বৃহস্পতিবার, জুন ২০

সুস্থ থাকতে এবার তবে ‘আদা’-জল খেয়ে লেগে পড়ুন!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রান্নাঘরের আনাজপাতির ঝুড়িতে তারা এক রকম অবহেলাতেই পড়ে থাকে। আমিষ রান্নায় যদিও বা স্বাদ গন্ধ বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার, তবু যেন দুয়ো রানির মতোই তার মর্যাদা। না, পেঁয়াজ বা রসুনের মতো কৌলীন্য মোটেই নেই আদার। আজকাল অবশ্য আমরা ইংলিশ ব্রেকফাস্টে অনেকেই অভ্যস্ত, আর তাতেই প্লেটে পড়ে জিঞ্জারব্রেড। কিন্তু শুধুই কী ঝাঁঝালো স্বাদ-গন্ধ ছাড়া আর কোনও গুণই নেই এর?

বাঙালি তো চিরকালই ঝোলে-ঝালে-অম্বলে। আর তার জেরে তৈরি গ্যাস-অম্বল বাগে আনতে যে আদা আপনাকে সাহায্য করতে পারে, তা আপনার জানা ছিল কি? আর হজমের সমস্যা মিটলে যে ঝকঝকে তকতকে ত্বক পেতে আপনি বাকিদের থেকে এগিয়ে যাবেন, তা বলাই বাহুল্য। পেট, ত্বক থাক। বাড়িতে কেউ গাঁটের ব্যথায় ভুগছেন? জয়েন্ট পেনও কিন্তু সারাতে পারে এই আদাই। শুধু তা-ই নয়। আপনার কোলন এবং অন্ত্রের সমস্যা আয়ত্তে রাখতেও আদা ব্যবহার করতে পারেন। সকালের দিকে বমি-বমি ভাব হোক বা ইনফেকশন, ব্লাড প্রেশার কমাতে স্মরণাপন্ন হতে পারেন এই আদারই।
ভরা পাত সাফ করে ঢেকুর তোলার সময়ে হজমিগুলি বা অ্যান্টাসিড খোঁজা আমাদের অনেকেরই অভ্যেস। তবে রান্নাঘর থেকে কয়েক কুচি আদা মুখে দিলেও এই সমস্যা থেকে রেহাই মিলতে পারে। গবেষণা বলছে, আদার রস ব্যথা বা প্রদাহ কমায়, বমিভাবও কমায়।  দীর্ঘদিন এই কয়েক কুচো আদা খাওয়ার অভ্যাসে, চাইলেই পাকাপাকি ভাবে মুক্তি পেতে পারেন এ সব যন্ত্রণা থেকে।

শুধুই বুক জ্বালা বা গ্যাস অম্বল নয়। শরীরের ব্যথা কমাতেও আদার রসে থাকা জিঞ্জেরল কাজে দেয় চটপট। কিছু গবেষণা তো এমনও বলছে যে, আদার রস আসলে কাজ করে আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথার ওষুধের মতোই।  ২০১৫-র একটি রিসার্চ অনুযায়ী, আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যাও আদার রসে কমে যেতে পারে। আদার মূলের রস থাকে যেসব ওষুধে সেটা অনেকটাই বেশি কাজে দেয় এ ক্ষেত্রে ।

আপনার হজমের গোলমাল না হলে স্বাভাবিক ভাবেই আপনার ত্বকও থাকবে অলক্লিয়ার। আদার রস পাকস্থলিতে থাকলে তাতে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হওয়া থেকে আটকায়। হজম হয় জলদি। নইলে টক্সিক প্রোডাক্ট তৈরি হতে থাকে শরীরে, আর তা থেকেই ব্রণ, একজিমার মতো নানা ত্বকের সমস্যা হতে পারে। কাজেই শরীরের ভিতরের অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে আদার রস কিন্তু দুর্দান্ত কাজ করে।

