Latest News

দূর বনের মাতামহী ও আলতা

তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

রান্নাঘরের পেছনেই ছিল শিউলি গাছটা। তার ঝাঁকড়া মাথা বাড়ি ছাড়িয়ে তরতরিয়ে উঠে গেছিল ছাদে। সারাবছর টুকটাক পাতা ছিঁড়ে সুক্ত রাঁধা হত। সবুজ হরতনী শিউলি ফল ভেঙে রান্নাবাটি খেলতাম আমরা। আর শরৎ এলেই বরফের কুচির মত সুগন্ধি ফুলে ঠেসে যেত সেই গাছ। সকালে ছাদে উঠলে ঝরা শিউলির পুরু গালিচায় পা পড়ত। তার ওপরই জমে থাকত শিশির।

মনে আছে, পুজোর ছুটিতে সেই শিউলি গাছের ছায়াতেই একেকদিন পড়া মুখস্থ করতে বসতাম। ফুলের গন্ধে ঝিম ধরে আসত। বেলা গড়িয়ে গেলেই মনটা বারবার বইয়ের পাতা ছেড়ে উশখুশ করত। এদিক ওদিক দেখতাম, যতদূর চোখ যায়। কাঁঠাল তলা পেরিয়ে, আমবাগান হয়ে সেই দূরের লাল পোড়ো প্রাসাদ। নাহ, এখনও সময় হয়নি। আবার বইয়ে মন বসানোর চেষ্টা করতাম। ঠিক সেই সময় বাইরের গেটে একটা টুং করে শব্দ হত। ভেসে আসত সেই ডাক, “কই আমার সোনাবুড়ি কোথায়?” ব্যাস, আমায় আর পায় কে! ঝুপঝাপ ছাদ থেকে নেমে বাগানের মোরাম বেছানো রাস্তায় বেরিয়ে আসতাম। এক ছুটে দিম্মার কাছে। গলা জড়িয়ে ধরে বলতাম, কী এনেছ? স্নিগ্ধ হেসে দিম্মা বলত, “সে আছে একটা জিনিস! আয় দেখি।”

আলতা অনুষঙ্গে ভরপুর রাধাকৃষ্ণের পদাবলী, আজও উস্কে দেয় বাঙালী নস্টালজিয়া 

আমায় প্রায় কোলে করে এনে ঘরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিত দিম্মা। লাল পেড়ে সাদা শাড়ির কোঁচর থেকে একে একে বের হয়ে পড়ত আলতার (alta) শিশি, ন্যাকড়া, তুলো জড়ানো কাঠি। বলত, “পা দুটো রাখ দিকিনি আমার কোলের ওপর।” রাখতাম। আর পরম যত্নে কাঠি দিয়ে আলতা পরিয়ে দিত দিম্মা। আমার বয়স তখন নয় কী দশ। তবে পায়ের পাতা নেহাত ছোট ছিল না। নিখুঁত ভাবে আলতা পরাতে সময় লাগত দিম্মার। শেষ হলে দুপায়ের পাতার ওপর গোল করে দুখানা টিপ দিয়ে দিত। আমার তো আনন্দ আর ধরে না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম নিজের পায়ের দিকে। কিন্তু আমাদের আলতার আসরে হঠাৎ মা চলে এলে একটু দমে যেতাম। মা এসব মোটেই পছন্দ করত না। আলতার রং ঘর ময় ছড়াবে, চাদরে দাগ লাগবে, মোজায় লাগবে। বিরক্ত হয়ে দিম্মাকে বলত, “মা কী যে করো না! কবে উঠবে এই রং?” আমি ভয়ে ভয়ে বলতাম, “থাক না মা কিছুদিন? ছুটি তো এখন। স্কুল খোলার আগে উঠে যাবে। তাই না দিম্মা?” দিম্মা ততক্ষণ অন্যকিছু ভাবছিল। এসবে পাত্তা না দিয়ে মাকে বলল, “ওর নূপুর জোড়া কোথায় রে? দে তো পরিয়ে দিই। রাঙা পায়ে নূপুর নাহলে মানায়?”

মা আর কী বলবে, মুখ গোঁজ করে এনে দিত নূপুর। দিম্মা যত্ন করে নূপুর পরিয়ে দিয়ে বলত, ” বাহ, এইবার মানিয়েছে। সাক্ষাৎ দুগ্গা আমার। ওবেলা আমার ওখানে আসিস তো, কথা আছে। তোর দাদু কী যেন বলছিল।” তারপরই দিম্মা আমায় ছেড়ে মা আর ঠাম্মুর সঙ্গে সংসারিক কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর আমি রাঙা পায়ে মল বাজিয়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। আমার বিতিকিচ্ছিরি বড় পা দু’খানাই আজ কেমন অচেনা লাগছে। যদি স্কুলের বন্ধুদের দেখাতে পারতাম! ওরা খালি আমার বড় পা নিয়ে ক্ষ্যাপায়। আজ পেলে দেখিয়ে দিতাম!

