Latest News

আলতা অনুষঙ্গে ভরপুর রাধা-কৃষ্ণের পদাবলী, আজও উস্কে দেয় বাঙালি নস্টালজিয়া

অঙ্গীরা চন্দ

বাঙালি মেয়েদের সিঁথিতে লাল রঙ চিরকালীন। ফ্যাশন এসে ঐতিহ্যের দুয়ারে যতই টোকা মারুক, সিঁদুর-সাজ ছেড়ে এখনও বেরোতে পারেননি সিংহভাগ বাঙালি নারী। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে, এই ২০২১ সালে পৌঁছে বাংলার বধূদের আটপৌরে সাজে আধুনিকতার রঙ লেগেছে বিলক্ষণ। ঘোমটা তো সেই কবেই ঘুচেছে। গুঁড়ো থেকে সিঁদুর হয়ে উঠেছে ‘লিকুইড’। এমনকি সাধের শাড়িটাও আজকাল ওল্ড ফ্যাশন। আর হবে নাই বা কেন? মেয়েরা তো আর ঘরে বসে নেই। দশ হাতে দশ কাজ সামলে তারা এখন ছুটছে দশ দিকে। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গেলে ঘোমটার আড়াল চলে না। আর তাই সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে মেয়েদের চালচলন, সাজপোশাক সবই এখন সময়োপযোগী।

তবে আধুনিকতার এই চাকচিক্য কিন্তু ফিকে করে দিয়েছে বাঙালি মেয়েদের আরও এক লাল রঙা অঙ্গ। পা।

আলতা (Alta) রঙে তুলি ডুবিয়ে পা জুড়ে আঁকা রাঙা সাজ, আজ আর দেখা যায় না। আলতা আজকাল একেবারে বিলুপ্তপ্রায়। ক্বচিৎ কখনও পুজোপার্বনে লাল রঙা এই তরলের কথা মনে পড়ে বটে, তবে বাঙালি মেয়েদের সাজঘরে আলতার অবস্থা দেওয়ালে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডারের মতো। আছে, কিন্তু না থাকলেও কাজ চলে।

অথচ এই আলতাই একসময় বাংলার ঘরে ঘরে ছিল সিঁদুরের দোসর। বারো মাসে তেরো পার্বনের সবটা জুড়েই তখন ছিল আলতা রঙের রমরমা। বিবাহিত মেয়েদের মধ্যেই এই সাজের প্রচলন বেশি, তবে আইবুড়োরাও যে আলতা একেবারে পরতো না তা বলা ঠিক হবে না। প্রতি বৃহস্পতিবারের বারবেলায় বাঙালি গৃহস্থের ঘরে লক্ষ্মীর আরাধনা ছিল নিশ্চিত, সেই সঙ্গে আবশ্যিক ছিল গৃহবধূদের পায়ে পায়ে আলতার রাঙা আঁচড়।

বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় এই আলতার প্রসঙ্গই বারবার উঠে এসেছে। নানা সময়ে নানা কবি, লেখক, তাঁদের সাহিত্যকীর্তিতে নারী সৌন্দর্যের কথা ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করেছেন আলতার অনুষঙ্গ। আলতা ফিরে ফিরে এসেছে বাঙালির সাধের বৈষ্ণব পদাবলীতেও।

বৃন্দাবন ধামের গোপপল্লীর অলিগলি জুড়ে আঁকা আছে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার টুকরো টুকরো ছবি। সেই অমর স্বর্গীয় প্রেম সাহিত্যের পাতাতেও অমলিন। বাংলা সাহিত্যেও রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নানা ভাবে নানা রঙের তুলিতে আঁকা হয়েছে বারবার। কৃষ্ণ কীর্তন হোক বা পদাবলী, প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা সাহিত্যের দ্বারে রাধা আর কৃষ্ণের অবাধ বিচরণ। একটা সময় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অবলম্বন ছিল এই রাধা-মাধব যুগলবন্দি। তাঁদের চিরনতুন প্রেমের সঙ্গে শহরের কোনও মনমরা বিকেলে হয়তো আজও মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় নাগরিক গূঢ় অনুভূতিরা।

