবেচনা ক’রে এই প্রথমবার পিচগলা গরমে কলকাতায় ওরা তিনজন ।

অয়নদের বাড়ি ভবানীপুরের নন্দন রোডে । বাবা-মা থাকেন, একটি সর্বক্ষণের লোকের ভরসায় । অয়ন একমাত্র সন্তান তাদের । কোনোবারই দেশে এসে ওখানে ওঠে না তারা । বহু পুরনো আমলের বাড়ি, আধুনিক ব্যবস্থা প্রায় কিছুই নেই সেখানে । সোহিনীর কষ্ট হয় খুব । প্রথম প্রথম একবার তার বাপের বাড়িতে উঠেছিল এসে সবাই মিলে । কাছেই… গোখেল রোডের বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট… সেখানে । অয়নের পছন্দ হয় নি ব্যাপারটা, তার বাবা-মা’রও না । সেই নিয়ে রীতিমতো ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি ! শেষ পর্যন্ত একটা রফা হয়েছে – যে কয়দিন কলকাতায় থাকে হোটেলেই থাকে ওরা । আসলে গরম একদম সহ্য হয় না সোহিনীর – এটা ওর একটা বাতিকের মতোই । কলকাতায় শীত আজকাল কতটুকুই বা পড়ে ? আর নেহাৎ পড়লেও এসি হয়তো লাগে না, কিন্তু হোটেলের ঘরে ধুলো খেতে তো হয় না ! কলকাতার ধুলো-ধোঁয়া-নোংরা দুচক্ষের বিষ সোহিনীর । অত্যন্ত প্রাচুর্য্যের মধ্যে বড় হয়েছে সে । বাংলার এক বিখ্যাত জমিদার পরিবারের বংশধর – এখনও সাবেকি বাড়িতে সম্বৎসর দোল-দুর্গোৎসব লেগেই থাকে । অয়নের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ার একমাত্র কারণ তার দুর্ধর্ষ কেরিয়ার, আর আমেরিকার মোটা মাইনের চাকরি । ভবানীপুরের এঁদো বাড়িতে সোহিনীকে যে কখনো থাকতে হবে না এটা নিশ্চিত ক’রেই বিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা । তাই খুব একটা জোর করতে পারে না অয়ন । মোটামুটি অভ্যেসও হয়ে গেছে সকলেরই । অয়নের বাবা-মা কিছুতেই হোটেলে আসতে চান না । নিয়ে এলেও একটু পরেই পালাই-পালাই করতে থাকেন । সোহিনীর মা অবশ্য বেশি সময়টাই ওদের সাথে থাকেন । আদর-টাদর করেন একমাত্র নাতিকে । বাংলাটা নীল মোটামুটি ভালোই বলে – এটা একটা বড় কৃতিত্ব অয়ন-সোহিনীর । তার বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ, একটু সময় পেলেই চলে আসেন হোটেলে । অয়নের বাড়িতে প্রায় রোজই যায় ওরা একবার ক’রে – যাতায়াতের পথে – গাড়ি থামিয়ে দেখা-সাক্ষাৎ ক’রে আসে বাবা-মা’র সাথে । দু-চারদিন অয়ন রাতে থেকেও যায় ওখানে । আর সোহিনীর বাড়িতে জামাই-আদর তো লেগেই থাকে ।

