Latest News

জবা চা খেয়েছেন? গোলাপ টি? স্বাদ বদলান, রোগ থাকবে একশো হাত দূরে

দেবীমিতা বসু বেরা

সকালের আমেজে,পাড়ার মোড়ের হুল্লোড়ে,চণ্ডীমণ্ডপের জটলায়, রাজনীতির তর্ক যুদ্ধে, রিফ্রেশমেন্টে কিংবা কাজের ফাঁকে এনার্জি পেতে, বা গঙ্গার পাড়ে সঙ্গীর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তে…”এককাপ চায়ে শুধু তোমাকে..” চাওয়ার কথা দেওয়ার মুহূর্তে অথবা অতিথি আপ্যায়নে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের জুড়ি মেলা ভার।

সাধারণভাবে দুধ ছাড়া লিকার চা বা গ্রিন টি-র উপকারিতা আজ সর্বজনবিদিত। বর্তমান সময়ের করোনা অতি মহামারীর নিরিখে নিজেদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে বারবার উঠে এসেছে নানা প্রকার হার্বাল টি-এর প্রসঙ্গ। তাই আজকের প্রতিবেদনে এমনই কিছু অপরিচিত ভেষজ চায়ের উপকারিতা ও প্রস্তুত প্রণালী সম্পর্কে বলা রইল।

হিবিসকাস টি

জবা ফুল দিয়ে বানানো চা। এটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন পানীয়। যদিও সহজলভ্য এই ফুলটি আমরা পুজোর কাজেই ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এর পুষ্টিগুণ শরীরের জন্যও উপকারি। জবা ফুলের মধ্যে থাকা ভিটামিন সি, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধে বিশেষ কার্যকরী।

মহিলাদের ঋতুস্রাবের সময়ে তলপেটের ব্যথা উপশমে লাল জবাফুলের চা পথ্য হিসেবে কাজ করে। শরীরের অতিরিক্ত স্টার্চ ও গ্লুকোজ শুষে নিতে পারে হিবিসকাস টি, তাই দ্রুত ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

 

কীভাবে বানাবেন?

এককাপ লাল জবাফুলের চা বানাতে লাগবে ৩-৪টি সতেজ বা শুকনো ফুলের পাপড়ি।  প্রথমে ফুলের ভেতরের লম্বা রেণু অংশটি (stamen) ও বৃন্তের সবুজ অংশটি সম্পূর্ণ ফেলে দিয়ে ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। এবার জল খুব ভাল করে ফুটিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিন। গরম জলের মধ্যে ফুলের পাপড়িগুলো ফেলে চাপা দিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। ভেজানোর পর ছেঁকে লেবুর রস, মধু মিশিয়ে নিলেই তৈরি হিবিসকাস টি।

এই চা বানিয়ে আপনি ফ্রিডে তিনদিন পর্যন্ত রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে খাওয়ার আগে লেবু ও মধু মেশালে স্বাদ বাড়বে। চায়ের পুষ্টিগুণ আরও বাড়াতে যোগ করতে পারেন বেসিল সিডস বা তুলসীর বীজ। চায়ের স্বাদ একটু অন্যরকম করতে এলাচ, লবঙ্গ, আদা মিশিয়েও খেতে পারেন। ঠান্ডা অথবা গরম যেভাবে খুশি খান হিবিসকাস টি।

সতর্কতা: রক্তচাপ কম হলে এই চা চলবে না। অন্তঃস্বত্ত্বা মহিলারা এবং হরমোনের চিকিৎসা চললে এই চা না খাওয়াই ভাল।

 

রোজ টি

প্রিয় একখানা বই–আরাম কেদারায় এলিয়ে দেওয়া শরীর–বাইরের ঝমঝমে বৃষ্টি–এর সঙ্গে দোসর হয়ে যদি সামনের টেবিলে রাখা থাকে এককাপ সুগন্ধযুক্ত রোজ টি! স্বপ্ন মনে হচ্ছে তো! ভাবছেন তো কীসব আজগুবি বলছি! এক্কেবারেই নয়। চলুন আজ স্বপ্নটাকে সত্যি করে আপনাদের এককাপ গোলাপ চা খাওয়াই।

গোলাপ চায়ের গুণ অনেক

মূলত সৌন্দর্য প্রসাধনীতে গোলাপের কদর পৃথিবী বিখ্যাত। কিন্তু জানেন কি গবেষকরা বলেন গোলাপের পাপড়ি নিঃসৃত নির্যাসের পুষ্টিগুণ অপরিসীম। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ গোলাপ চা রোগপ্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা নেয়। নিয়মিত এই চা পান মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত তলপেটের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। হজমের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। এই চায়ের সুগন্ধ মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে বিশেষ কার্যকরী।

মূত্রনালী সংক্রান্ত সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে গোলাপ চা। আরও একটা বিশেষ গুণ হল, এই চা মেদ কমাতে সাহায্য করে। ত্বর ও চুলের জৌলুস বাড়াতে গোলাপ চায়ের বিশেষ কদর আছে। তাহলে আজ থেকে প্রতিদিন এককাপ রোজ টি-কে সঙ্গী করুন আপনার খাদ্য তালিকায়।

