Latest News

মা চলে গেছেন, রয়ে গেছে তাঁর হরেক রান্না! ‘সুচেতার হেঁশেল’ সাজিয়েছেন সুজয়প্রসাদ

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

রূপবাণী-অরুণা-ভারতী, এক সময়কার কলকাতার বিখ্যাত সিনেমাহলের চেন। উত্তর কলকাতার ‘রূপবাণী’ সিনেমাহলের নাম রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু এখন এই তিনটি সিঙ্গলস্ক্রিনের কোনওটার বা অস্তিত্ব নেই, কোনওটা আবার চিরতরে বন্ধ। অথচ এসব সিনেমাহলেই রিলিজ করেছিল স্বর্ণযুগের কালজয়ী সব বাংলা ছবি। বাঙালি আবার চিরকালই সিনেমা থিয়েটার দেখে বেরিয়ে একটু পেটপুজো করতে ভালবাসে। ঠিক যেমন রূপবাণী সিনেমাহলের নীচে পাওয়া যেত বিখ্যাত ‘রূপবাণীর চিকেন কাটলেট’। যারা খেয়েছেন সেই কাটলেট তারা আজও ভোলেননি কাটলেটের স্বাদ গন্ধ। আজ রূপবাণীও নেই, তার কাটলেটও নেই।কিন্তু সবই বোধহয় হারায় না, কিছু ফিরেও আসে। তাই তো সেই রূপবাণী কাটলেটের স্বাদ গন্ধ ফিরিয়ে আনছেন বাচিকশিল্পী ও অভিনেতা সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। ব্যাপারটা কী!

সুজয়প্রসাদ ফিরিয়ে আনছেন তাঁর মায়ের হাতের রান্না। এইসব রান্নায় পাওয়া যাবে পুরনো কলকাতার স্বাদ, গন্ধ আর নস্ট্যালজিয়া। সুজয় তাঁর মায়ের রান্নার রেসিপি দিয়ে আয়োজন করেছেন দু’দিনের মায়াময় সন্ধ্যের পপ আপ কিচেন।

কয়েক মাস আগেই সুজয়প্রসাদ হারিয়েছেন তাঁর মাকে। সদ্যপ্রয়াতা মা সুচেতা চট্টোপাধ্যায়ের হাতের জাদুকে প্রাণময় করে রাখতেই সুজয়ের এই অভিনব প্রয়াস ‘সুচেতাজ্- সুচেতার হেঁসেল থেকে’। প্রতি মাসের কোনও এক সপ্তাহান্তে কলকাতার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেতে মায়েরই বেশ কিছু নিজস্ব পছন্দের রান্নার স্বাদ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান সুজয়প্রসাদ।সুজয়প্রসাদ ‘দ্য ওয়াল’কে বললেন, “আমার মামার বাড়ি ছিল উত্তর কলকাতায়। ওখানে খাওয়া-দাওয়ার ধরনটা আলাদা ছিল। আমার দাদু অসম্ভব ভাল রান্না করতেন। আমার মায়ের হাতের রান্নাও চমৎকার ছিল। ছোট থেকেই মুরগীর কাটলেট খেতাম, যার স্বাদ-গন্ধ হত একদম রূপবাণীর কাটলেটের মতো। রূপবাণীর কাটলেটও আমি খেয়েছি। তখন তো কলকাতার পরিবেশটা আরও অনেক বেশি বাঙালি ছিল, আমরা রূপবাণী থেকে সিনেমা দেখে বেরোতাম বা রঙমহল, বিশ্বরূপা থেকে থিয়েটার দেখে বেরিয়ে রূপবাণীর কাটলেট কিনে নিতাম। তারপর ‘মালঞ্চ’ বলে একটা দোকান ছিল সেখানকার খাবারও খুব উপাদেয় ছিল।

আমার মায়ের বাপের বাড়িতে একটা ফিস চপ হত, যেটা একদম বাঙালি ঘরানার। ফিশচপে পেস্তা, বাদাম, কিশমিশ দিয়ে বানানো হত। উত্তর কলকাতার ফিশফ্রাই, ফিশ চপ, মাটন কাটলেট, চিকেন কাটলেটের স্বাদ একদম আলাদা হত দক্ষিণ কলকাতার থেকে। এমনকি উত্তর কলকাতার বনেদী পরিবারগুলোর রান্নার স্টাইলও আলাদা ছিল। মিষ্টির মধ্যে পাটিসাপ্টা হত, সেও এক অভিনব রেসিপিতে।