সৌম্য সোহিনীর একমাত্র ভাই । নিজে কিছু ঠিক ক’রে রাখে নি, তাই সম্বন্ধ ক’রে তার বিয়ের চেষ্টা চলছে । প্রস্তাবিত পাত্রীকে দেখে পছন্দ হয় সোহিনীর, পাকা কথাও হয়ে যায় । মোটমুটিভাবে ঠিক হয় যে আগামী জানুয়ারিতে বিয়ে হবে, কারণ তার আগে ছুটি ম্যানেজ করতে মুশকিল হবে ওদের । এই নিয়ে খুব ব্যস্ততার মধ্যে প্রথম সপ্তাহটা কেটে যায় । এরপর স্কুল-কলেজের কিছু বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও আড্ডা । খুব-একটা যে উচ্ছ্বসিত হয় নীল তা নয়, কিন্তু অয়নের মনে হয় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িটা ছেলেকে দেখানো তার কর্তব্য । প্রতিবারই এরকম কলকাতার দু-একটা দ্রষ্টব্য দেখানোর চেষ্টা করে সে । সোহিনীর দিকের দু-তিনজন খুব নিকট আত্মীয়ের বাড়ি নেমন্তন্ন – না গেলেই নয় । অয়ন তার খুব কাছের কয়েকজন পুরনো মানুষের বাড়ি গিয়ে দেখা ক’রে আসে – একাই । সৌম্যর আয়োজনে একদিন কাছাকাছি একটা রেসর্টে গিয়ে সারাদিন হইহই ক’রে আসে সবাই মিলে । এইভাবে ছুটি যখন প্রায় শেষ তখন খেয়াল হয় যে একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে । প্রতিবারই অয়নের মা ওদের বলেন কালীঘাটে একটা পুজো দিতে । নানান ডামাডোলে কোনোবারই তা আর হয়ে ওঠে না । এবার তাই আসার আগেই অয়ন সোহিনীকে রাজী করিয়ে এসেছিল যে যেমন করেই হোক কাজটা সেরে আসবে । যেকোনো ব্যাপারেই হোক – ঠিকমতো যুক্তি দিয়ে না বোঝাতে পারলে সোহিনীকে দিয়ে কোনো কিছু করানো যায় না । কিন্তু সে যদি কোনো বিষয়ে কথা দেয় তাহলে তার নড়চড় খুব একটা হয় না কখনো ! এবারে মা আর বলেন নি, তবু ওরা ঠিক করে পরদিন সক্কাল-সক্কাল গিয়ে ঘুরে আসবে একবার ।

আজ সোহিনী লালপাড় সাদা শাড়ি পড়েছে । দেখতে তো ও ভালোই, আজ যেন খুব বেশি সুন্দর লাগে অয়নের । আসলে শাড়ির মতো ভালো কিছুতেই লাগে না বাঙালি মেয়েদের – অয়নের তা সবসময়েই মনে হয় । কিন্তু ওদেশে সে সুযোগ বড় একটা আসে না । উইকএন্ডের দুর্গাপুজোর সময় অবশ্য সবাই খুউব মাঞ্জা দেয় … মেয়েদের শাড়ি-গয়নার প্রতিযোগিতা, এমনকি বিয়ের বেনারসী প’ড়েও আসরে অবতীর্ণ হয় কেউ কেউ, আর ছেলেরাও ঝিনচ্যাক পাঞ্জাবি তো পড়েই, সাথে রংবেরঙের ধুতিও নামায় অনেকে । আজকের সোহিনীর এই স্নিগ্ধ সাজ, সাথে বড় সিঁদুরের টিপ – খুব ভালো লাগে অয়নের । সোহিনীর মা বলেছিলেন মন্দিরের ভিড়ে নীলকে আর না নিয়ে যেতে, কিন্তু ছেলে নিজেই বায়না ধরে যাওয়ার জন্য । দেশে এলে একটা এসি গাড়ি সর্বক্ষণ অপেক্ষায় থাকতেই হবে, কোথাও যাওয়া হোক চাই না হোক – তাছাড়া কিরকম অসহায় বোধ করে সোহিনী । এবারেও তার অন্যথা হয় নি । শ্বশুরের গাড়ি নেয় না অয়ন, ভাড়া ক’রে নেয় । হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসে তিনজন । ভালো আম বেশ কিছু নিতে হবে পুজোর জন্য – সোহিনীর ইচ্ছে । এসপ্ল্যানেড এলাকায় হোটেল – যাওয়ার পথে জগুবাজারে থামে ওরা । পুরনো পাড়া অয়নের – বিশুদার দোকান খুঁজে বার ক’রে কয়েক কেজি আম কিনে নেয় । বিশুদার পুরো মাথা সাদা হয়ে গেছে – চিনতে পারে অয়নকে, খবরাখবর নেয় । এবারে বাজার ছেয়ে গেছে হিমসাগর আমে – সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটিরটাই নেয় ওরা । সাথে বাজারের সেরা লিচু বেশ অনেকটা । তারপর গিরিশের দোকান থেকে সবচেয়ে বড় সাইজের জলভরা সন্দেশ । সোহিনীর নজর সব সময়েই খুব উঁচু – ছোটখাট কিছুতে মন ভরে না তার । আর সব কিছুই বড্ড গুছিয়ে করে সে । সাথে দুটো খুব সুন্দর বাস্কেট-মতো নিয়ে এসেছে – গাড়িতে উঠে কেনা জিনিসগুলো ভালো ক’রে সাজায় । একটায় আম, অন্যটায় লিচু ও মিষ্টি । প্লাস্টিকের প্যাকেটে কি পুজোর অর্ঘ্য নিয়ে যাওয়া যায় ? অয়ন সামনে ড্রাইভারের পাশে, পিছনে মা আর ছেলে – মাঝখানে ঝুড়িগুলো রাখা থাকে সীটের ওপর । সকাল প্রায় নয়টা । এর মধ্যেই ভীষণ রোদ আর গরম । ফুল ব্লাস্টে এসি চালিয়ে এগিয়ে চলে ওরা ।