আজকাল ঘরে ঘরে ক্যানসারের থাবা। তার থেকে বাঁচে না লিভার, কোলন , ক্ষুদ্রান্ত্র– কোনওটাই। কিন্তু এমন কঠিন অসুখ বাঁধিয়ে প্রতিকারের আগেই যদি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে চান, তা হলে রোজ আদা খাওয়ার অভ্যাস শুরু করে দিন। আদা ক্যানসারের কোষগুলোর বাড় আটকে দেয়। এটা কিন্তু মিশিগান ইউনিভার্সিটির ডাক্তারদের কথা। 

যাঁরা মা হতে চলেছেন, তাঁদের যে সব গা গুলোনো-সহ সকালবেলার সমস্যা থাকে, তাঁরা আদাকে বন্ধু করে নিন।  ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিডি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন। এ সময়ে গ্যাস বা বদহজমের সমস্যায় মা এবং শিশুর ক্ষতি হয়, তা-ও আটকে দেয় এই আদাই। এ ছাড়াও যে সব খাবার খাচ্ছেন, এ সময়ে তা থেকে পুরোপুরি পুষ্টিগুণ আপনার শরীরকে দিতেও সাহায্য করে আদার মতো সামান্য জিনিসই।

অফিস হোক বা বাড়ির ঝামেলা, রাস্তার হর্ন হোক বা অযথা মাইকিং– যে কোনও কারণেই কি মাথা ধরে আপনার? এমনকী মাইগ্রেনের সমস্যায় কি সারা দিন নষ্ট হয়ে যায়? আদায় থাকা অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টিনসিয়া, অ্যান্টিহিস্টামাইন উপাদান আপনার মাথা-ধরার সব রাস্তাও বন্ধ করে দেবে।  আর সব চেয়ে বড় কথা, এর কোনও সাইডএফেক্টও নেই। তাই অনায়াসে আদার উপরে  ভরসা রাখুন।

ওজন বাড়া তো আজকাল প্রায় সকলের সমস্যা। কমানোর সব চেষ্টাই কি বিফলে গেছে? আদা খান রোজ। আদা ক্যালরি পোড়ায় চটজলদি, মেটাবলিজ়ম রেট বাড়ায়, কার্বোহাইড্রেট হজম করায় দ্রুত, ইনসুলিন সিক্রিয়েশন বাড়ায়। কাজেই ওজন থাকে আয়ত্তে।

ঠিক যে বয়সে পৌঁছে আপনার হার্ট অ্যাটাক আর ব্লাড সুগারের আশঙ্কা নিয়ে কপালের ভাঁজ গভীর হচ্ছে, বেছে নিন আদা।  যে কোনও প্যাকেজড্ ফুড আজকাল আমাদের সমস্যা বাড়ায়। সমীক্ষা বলছে, বেশি নয়। মাত্র দু’গ্রাম আদা খান রোজ, টাইপ টু ডায়বেটিক রোগীরা ১২ শতাংশ রিলিফ পাবেন এতে।  ফলে আপনার সুস্থ হৃদপিণ্ড পেতেও আর কোনও সমস্যা রইল না।

এতেই শেষ নয়। রাস্তায় বেরোন তো আপনি, বাড়ির শিশুটি স্কুলে যায়, অফিসে যান পরিবারের কেউ।  চার পাশের ব্যাকটেরিয়াল ইনফেক্শন থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইলে ব্যাগে আদা রাখুন। যে কোনও সংক্রমণ আটকায় আদা। মাড়ির ঘা বা জিনজিভাইটিস বা পেরিওডনটিটিস আটকাতে সাহায্য করে আদা। গা ম্যাজম্যাজ হোক বা হঠাৎ শরীর ভালো না লাগা, মুখে দিন আদাকুচি। আর চেঞ্জটা নিজেই বুঝুন।

কাজেই রোজ আদা খান। ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে খাবেন, না শুকিয়ে নিয়ে চায়ে দিয়ে খাবেন, নাকি স্লাইস করে মুখে ফেলে দেবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।

তবে যা-ই হোক না কেন, ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালির জাহাজের খোঁজ রাখার চাইতে আদার ব্যপারী হওয়াই সুবিধাজনক!

Comments are closed.