বাজার চলতি গোলাপ পাপড়ির পরিবর্তে যদি সম্ভব হয় তবে বাড়িতে নিজের হাতে তৈরি গোলাপ গাছের পাপড়ি থেকেই বানাতে পারেন এই চা। বাড়ির গাছের ফুল হলে তা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর হবে, কীটনাশকের বাড়বাড়ন্তও থাকবে না। আর একান্তই কিনে এনে বানাতে হলে প্রথমেই খুব ভাল করে ফুলের পাপড়িগুলো ধুয়ে নেবেন। এছাড়া সুপারমার্কেট থেকে শুকনো গোলাপ পাপড়ি কিনে কিংবা নিজের বারান্দার ফুলের সতেজ পাপড়ি রোদে শুকিয়ে বানিয়ে ফেলতে পেলেন স্বাস্থ্যকর ও সুগন্ধযুক্ত রোজ টি।

 

কীভাবে বানাবেন?

দু’কাপ ফুটন্ত গরম জলে হাফ কাপ শুকনো কিংবা সতেজ গোলাপ পাপড়ি দিয়ে আধ ঘণ্টা ভিজতে দিতে হবে। এর ফলে গোলাপের নির্যাস মিশবে জলে। ৩০ মিনিট পরে ছেঁকে নিয়ে এক চা চামচ মধু মিশিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে রোজ টি।

স্যাফরন টি/কাশ্মীরি কাওয়া

জাফরান সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি।  মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত ফুলের এই রেণুর বাজার মূল্যও বেশ চড়া। আমাদের দেশের একমাত্র কাশ্মীরেই এর চাষ হয়। সাধারণভাবে মশলা হিসেবেই ব্যবহার হয়ে থাকলেও, স্যাফরন টি-এর এর পুষ্টিগুণ কোনও অংশে কম নয়। এই ফুলের রেণু নিঃসৃত সোনালী নির্যাসের চা আমাদের শরীর ডিটক্স করতে অর্থাৎ টক্সিন ছেঁকে বের করতে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। তাছাড়াও মানসিক চাপ কমাতে, ঠান্ডা লাগা সংক্রান্ত সমস্যায়, হার্টের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং তারুণ্যময় জৌলুস পেতে এই চায়ের জুড়ি মেলা ভার।

কীভাবে বানাবেন?

দেড়কাপ জলে হাফ ইঞ্চি দারচিনি, ৩-৪টি ছোট এলাচ,কয়েকটা স্যাফরন তন্তু(Thread) দিয়ে খুব ভাল ফুটিয়ে নিতে হবে। জলের পরিমাণটা যেন ফুটে এককাপের কম হয়। ইচ্ছে হলে গ্রিন টি-এর পাতা মেশাতে পারেন। এবার ছোট এলাচ ও দারুচিনি জলে ফেলে দিয়ে গরম স্যাফরন টি কাপে ঢেলে নিন। স্বাদ বাড়াতে মধু মিশিয়ে, ওপর থেকে কয়েকটি স্যাফরন থ্রেড দিয়ে সাজিয়ে দিলেই চায়ের পেয়ালায় হাজির হবে এক টুকরো কাশ্মীরি স্যাফরন টি।

 

লেমন গ্র্যাস টি

অ্যারোমাথেরাপি এখন বেশ জনপ্রিয়। এর দৌলতেই লেমন গ্র্যাস এখন পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। বারান্দার ছোট্ট এক কোণায় বা ছাদবাগানে খুব অল্প যত্নে আপনি গড়ে তুলতে পারেন ঔষধি গুন সম্পন্ন এই সুগন্ধি গাছটি। প্রতিদিনের লেমন গ্র্যাস টি পান সর্দি-জ্বর-গলা ব্যাথা উপশমে, মুখের স্বাদ ফেরাতে।  উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও এই চা বিশেষ কাজে দেয়।

কীভাবে বানাবেন?

এক কাপ গরম জলে কয়েকটা লেমন গ্র্যাসের পাতা দিয়ে মিনিট পাঁচেক ফুটিয়ে নিন। গ্যাস বন্ধ করে একটি গ্রিন টি ব্যাগ দিন। এবার একটুকরো লেবু ও হাফ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। তারপর চাপা দিয়ে ৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার ছেঁকে নিলেই তৈরি অ্যারোমাটিক লেমন গ্র্যাস টি।

হার্বাল টি বলে আবার দিনে কাপের পর কাপ খেতে যাবেন না। সঠিক ও পরিমিত চা পান একান্ত আবশ্যিক। এক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি। হার্বাল টি খেতে হবে চিনি ছাড়া,আর তা একান্ত সম্ভব না হলে মধু বা গুড়ের স্বাদে অভ্যস্ত করুন নিজেকে। সকালে ব্রেকফাস্টের পরে বা লাঞ্চের মাঝে এককাপ হার্বাল টি আপনার শরীরকে করে তুলতে পারে প্রাণবন্ত। আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জীবিত।

You might also like