হাজরা মোড়ের সিগনালে দাঁড়ায় গাড়ি । হঠাৎ সোহিনীর জানলায় ঠক-ঠক । একটা বাচ্চা মেয়ে – বোধহয় নীলের থেকে ছোটই হবে, কুচকুচে কালো গায়ের রং, বিশাল বড় বড় চোখ, পরনে ছেঁড়াখোঁড়া নোংরা ফ্রকের মতো – ভিক্ষা চাইছে । মুখ ঘুরিয়ে নেয় ওরা । মেয়েটা কিন্তু যায় না, জানলায় ক্রমাগত টোকা মেরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে । বিরক্ত হয়ে কাঁচটা একটু নামায় সোহিনী । বাচ্চাটা আবদারের গলায় বলে ওঠে – “একটা আম দাও মা” … আর আঙ্গুল দিয়ে দেখায় ঝুড়িগুলোর দিকে । রেগে ওঠে সোহিনী, বকা দেয় – “যা, ভাগ !” বকুনিটা একটু জোরেই হয়ে যায় বোধহয় – কেঁদে ফেলে মেয়েটা । একটু খারাপই লাগে অয়নের । নীল খুব মন দিয়ে দেখছিল বাচ্চাটাকে, বলে ওঠে – “দিই মা একটা আম ওকে ?” সোহিনী আরও রেগে যায় – “পুজোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি, ওকে কি ক’রে দেব ?” তারপর নিজের ব্যাগ খুলে একটা দশ টাকার কয়েন বের করে । জানলার ফাঁক দিয়ে মেয়েটার হাতে দিতে যায় । সে কিন্তু নেয় না টাকাটা, কাঁদো কাঁদো গলায় বলে … “আম দাও না একটা । কতদিন খাই না !” ইতিমধ্যে গাড়ি নড়ে ওঠে । কাঁচ তুলে দিয়ে সোহিনী মন্তব্য করে – “লাটের বাঁট একেবারে ! টাকা নেবে না, আমই চাই ! কী আবদার !”

কালীঘাট থানার কাছে গাড়ি ছেড়ে দিতে হয় । এরপর নো এনট্রি । ঝুড়িদুটো ভাগাভাগি ক’রে নেয় মা আর ছেলে । এরপর ভিড় বাঁচিয়ে হাঁটতে শুরু করে মন্দিরের দিকে । হঠাৎই ঘটে যায় দুর্ঘটনাটা । উল্টোদিক থেকে প্রায় দৌড়ে আসা একটা লোকের সাথে মুখোমুখি ধাক্কা লাগতে লাগতে কোনোক্রমে বেঁচে যায় সোহিনী । কিন্তু ওর হাতে ধরা আমের ঝুড়িটা উল্টে পড়ে রাস্তায় । চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমগুলো । এক-দুটো গড়াতে গড়াতে পৌঁছে যায় পাশের নর্দমায় … কাদা-টাদা মেখে রঙ পাল্টে যায় তাদের । অয়ন ছুটে গিয়ে লোকটার কলার চেপে ধরে । মুহূর্তে ছোটখাটো একটা জটলা জমে যায় ওখানে । একটু থমকে যায় নীল, তারপর লোকজনের ধাক্কা বাঁচিয়ে যতগুলো সম্ভব আম কুড়োতে থাকে রাস্তা থেকে । হঠাৎ মন্দিরের চুড়োর দিকে চোখ যায় সোহিনীর – ঝলমল করছে রোদে । আর … কেন বুঝতে পারে না সে … খুব কান্না পায় তার । ভীষণ কষ্টে বুকটা ফেটে যাবে মনে হয় যেন ! অনেক মানুষের ভিড়ে একদম একা … রাস্তার মাঝে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সোহিনী | কলকাতার আগুনে-রোদ সম্পূর্ণ উপেক্ষা ক’রে ।

(ব্যাঙ্গালোর নিবাসী, পেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।)

Leave A Reply