Latest News

মেয়েরা কেন আলতা পরে পায়ে? প্রাচীনকাল থেকে এর ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের ইতিহাস চমকে দেবে

পূর্বা সেনগুপ্ত

Image - মেয়েরা কেন আলতা পরে পায়ে? প্রাচীনকাল থেকে এর ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের ইতিহাস চমকে দেবে

আজকের দিনে আমরা সকলেই কালার কসমেটিক্স ব্যবহার করি। মাথার সিঁদুর থেকে চোখের কাজল,ঠোঁট জুড়ে নানা রঙের লিপস্টিক। এতেই শেষ নয়। নখগুলিকে রঞ্জিত করি নানা রঙে। পায়ে পরি আলতা (Alta)।

লাক্ষা থেকে তৈরি হতো আলতা

প্রাচীন কালে অঙ্গরাগের উপকরণ এখনকার মতো কৃত্রিম হত না। তখন উপকরণ ছিল সামান্য এবং তা প্রকৃতি থেকেই নেওয়া হত। সেই সময় আলতা বা অলক্তক তৈরি হত লাক্ষা দিয়ে। আমরা সকলেই জানি অর্জুন বা পলাশ গাছে এক বিচিত্র রকম ক্ষত তৈরি হয়। যে ডালে হয় তাকে ঠিক কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত দেহের ক্ষতের মতো দেখতে লাগে। সেই ক্ষতের মতো অংশ দিয়ে লাল রক্তের মতো রস ঝরে পরে (Alta)। এই ক্ষতযুক্ত ডালগুলো থেকেই তৈরি হয় লাক্ষা। লাক্ষা হল লাল রঙের চটচটে আটার মতো বস্তু যাকে বাংলাভাষায় বলা হয় গালা। প্রাচীনকালে এই গালা থেকেই তৈরি হত নানা প্রসাধনী। আলতা থেকে শুরু করে ঠোঁট রঞ্জনী লিপস্টিক -সবই। প্রাকৃতিক উপাদান দিয়েই প্রসাধনী সারত মেয়েরা। শরীরের জন্যও তা ছিল একেবারেই সুরক্ষিত ও স্বাস্থ্যসম্মত।

নাপিত বউ আলতা পাতা ভিজিয়ে পরাতো আলতা

এই প্রসঙ্গেই বলা যায়, খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। আমাদের মায়েরা তাঁদের শাশুড়িদের দেখেছেন পান খেয়ে ঠোঁট লাল করতে। সেই সময় পানও ছিল উত্তম মানের ঠোঁট রঞ্জনী। খয়ের-জর্দা দেওয়া পানের লাল পিকে ঠোঁট রাঙা হয়ে উঠত। প্রতি বৃহস্পতিবার ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পুজো করতেন মায়েরা। সেই সময় পুজোর দিনে নাপিত বৌয়েরা বাড়িতে আসত। বেশিরভাগ বাড়িতেই বাঁধা নাপিত বৌ ছিল। তাঁরা বাড়ির মেয়েদের পা ঝামা দিয়ে ঘষে দিত। তারপর ঝুলি থেকে বের হত আলতা পাতা (Alta)।

Image - মেয়েরা কেন আলতা পরে পায়ে? প্রাচীনকাল থেকে এর ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের ইতিহাস চমকে দেবে

সেই আলতা পাতা একটি বাটির মধ্যে ভিজিয়ে দিলেই লাল রঙ তৈরি হত। নাপিত বৌ নিপুণ হাতে সকলের পায়ে আলতা পড়িয়ে দিত। লক্ষ্মীপুজোর রীতি আজও মেনে চলেন মেয়েরা, কিন্তু নাপিত বৌদের এখন আর দেখা মেলে না। সেই আলতা পাতা দিয়ে লাল রঙ বানানোর চলও প্রায় উঠে গেছে। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে বাজারচলতি আলতা।

বৌদ্ধযুগেও আলতার চল ছিল

বৌদ্ধ যুগের কথায় আসা যাক। সেই সময়েও দেখা গেছে বারবনিতারা এই অলক্তক ব্যবহার করছেন। পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুল অবধি পরিধি বরাবর লাল রেখা টেনে আলতা পরা তো হতই, নানা রকম আলপনা আঁকার চলও ছিল। মঙ্গলময় স্বস্তিক চিহ্ন থেকে লতাপাতার ছন্দে চিত্রায়িত হত আলতা। প্রসাধনীর পাশাপাশি মঙ্গলের চিহ্নও বহন করত আলতা। মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের চিহ্নও বলা হত অলক্তককে।

Image - মেয়েরা কেন আলতা পরে পায়ে? প্রাচীনকাল থেকে এর ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের ইতিহাস চমকে দেবে

দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন মায়েরা পালন করেন আলতা ব্রত

মেয়েরা এখনও আলতা পরতে ভালবাসে। আমরা পুজোর সময় দেবীকে সিঁদুর আর আলতা নিবেদন করি। আলতা-সিঁদুর সধবা মেয়েদের মঙ্গলের চিহ্ন। দুর্গাপুজোর প্রথম দিন ষষ্ঠী। এইদিন মায়েরা সন্তানের মঙ্গলের জন্য দুর্গা ষষ্ঠী পালন করবেনই। ওই দিন পায়ে লাল আলতা পরে ব্রত পালন করেন মায়েরা। ছোট মেয়েরা এই দিন শিউলি ফুলের বোটা ছোপানো হলদে রঙের কাপড় পরবে। সেদিন নতুন জামা পরতেই হবে। কারণ, মা দুর্গার বোধন হবে। দেবী উদ্বোধিত হয়ে পূজা গ্রহণ করবেন। দুর্গাপূজার উপকরণগুলির মধ্যে আলতা থাকতেই হবে। মাতৃমুর্তির পা দুটিও অলক্তক রাগে রঞ্জিত। দেবী অসুর নিধন করছেন, কিন্তু তাঁর পায়েও আলতা আর নূপুরের সমাবেশ।

মঙ্গল কাজে পায়ে আলতা দিতেই হবে

বাংলাদেশে রীতি কিছুটা আলাদা। সেখানে মেহেদীর চল আছে। বিয়ের অনুষ্ঠানেও মেয়েদের মেহেদী দেওয়ার চল শুরু হয়েছে। কিন্তু মঙ্গলকাজে পায়ে আলতা দিতেই হবে। তার ওপর মেহেদী র কারুকাজ করলে ক্ষতি নেই। ভারতের বিভিন্ন দেবী মন্দিরে পূজার থালিতে সিঁদুরের সঙ্গে আলতা, বিন্দিয়া ইত্যাদি দেওয়া হয়। তাই আলতা বা অলক্তক দেখতে যত সাধারণ হোক না কেন,তার উপস্থিতি ঐতিহ্যবাহী। মেয়েদের সামাজিক স্থান নির্ধারণে, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে মিশে আছে এই রক্তবর্ণ রেখা। সামান্য একটু আলতাপাতা নিয়ে লেখা হয়েছে কত সাহিত্য, কাব্য। আবার নারীর ব্যথাকেও চিহ্নিত করেছে এই লাল রেখা। আলতা শুধু প্রসাধনী নয়, তার কাব্য সুষমা নিয়ে নারীর সৌন্দর্য সৃষ্টিতেও মুখর।

লেখক ধর্মীয় প্রবন্ধকার

You might also like