Latest News

আলতা লেপ্টে রয়েছে বাংলার রাজনীতির গায়ে

শোভন চক্রবর্তী

সর্বানী চক্রবর্তীর বয়স এখন ৬৫ ছুঁইছুঁই। হাওড়ার মালিপাঁচঘড়ায় থাকেন। স্বামী মারা গিয়েছেন প্রায় বছর দশেক হল। সেই সর্বানীদেবী নস্টালজিক হন আলতা (Alta) দেখলে। নাস্তিকতা তাঁর যাপনে জড়িয়ে গিয়েছে। তথাকথিত বৈধব্য পালন তাঁর ধাতে নেই। তবু এই বৃদ্ধা এখনও আলতার শিশি দেখলেই ফিরে যান ছাত্রজীবনে। যখন রাজনীতি করতেন। যে পথে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তরুণ সমীরের। গোপন কোনও আস্তানায় বসে দুই তরুণ-তরুণী পোস্টার লিখতেন আলতা দিয়ে। ঝাঁটার কাঠিতে জড়িয়ে নিতেন ন্যাকড়া বা তুলো। সেই তুলি দিয়ে যুগান্তরের পাতায় ফুটে উঠত, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব জিন্দাবাদ, কিংবা লাঙল যাঁর জমি তাঁর।

দূর বনের মাতামহী ও আলতা 

হুগলির জো গ্রামে থাকেন বছর সত্তরের নিতাই মালো। নিতাই সাতের দশকে জড়িয়ে গিয়েছিলেন নকশাল আন্দোলনে। পুলিশের মারে তখন পাওয়া মাজার আঘাতটা পঞ্চাশ পেরোনোর পরেই তাঁকে ন্যুব্জ করে দিয়েছিল। ফ্লেক্স, হোর্ডিং, মাল্টি কালারের এই চকচকে জমানায় দেওয়ালে পোস্টার দেখলেই নিতাই মালোর চোখে ভেসে ওঠে সেসব কথা। হারান মণ্ডলের বাড়ির পিছনের বাগানে একটা ছোট্ট কুপি জ্বালিয়ে আলতা দিয়ে লেখা হচ্ছে পোস্টার—গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো, কিংবা চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। অথবা রেড বুকের পাতার নম্বর উল্লেখ করে লেখা, বন্দুকের নলই সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। দ্রুত লিখে ফেলতে হবে। পাঠিয়ে দিতে অন্য কারও কাছে, যাঁর দায়িত্ব অ্যারারুট গুলে গভীর রাতে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়া। সবটা সেরে ফেলতে হবে পুলিশ আসার আগে।

হ্যাঁ এই হল আলতা। বাঙালির এক্কেবারে নিজস্ব বিপ্লবের রঙ। একটা সময়ে এই আলতাই হয়ে উঠেছিল বাংলার বামপন্থী ঘরানার রাজনীতির হাতিয়ার। তবে সেই আলতাই আবার নানান পরিচিতিসত্ত্বা তৈরি করেছিল। আলতা কাদের আইডেন্টিটি তা নিয়েও বাম দলগুলির মধ্যে কৌশল গ্রহণের রাজনীতি ছিল ভরপুর।

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি আলতা দিয়ে কাগজে পোস্টার লেখাকে বাংলার রাজনীতির দেওয়ালে স্থায়ী ভাবে আটকে দিয়েছিল। নকশালপন্থী ঘরানাও তা থেকে বাদ ছিল না। চিনপন্থী, সোভিয়েতপন্থী নির্বিশেষে আলতা হয়ে উঠেছিল বাংলার বিপ্লবের রং। যা দিয়ে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাকও দেওয়া হতো আবার লেখা হতো নকশালবাড়ি জিন্দাবাদ। পরবর্তীতে সিপিআই, সিপিএম ভাগ হয়ে যাওয়া, দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণ ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে কিছু অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব ঘুচেছিল মূল ধারার কমিউনিস্ট পার্টির। ফলে আলতা ছেড়ে অন্য রঙের দিকে ঝুঁকেছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া কমিউনিস্ট পার্টি তথা বাম দলগুলি। অনেকে আবার বলেন, এর পিছনে আরও একটি কারণ ছিল। তা হল পোস্টারে শব্দ দিয়ে কামান দাগতে আলতাকে যেহেতু নকশালরাও ব্যবহার করত তা থেকে দূরে সরেছিল সিপিএম, সিপিআই। নকশালদের থেকে নিজেদের পৃথক করার কৌশল হিসেবেই আলতাকে দূরে ঠেলেছিল তারা।