বৈষ্ণব পদাবলীর একাধিক কবি আলতার অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন তাঁদের পদে। কখনও কৃষ্ণের জন্য অপেক্ষারত রাধারাণীর সাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে, কখনও বা কৃষ্ণ বিরহে কাতর রাইকিশোরীর ছবি আঁকতে গিয়ে, আলতার সাজ বৈষ্ণব পদ রচয়িতাদের আচ্ছন্ন করে ছিল। আজকের প্রতিবেদনে বৈষ্ণব পদাবলীর মান পর্যায়ের তিনটি পদে আলতার অভিনব ব্যবহার দেখালাম। পদগুলির হাত ধরে ঈশ্বর নয়, ছুঁয়ে দেখা যাবে বাংলার মাটিতে বেড়ে ওঠা একান্ত বাঙালি এক প্রেম আর তার মান-অভিমানের খেলাকে। আলতা-সাজের মহিমাও ধরা দেবে নিজের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়েই।

আলতা লেপ্টে আছে বাংলার রাজনীতির গায়ে 

মান পর্যায়ে কবি গোবিন্দদাসের লেখা দুটি পদে আলতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আলতা এখানে চিত্রনাট্যের কিছু সূক্ষ্ম তাৎপর্যও বহন করে। প্রথম পদটি হল-

নখ-পদ হৃদয়ে তোহারি।
অন্তর জ্বলত হামারি।।
অধরহিঁ কাজর তোর।
বদন মলিন ভেল মোর।।
হাম উজাগরি রাতি।
তুয়া দিঠি অরুণিম কাঁতি।।
কাহে মিনতি করু কান।
তুহুঁ হাম একই পরাণ।।
হামারি রোদন-অভিলাষ।
তুহুঁ কহ গদগদ ভাষ।।
সবে নহ তনু তনুসঙ্গ।
হাম গোরি তুহুঁ শ্যাম-অঙ্গ।।
অতয়ে চলহ নিজ বাস।
কহতহিঁ গোবিন্দদাস।।

শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তীব্র অভিমান নিয়ে রাধা কথা বলেছেন এই পদে। সারারাত জেগে কানুর জন্য অপেক্ষা করার পর ভোরের আলো যখন ফুটেছে, তখন দেখা দিয়েছেন কৃষ্ণ। তাঁর সারা দেহে অন্য নারীর সম্ভোগের চিহ্ন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাধার প্রতি বাক্যে ঝরে পড়েছে ক্ষোভ, হতাশা, অভিমান- তবে সবটাই শ্লেষ আর ব্যঙ্গের সুরে। প্রাণসখাকে তিনি বলছেন, তোমার বুকে নখের আঁচড়ের দাগ দেখতে পাচ্ছি, অথচ আমার হৃদয় জ্বলে যাচ্ছে। তোমার ঠোঁটে কাজলের দাগ, আর মুখ কালো হয়ে আছে আমার। সারারাত আমি জেগে কাটিয়েছি, অথচ তোমার চোখ নির্ঘুম, লাল। তবে না, তুমি আমি একই প্রাণ হলেও আমাদের সব কিছু এক নয়। আমি ফর্সা, আর তোমার গায়ের রঙটা শ্যামলা। এই বলে রাধা নিজের বাড়ি ফিরতে উদ্যত হলেন।

অভিমানের পর আসে মানভঞ্জনের পালা। রাধার মিষ্টি কথায় যে প্রচ্ছন্ন অভিমান, ক্ষোভ ছিল তা কাটিয়ে দিতে, নিজেকেনির্দোষ প্রমাণ করতে এরপর রাধার কথার উত্তর দেন কৃষ্ণ। গোবিন্দদাসের সেই পদেই রয়েছে আলতার ঝলক।

কাঁহা নখচিহ্ন চিহ্নলি তুহুঁ সুন্দরি
এবে নব কুঙ্কুম রেহ।
কাজর ভরমে মরমে কিয়ে গঞ্জসি
ঘন মৃগমদ রস এহ।।
ভামিনি মঝু মনে লাগল ধন্দ।
অপরূপ রোখে দোখ করি মানসি
দিনহিঁ তরুণী দিঠি মন্দ।।
গৈরিক হেরি বৈরি সম মানসি
উর পর যাবক ভাণে।
ফাগুক বিন্দু ইন্দুমুখ নিন্দসি
সিন্দূর করি অনুমানে।।
তোহারি সম্বাদে জাগি সব যামিনি
অরুণিম ভেল নয়ান।
তুহুঁ পুন পালটি মোহে পরিবাদসি
গোবিন্দদাস পরমাণ।।