যদিও তর সইছিল না, কখন দুপুরের খাওয়া শেষ করে এক ছুটে দিম্মার বাড়ি যাব। একটু একটু বড় হয়েছি তখন, এটুকু পথ কাউকে আর এগিয়ে দিতে হয় না। মাকে বলে সাড়ে তিনটে নাগাদ বেরোলাম। আলতা পায়ে মল বাজাতে বাজাতে হেঁটে চললাম। আমবাগান পেরিয়ে কাঁঠালতলা দিয়ে সোজা পৌঁছে গেলাম পুরনো জমিদার বাড়ির সিংহ দরজায়। ক্যাঁচকোঁচ করে খুলে গেল সদর। তার ভেতরে কিছুটা হেঁটে ছোট বাগান পেরিয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে ডাক দিলাম “দিম্মা! এসে গেছি।” কিন্তু দিম্মা তখন কাজ সেরে গা ধুতে গেছিল। দাদু এসে দরজা খুলে বলল, আয় বোস। দিদিমা আসছে। তারপর দেখি মিটিমিটি তাকিয়ে হাসছে দাদু। বললাম, কী গো? দাদু বলল, “আলতা পরে বেশ দেখাচ্ছে তো! এরপর দিদিমা শাড়িটা পরিয়ে দিলেই হল।” আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। ইস, শাড়ি? ধুর, আমি পরি না ওসব। যাও। দাদু হাসতে হাসতে বলল, দাঁড়া তোকে একটা জিনিস দেখাই। বলেই ভেতর থেকে নিয়ে এল রঙচঙা এক ঘুড়ি! সঙ্গে লাটাই। আমি তো লাফিয়ে উঠলাম দেখে। “আজ আমরা ঘুড়ি ওড়াব দাদু?” দাদু বলল “হ্যাঁ, আজ তুই নিজেরটাই ওড়াবি। অন্যের কাটা ঘুড়ি নয়।”

পুজোর আগে পাড়ার ছেলেদের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম পড়ে যেত। সেইসব ঘুড়ি ভোকাট্টা হলেই এসে পড়ত আমাদের ছাদে। সেরকমই কয়েকটা ঘুড়িতে সুতো জুড়ে উড়িয়েছি আগে। দাদু শিখিয়েছিল, কেমন করে হাওয়ায় ভাসাতে হয় ঘুড়ি। তবে বলেছিল, লম্বা সুতো নাহলে ঠিক খেলে না। আর এখুনি মাঞ্জা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কচি হাত কেটে যাবে। বারবার সাবধান করে দিয়েছিল দাদু। আমি কাটা ঘুড়িতে হাত দেওয়ার আগে সুতোটা পরখ করে নিত তাই। তো আজ একেবারে নতুন ঘুড়ি হাতে তুলে দিয়ে বলল, বিশ্বকর্মা পুজোর আগে ভাল করে ওড়াতে শিখে নে। আমার সঙ্গে বেরোবি বিকেলেই। আমি বললাম, যে আজ্ঞে।

ইতিমধ্যে দিম্মারও স্নান সারা হল। একঢাল ভিজে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে সামনে এসে দাঁড়াল যখন শিউলির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল গোটা ঘরে। ফরসা ছিপছিপে চেহারার মানুষটার নামও ছিল শেফালি। তার লাল পেড়ে শাড়ি আর লাল টিপের মধ্যেই আমার রাজপাট। আমার দৌরাত্ম্য, আবদার সবকিছুই ছিল সেই মাতামহীর কাছে। তবে এককালের প্রতাপশালী রাশভারী পুরুষ, দাদুও আমায় কম প্রশ্রয় দিতেন না। সেই দুজনের হাসিমুখ আজও জুড়ে আছে আমার সঙ্গে। মনে পড়লে কান্না আসে না, একরাশ শান্তিতে পিছিয়ে যাই। ফিরে আসি শৈশবে।