বাংলায় বামফ্রন্ট জমানার প্রথম দশকের পর থেকেই আলতা দিয়ে লেখা পোস্টারের ধারণাটাই আস্তে আস্তে উবে যেতে থাকে। শুরু হয় ‘নানা রঙের দিনগুলি!’ ভোটের সময়ে দেওয়াল মানে রঙের ছড়াছড়ি। সময় যত এগিয়েছে আলতা ক্রমশ বিবর্ণ হয়েছে। দখল নিয়েছে হালকা ফ্লুরোসেন্ট রঙে গাঢ় রঙের শেড। কাপড়ে লেখা ব্যানার থেকে গ্লোসাইন হয়ে আজকে হোর্ডিং জমানা।

কিন্তু এর মধ্যে ফের আলতা ফিরে এল বাংলার রাজনীতিতে। আবার। তা দেখা যেতে শুরু করল ২০০৬ সালের পর থেকে। বিশেষত জঙ্গলমহলে। গণ আদালতে বিচারের হুঁশিয়ারি, শাস্তির বিধান লেখা সেসব পোস্টার হত সাদা কাগজে আলতা দিয়ে। অপটু হাতে। তলায় লেখা, সিপিআই (মাওবাদী)। এখনও মাঝেমধ্যেই বান্দোয়ান, বেলপাহাড়ি, বিনপুরে উদ্ধার হয় সেসব পোস্টার। ফিরে ফিরে আসে আলতার নস্টালজিয়া।

আলতা অনুসঙ্গে ভরপুর রাধা-কৃষ্ণের পদাবলী, আজও উস্কে দেয় বাঙালি নস্টালজিয়া

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা সময়ে কেন বাম রাজনীতিতে আলতাকে ব্যবহার করা হতো পোস্টারের রঙ হিসেবে? এ ব্যাপারে দুটি যুক্তি শোনা যায়। এক, আলতার রঙ লাল এবং তার দামও কম। এক শিশি আলতায় জল মিশিয়ে আরও পাতলা করে নিলে দিস্তে দিস্তে পোস্টার লেখা হয়ে যেত। এবং আরও একটি কথা অনেক প্রবীণ বাম নেতারা বলেন। তা হল, পোস্টার লেখার কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ করানোর ক্ষেত্রে আলতা ছিল ব্রহ্মাস্ত্র। স্বামী হয়তো রাজনীতি করেন। ফাঁক পেলেই স্ত্রী চারটে পোস্টার লিখে ফেলেন। হাতের কাছে আলতার শিশি তখন সব ঘরে। এরকমও শোনা যায়, কংগ্রেসি বাড়ির মেয়ে বাম নেতার বাড়ির বউ হয়ে আসার পর তিনিও আলতায় তুলি চুবিয়ে পোস্টার লিখেছেন ‘হরেকৃষ্ণ কোঙ্গারের জনসভায় মেমারি চলো’ কিংবা ‘জরুরি অবস্থার কাণ্ডারী কংগ্রেসিদের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’। শ্বশুর বাড়িতে ছড়িয়ে থাকা জুলিয়াস ফুচিকের ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’ কিংবা জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ অথবা ‘বানর থেকে মানুষ—শ্রমের ভূমিকা’ তখন সেই কংগ্রেসী বাবার মেয়ের বুকেও বিপ্লবের বারুদ জমিয়ে দিয়েছে। যাতে দেশলাই কাঠির কাজ করেছে আলতায় ডোবানো হাতে বানানো তুলি।

ইদানিং বিয়ে অথবা ওই জাতীয় অনুষ্ঠান ছাড়া হিন্দু বাঙালি বাড়িতে আলতার চল প্রায় উঠেই গিয়েছে বলা যায়। আগে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটা পাপোসের মতো কাপড় থাকত, যাতে পা রেখে মা-কাকিমারা আলতা পরতেন। পরা হয়ে গেলে সেটা আবার পাট পাট করে ভাঁজ করে চলে যেত যথাস্থানে। এখন সেসব নেই। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই পরার জন্য আলতার চল কেবল বাঙালি হিন্দু বাড়িতেই ছিল। কিন্তু রাজনীতির আলতা ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে ঢুকে পড়েছিল সব ঘরে।

বাংলার সংস্কৃতিতে জড়িয়ে রয়েছে আলতা। ব্যবহার কমলেও আলতা আজও অমলিন। টকটকে লাল। শুধু পায়ে নয়। যা ইতিহাস, নস্টালজিয়া, স্পর্ধা হয়ে লেপ্টে রয়েছে বাংলার রাজনীতির গায়েও। ফ্লুরোসেন্ট বাহারি রঙে সেই আগুন কোথায়? বাঙালির বিপ্লবের রঙ হয়ে ফিরে আসুক আলতা।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like