রাধিকার মানভঞ্জনে বেশ কিছু অভিনব যুক্তি খাড়া করেছেন কৃষ্ণ। তিনি বলছেন, সুন্দরী, কোথায় নখের আঁচড়ের দাগ তুমি দেখছো? এতো নতুন কুমকুমের দাগ। মৃগমদের ঘন রসকে কাজল বলে ভুল করে শুধু শুধু তুমি আমায় গঞ্জনা করছো। আমার বুকে লাল দাগ দেখে আলতা (যাবক) বলে সন্দেহ করছো, এটা আসলে গেরিমাটির রাঙা ছোপ। আবিরের বিন্দুকে সিঁদুর বলে ভুল করছো তুমি, আসলে আমি তোমারই জন্য সারারাত জেগে কাটিয়েছি। তাই আমার চোখ এমন লাল।

আলতার অনুষঙ্গে এই পদে মিশে আছে এক গূঢ় সত্য। রাধা তাঁর পদে কৃষ্ণকে দোষারোপ করতে গিয়ে একবারের জন্যেও আলতার কথা উল্লেখ করেননি। আর কৃষ্ণের মানভঞ্জন অতিরঞ্জিত হতে হতে আলতা সিঁদুরের প্রসঙ্গও টেনে এনেছে অযথাই। আলতাই আসলে ফাঁস করে দিয়েছে কার কথা কতটা সত্যি।

মান পর্যায়ের আরও এক পদে আলতার উল্লেখ তাৎপর্যপূর্ণ। কবি রাধামোহনের লেখা সেই পদে অভিমানিনী রাধিকা চিরকালীন সেই বাঙালি প্রেমের কারিগর। মাধবের উদ্দেশে তিনি বলছেন-

মাধব কাহে কান্দায়সি হামে।
চলি যাহ সো ধনি ঠামে।।
তোহারি হৃদয় অধিদেবী।
তাকর চরণ যাও সেবি।।
যো যাবক তুয়া অঙ্গ।
ততহি করহ পুন রঙ্গ।।
সোই পূরব তুয়া কাম।
কী ফল মুগধিনি ঠাম।।
এত কহুঁ গদ-গদ ভাষ।
ভণ রাধামোহন দাস।।


প্রাণাধিক মাধবকে সেই মেয়ের কাছে চলে যেতে বলছেন রাধা যাকে তিনি চান। বলছেন, তোমার হৃদয়ের অধিদেবী সে, তারই চরণ সেবা করো তুমি গিয়ে। তোমার অঙ্গে তার পায়ের আলতার দাগ লেগে রয়েছে। সেই তোমার সমস্ত কামনা পূরণ করতে পারবে, আমার কাছে এসে কী লাভ মাধব? এতটুকু বলার পর অভিমানে রাধার কথা আটকে যায়। কান্নাচাপা সেই মান দৃশ্যের ছবি আঁকেন রাধামোহন।

এই পদেও কিন্তু একটা কথা খুব পরিষ্কার, মেয়েদের অতি সাধারণ অতি তুচ্ছ সাজের উপকরণ হিসেবে অনিবার্য আলতা। তাই বারবার প্রেমের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে এই আলতার অবতারণা করেছেন কবিরা। আর সেই পদাবলীর হাত ধরে আলতা মাখা ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে বারবার পৌঁছে গেছে বাঙালি। নস্টালজিয়া উস্কে ফিরে এসেছে পুরনো আটপৌরে সাজের স্মৃতি।

বাঙালি মেয়েরা সেদিনের সেই আলতা ভুলে আজ মেহেন্দি পরে। পশ্চিম ভারতীয় সাজের বাহার তাদের হাতে হাতে আকছার লেপটে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু আলতার মতো উজ্জ্বল রঙ ছেড়ে কেন মেহেন্দির দিকে এই খামোকা ঝোঁক? হাতে-পায়ে লাল আলতার আলপনা আঁকলে তা কিন্তু মেহেন্দির কালচে কারুকার্যকেও নিমেষে ফিকে করে দিতে পারে। একুশ শতকের কর্মব্যস্ত নারী আলতা-সাজে অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে অপরূপা। আধুনিকতার সমস্ত দাবি মেনে নিয়ে আরও একবার কি নতুন রূপে ফিরিয়ে আনা যায় না বাঙালির পুরনো সেই সাজগোজ, হারিয়ে যাওয়া আলতাকে?

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like