গোলের বন্যার বিশ্বকাপে পরিত্রাতা গোলরক্ষকরাই

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একজন পরিচালক, অন্যজন আবার ব্যান্ডে গান গেয়েছেন। তৃতীয় জন তো একসময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছেন। একজনের পরিচিতি এতদিন ছিল বাবার পরিচয়ে। একজন আবার চিরকালই প্রতিভাবান তকমা নিয়ে কাটিয়েছেন। কিন্তু রাশিয়ার মাটিতে জ্বলে উঠলেন এই পাঁচজন। শুধু দেশের লোকেদের কাছেই নয়, গোটা বিশ্বের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তাঁরা।

প্রথমজন হ্যানেস হ্যালডরসন। আইসল্যান্ডের এই গোলকিপার পেশায় পরিচালক। তাঁর বানানো ছবি বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও দেখানো হয়েছে। এ হেন হ্যালডরসন শিরোনামে এসেছিলেন ২০১৬ ইউরো কাপে রোনাল্ডোর পেনাল্টি বাঁচিয়ে। কিন্তু সেই পেনাল্টি যে ফ্লুক ছিল না তা আরও একবার প্রমান হয়ে গেল রাশিয়ার মাটিতে। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচে বাঁচালেন লিও মেসির পেনাল্টিও। তাঁর দুরন্ত গোলকিপিংয়ের জেরেই আইসল্যান্ড গ্রুপ পর্বে টিকে ছিল লড়াইয়ে।

ইরানের তরুণ গোলকিপার আলি রেজা বেইরানভান্দ আবার একটা সময়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছেন। ফুটবল খেলতে ভালবাসতেন। কিন্তু বাবার আপত্তি ছিল। তাই ফটবলের নেশাতেই ঘর ছেড়েছেন। ফুটপাথে শুয়ে, হোটেলে, পেট্রল পাম্পে কাজ করেছেন। আর ফুটবল খেলেছেন। সেই আলি রেজার বাবা আজ ছেলের উপর গর্বিত। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর ছেলের দস্তানাতেই আটকে গিয়েছেন রোনাল্ডো। পেনাল্টি বাঁচিয়ে নায়ক হয়েছেন আলি রেজা। সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিয়েছে ইরান।

রাশিয়া বললেই সবার চোখে ভাসে লেভ ইয়াসেন। তারপরে দীর্ঘদিন ইয়াসেনের ধারে কাছেও উঠে আসতে পারেননি কোনও রুশ গোলরক্ষক। উঠে এলেন আকিনফিব। রুশ গোলকিপার ইগর আকিনফিব স্পেনের বিরুদ্ধে যেন হয়ে উঠেছিলেন অভেদ্য দেওয়াল। কোস্তা, ইনিয়েস্তা, ইস্কোদের একের পর এক শট আটকেছেন। শুধু তাই নয়, টাইব্রেকারে কোকে ও আসপাসের শট বাঁচিয়ে ২০১০ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকেই দেখিয়ে দিয়েছেন বাইরের দরজা। অথচ এই আকিনফিব এক সময় রুশ ব্যান্ডে গান গাইতেন। তাঁর বেশ কিছু গানের অ্যালবামও আছে। ক্লাব ফুটবলে কোনও দিনই সেরকম পরিচিতি পাননি আকিনফিব। কিন্তু রবিবার লুঝনিকির মাটিতে তাঁর পারফরম্যান্সে রাতারাতি তিনি হয়ে উঠেছেন রুশ সমর্থকদের নয়নের মণি। আকিনফিবও তাঁর এই কৃতিত্ব উৎসর্গ করেন লেভ ইয়াসেনকেই।

রাশিয়া-স্পেন ম্যাচ যদি হয় আকিনফিবের নায়ক হয়ে ওঠার মঞ্চ, তাহলে ক্রোয়েশিয়া-ডেনমার্ক ম্যাচ আবার দুই তারকার জন্ম দিয়ে গেল। একদিকে ক্যাসপার শুমাইখেল, অন্যদিকে ড্যানিয়েল সুবাসিচ। বাবা পিটার শুমাইখেল নিজের সময়ে ছিলেন বিশ্ব জুড়ে পরিচিত নাম। বাবার পথে হেঁটেই গোলকিপার হয়েছেন ছেলে ক্যাসপার। কিন্তু এতদিন লেস্টার সিটির হয়ে একবার প্রিমিয়ার লিগ জয় ছাড়া আর কোনও কৃতিত্ব ছিল না ৩২ বছরে ক্যাসপারের ঝুলিতে। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে এক ধাক্কায় তুলে দিল অনেকটা উঁচুতে।

খেলা তখন গড়িয়েছে এক্সট্রা টাইমে। ১১৬ মিনিটে পেনাল্টি পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। শট নিতে যাচ্ছেন তাঁদের তারকা অধিনায়ক লুকা মড্রিচ। গোল হলেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাবেন ড্যানিশরা। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে মড্রিচের শট তালুবন্দি করলেন ক্যাসপার। খেলা নিয়ে গেলেন টাই ব্রেকারে। টাই ব্রেকারেও বাঁচালেন দুটো পেনাল্টি। শেষ পর্যন্ত নিজের দলের পেনাল্টি টেকারদের ভুলে হারলেও তাঁর পারফরম্যান্স মন ভরিয়ে দিয়েছে ফুটবল ভক্তদের। এমনকী মিলেছে ম্যাচের সেরার পুরস্কারও।

একদিকে যদি নায়ক হন ক্যাসপার শুমাইখেল, তাহলে কম যান না বিপক্ষ গোলকিপার ড্যানিয়েল সুবাসিচও। টাই ব্রেকারে ডেনমার্কের তিনটি শট বাঁচান এফসি মোনাকোর এই গোলকিপার। বারো বছর আগে ১ জুলাই ২০০৬ বিশ্বকাপে টাই ব্রেকারে তিনটি পেনাল্টি বাঁচানোর রেকর্ড করেছিলেন পর্তুগালের গোলকিপার রিকার্ডো। সেই রেকর্ড এই ম্যাচে স্পর্শ করলেন সুবাসিচ। শুধু তাই নয়, একসময় ১-২ পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে পরপর দুটি পেনাল্টি বাঁচিয়ে দলকে জেতান ৩-২ গোলে।

বলা হয়ে থাকে ফুটবলে গোলই শেষ কথা। গোল করলেই দল জেতে। তাই সব কৃতিত্ব পান স্ট্রাইকাররা। অন্যদিকে তেকাঠির নিচে দাঁড়িয়ে যিনি দলের শেষ প্রহরী তাঁর পরিশ্রমের ফসল দেয় না ফুটবল দুনিয়া। তিনি ভালো খেললে বলা হয়, এটা তো তাঁর কাজ। একটা ভুল করলে সেই দিকেই আঙুল তুলে তাঁকে সমলোচনায় জর্জরিত করা হয়। এটা দেখা হয় না যে স্ট্রাইকাররাও তো অনেক সুযোগ মিস করেন। গোলকিপাররাও তো রক্ত-মাংসের মানুষ।

রুশ বিশ্বকাপে কিন্তু বারবার গোলকিপাররা প্রমান করছেন যে, দলে গোল স্কোরার যেমন জরুরী তেমনই জরুরী গোলরক্ষকও। গোল বাঁচিয়েও দেশকে জেতানো যায়। হয়ে ওঠা যায় হিরো। যেভাবে নিজেদের দেশের হিরো হয়ে উঠেছেন আকিনফিব, সুবাসিচরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More