মায়ের কোনও রেসিপি খাতা ছিল না। সবটাই স্বাদ চেখে মা করে ফেলতেন। আমার মা সুচেতা চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হওয়ার কিছুদিন পরে মনে হল, মা এত ভাল রান্না করতেন, দাদুর বাড়ির বাঙালি রান্নাগুলো এত এক্সক্লুসিভ, সেইসব রেসিপি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। সব সন্তানই চায় তাঁর বাবা-মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে।সেই থেকেই এই ভাবনাটা মাথায় আসে। প্রতি মাসে আমি একটা করে ‘ফুড পপ আপ’ করব। বিভিন্ন ক্যাফে, রেস্তোরাঁয় কিংবা আমার বাড়ি থেকেই হবে এটা। প্রতি উইকেন্ডে যাঁরা পপ আপে আসবেন, তাঁদের সঙ্গে আমি মায়ের রান্নাগুলো ভাগ করে নেব। রান্না করবেন রিনা। রিনা আমাদের বাড়ির দীর্ঘদিনের কুক। মায়ের রান্নার সাহায্যকারিণী থেকে রিনা আজ মায়ের হেঁশেলে মায়ের সব রেসিপি শিখে ফেলেছে। রিনা প্রায় কুড়ি বছর আমাদের সঙ্গে আছেন, প্রায় সব রান্নাই জানেন আমার মায়ের।

মা একসময় চিলি পর্ক খেতে খুব পছন্দ করতেন। শুভশ্রী প্যাটেল, আমার আবৃত্তির ছাত্রী যিনি মিট করেছিলেন মাকে, সেই শুভশ্রী এই পপ আপে করছেন চিলি পর্ক। সেসব রান্নার স্বাদ এবার সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। আমার মা সুচেতা চট্টোপাধ্যায়ের নামেই পথ চলা শুরু হল ‘ ‘সুচেতাজ্- সুচেতার হেঁসেল থেকে’ ফুড পপ আপের। কলকাতা শহরে এমন উদ্যোগ খুব একটা আগে হয়নি।”

এই জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই শুরু হচ্ছে সুচেতা’জ-এর পথচলা। এ মাসে সুচেতা’জ তাদের খাবারের সম্ভার নিয়ে থাকছে গড়িয়াহাট সংলগ্ন মহানির্বাণ রোডের ‘জুম টিওগ্রাফি’ কাফেতে। এই পর্বের খাবারের তালিকায় রয়েছে রূপবাণীর মুরগির কাটলেট, বাপের বাড়ির পাটিসাপ্টা, এবং শুভশ্রীর চিলি পর্ক। খাবারের নামগুলিতেও রয়েছে অভিনবত্ব ও আন্তরিকতার ছোঁয়া।এসব লোভনীয় খাবারের স্বাদ পেতে কী করতে হবে আপনাদের? বলতে হবে ‘চিচিং ফাঁক’ আর দরজা খুলে যাবে সুচেতার হেঁশেলের। চিচিং ফাঁক মন্ত্রটি কী? ২৯ আর ৩০ জানুয়ারি চলে যান  ‘জুম টিওগ্রাফি’ ক্যাফেতে, সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে। সুজয়প্রসাদের সঙ্গে গল্প করে, চেখে আসুন তাঁর মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ। শুধু তাই নয়, চমক আছে আরও। বাড়ি বসে অনলাইনেও মিলবে সুচেতা’জ-এর পদগুলি, প্রতি উইকেন্ডেই।

প্রসঙ্গত, সুজয়প্রসাদের বাড়িতে তাঁর মা সুচেতা দেবীর হাতের রান্না খেয়ে গেছেন অপর্ণা সেন থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, চান্দ্রেয়ী ঘোষের মতো তারকারা। ঋতুপর্ণার যেমন প্রিয় ছিল সুচেতার হেঁশেলের পাবদা মাছের রেসিপি। এবার পাবদার রেসিপি, চিংড়ি মালাইকারি, মুড়িঘন্ট থেকে নানা অভিনব রেসিপির রান্নাও পাওয়া যাবে প্রতি উইকেন্ডের পপ আপ আড্ডাগুলিতে। প্রতি সপ্তাহে পদগুলির বদলও হবে, আড্ডাতেও আসবে অনেক চমক।এই অভিনব উদ্যোগে সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সামিল হতে আহ্বান জানিয়েছেন সকলকে। মায়ের হাতের রান্না আর পুরনো কলকাতার বনেদিয়ানায় ভরে উঠুক প্রতি উইকেন্ড।

You might also like