ভেজা চুল মুছে দিম্মা আমায় নিয়ে গেল ভেতরের ঘরে। পালঙ্কে পা ছড়িয়ে বসে দেড়শো বছরের পুরনো গন্ধটাই আরেকবার বুক ভরে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ সেই গন্ধে মিশে গেল ন্যাপথালিন। আওয়াজে ঘাড় উঁচু করে ঘরের অন্য প্রান্তে তাকিয়ে বুঝলাম ট্রাংক খোলা হয়েছে। সেখান থেকে বেরোচ্ছে জরি দেওয়া লালপেড়ে গরদের শাড়ি। ছোট্ট একটা ব্লাউজ। আর একরত্তি সায়া। আমি অবাক হয়ে বললাম, এসব কার? দিম্মা বিজ্ঞের মত হেসে বলল, “তোর মায়ের ছিল, এখন তোর। নে আয় দেখি।” মিনিট পনেরোর মধ্যে আমায় সাজিয়ে গুজিয়ে ভূত করে দিল দিম্মা। বড় বেলজিয়ান আয়নাটার সামনে নিয়ে গিয়ে বলল, “সাজ পছন্দ হল রানির?” আমি নিজেকে দেখে আঁতকে উঠলাম। এত্ত জবরজং সাজ? আমি কোনওদিন সাজিনি যে! বললাম,”কী জানি দিম্মা, কেমন লাগছে ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমিই বলো।” দিম্মা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আমার মুখটা দুহাতে ধরে বলল, “আমার দুগ্গা!” চুলের ভেতরে কোথায় একটা কাজলের টিপ এঁকে দিল। তারপর বলল “যা, দাদুর সঙ্গে বেরিয়ে পড় এবার। অন্ধকার হয়ে এল বলে।” আমি শাড়ির কুঁচি সামলে নূপুরের আওয়াজ তুলে আলতা পরা পায়ে ছুটছি তখন। দাদু আগেই মাঠে গিয়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে দাদুর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দাদু ঘুরে একবার দেখে নিল। সঙ্গে সঙ্গে চওড়া হাসিটাই বলে দিল, নাতনির সাজ তার পছন্দ হয়েছে। হাতে ঘুড়ির সুতো দিয়ে বলল ছুটে যা সামনের দিকে একটু। ঘুড়িটা পেছনে পেছনে উড়তে দে।…তারপর সন্ধের মুখে ঘেমে নেয়ে ফিরে গেলাম বাড়িতে। এগিয়ে দিয়ে এসেছিল দাদু।

আলতা লেপ্টে আছে বাংলার রাজনীতির গায়ে 

এই করে দুর্গাপুজো এসে পড়ল। চলেও গেল। লক্ষ্মীপুজো এসে পড়তেই বুঝলাম হাতে আর সময় বেশি নেই। স্কুল খুলবে। তারপর পরীক্ষা। তাই পুজোর ছুটির বাকিদিনগুলো দুপুর থেকে দিম্মার বাড়িতেই থেকে গেলাম।

দুপুরে ঘুমোনোর সময় আমার কিছু বিশেষ আবদার থাকত। সারা মুখে সুড়সুড়ি দিয়ে গান শোনাতে হবে। সেই অভ্যেসটা দিম্মাই তৈরি করেছিল বোধহয়। আমায় কোলের কাছে নিয়ে সারা মুখে আঙুল বুলিয়ে দিত। গাইত সেই গান, “কোন দূর বনের পাখি, বারে বার মোরে ডাক দেয়/ বলে ঘর ছেড়ে তুই আয় না, ঘর যে তোর তরে নয়। …” সেই গান আর কেউ শুনেছেন কিনা জানি না। তবে দিম্মার থেকে দূরে চলে আসার পর আমি আর শুনিনি। সুর, কথা হুবহু মনে থেকে গেছে। সেই গান শুনতে শুনতে তলিয়ে যেতাম কখন। ঘুম ভাঙতেই দেখতাম নিত্যনতুন সাজ! ঘুমের মধ্যেই আমায় অদ্ভুত দক্ষতায় সাজিয়ে ফেলত দিম্মা। চুলের ছাঁট অবধি বদলে দিত। আর একদিন, তখন স্কুল খোলার ঠিক আগে আগে, ভাতঘুম দিয়ে উঠে দেখলাম সর্বনাশ! ফিকে হয়ে আসা আলতার রেখার ওপর আবার সুন্দর করে আলতা বুলিয়ে দিয়েছে দিম্মা। রাঙা টুকটুকে পা নিয়ে বসে আছি বিছানায়। পাশে পড়ে আছে খুকুমণি আলতার শিশি। দেখলাম নিজেও পায়ে আলতা পরেছে দিম্মা। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “স্কুলের মোজায় দাগ লেগে গেলে মা তো খুব বকবে!” আমার মাতামহী অনাবিল হেসে বললেন, “সে আমি ব্যবস্থা করবোখন। তা বলে বন্ধুদের দেখাবি না?”

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like