Latest News

প্রেমের মাসে কুমড়োর হৃদয় আর কাঁচকলার খোসা

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

ফাল্গুন মাস যে যে পড়ে গিয়েছে সেটা কী করে বুঝবেন? কেন! ভ্যালেন্টাইন ডে’র উচ্ছ্বাস, হুল্লোড় এসব দেখে তো বোঝাই যায়। প্রেমদিবসে এফএম- এ সারাদিন ধরে বাজল- ‘তুম সে হি /তুম সে হি / রাস্তে মিল যাতে হ্যায়/ মঞ্জিলে মিল যাতি হ্যায় / তুম সে হি’। আর শুনলাম ‘এক হো গ্যায়ে হাম ঔর তুম / তো উড় গেয়ি নিন্দে রে ….হাম্মা হাম্মা হামআআ’ (পড়ুন হাম্বা হাম্বা)। লাদাখ থেকে লাটাগুড়ি, লাহোর থেকে লিলুয়া- পুরো ‘লাভ’-এর জোয়ারে ভেসে গেল। পাল তুলে দিল সবাই। যাঁরা প্রেমে আছেন, যাঁরা প্রেমে আছেন মনে করেন, অথচ প্রেমে নেই… প্রায় সকলেই প্রেমের রঙিন পাল তুলে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। যাঁরা ইতিমধ্যে প্রেমে দাগা খেয়েছেন তাঁরা চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, রজনীকান্ত সেনকে আঁকড়ে ধরলেন
“যারে মন দিলে আর ফিরে আসে না
এ মন তারে আর ভালবাসে না!
যাদের মন দিতে হয় সেধে সেধে
প্রেম দিতে হয় ধরে বেঁধে
তাদের মন দিয়ে, মন মরে কেঁদে,
আর জন্মের মত হাসে না!”
বসন্তের বাতাসে প্রেম এবং মিলনের সুর যত না, বিরহের কাতরতা যাতনা তার চাইতে অনেক বেশি। এই গোটা ফাল্গুন মাস জুড়ে বাতাসে ভেসে বেড়াবে হাম্মা হাম্মা হামআআ। (পড়ুন হাম্বা হাম্বা)
“বঁধু, তোমার আমার এই যে বিরহ এক জনমের নয়।” যেটা ফাল্গুনী বাতাস মনে হচ্ছে সেটা বাতাস নয়… প্রেমিক প্রেমিকাদের দীর্ঘশ্বাস। “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তুমি বুঝলে না”– এই সকরুণ আর্তিতে বসন্তের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।যেখানে আবার প্রেম কনফার্মড, সেখানেও বিস্তর ঝামেলা। সন্দেহ, অবিশ্বাসের দোলাচলতায় জাগরণে যায় বিভাবরী। এই অবস্থায় রবি ঠাকুরই সম্বল। ‘ওগো দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো’।
প্রেমের মত এমন সরেস জিনিস পৃথিবীতে আর দুটো নেই। কান টানলে যেমন মাথা আসে, প্রেমের সঙ্গে আসে নানান ভাব। একটা হল উচ্চভাব। সহনশীলতা, ক্ষমা, নরম সুরে কথা বলা, নিজের দোষত্রুটিগুলোকে সচেতনভাবে ঢেকে রাখা…
সিনেমায় দেখেছি কত অপরাধী, রাগি মস্তান, ফালতু রকবাজ, নেশাগ্রস্ত মানুষ প্রেমে পড়ার পরে ‘ভালো’ হয়ে গেল। আবার প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরে কত বিখ্যাত প্রেমিক অপরাধী, রাগি মস্তান, ফালতু রকবাজ এবং নেশাখোরে পরিণত হল- সেটাও দেখেছি।
প্রেম যে মানুষের জীবনে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ এই উদাহরণগুলো সেটা বুঝিয়ে দেয়।
প্রেম এলে একা আসে না, সঙ্গে করে গান নিয়ে আসে। প্রথম দিকে সব মিলনের গান। সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা। প্রেমিকা তখন আশা ভোঁসলে। আরো কাছাকাছি,আরো কাছে এসো।
কর্পোরেট অফিসে কাজ করা ভীষণ মেজাজি প্রেমিকের মনটা তখন মাখনের মত নরম। গরম মেজাজ প্রেমিকার কাছে বন্ধক রেখে তখন তার জাতীয় সংগীতটি হলো ….শর ইয়ে ঝুঁকনে না দু/ দুনিয়া কে আগে/ পর তেরি পায়েল দেখু/ কর কে শর নিচে….প্রেমে পড়লে ওস্তাদ তার উঁচু মাথা নামিয়ে উবু হয়ে বসে প্রেমিকার নুপূর পায়ে চলন দেখবে…. আহা প্রেম তুমি অসাধ্য সাধন করতে পারো! কিন্তু প্রেমের এই ম্যাজিক যতখানি অবিবাহিত মানুষদের মধ্যে খেল দেখাতে সক্ষম, বিবাহিত মানুষদের কাছে গিয়ে ঠিক ততোটাই থেঁতলে যায়। অভাবে নয় , স্বভাবের দোষে প্রেম জানলা দিয়ে পালায়। প্রেমে থাকার সময় যে খারাপ স্বভাবগুলো আমরা জামার আস্তিনের নীচে লুকিয়ে রাখি, দীর্ঘদিন পাশাপাশি থাকলে সেগুলো আর লুকিয়ে রাখা যায় না। সম্ভবও নয়। যে পায়েল দেখার জন্য মাথা ঝুঁকেছিল, সেই পায়েলই একটা সময়ে মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। যাকে আরও বেশি বেশি করে কাছে চাওয়া ছিল, সে এখন দূরে থাকলেই স্বস্তি পাওয়া যায়। যে মিলন আনন্দ আর সোহাগের রস-মাধুরীতে পূর্ণ ছিল, বিয়ের পর সেই মিলনে সংসারের তুচ্ছ খুঁটিনাটিগুলো কীভাবে যেন ঢুকে পড়ে! “পরশু দিন তরকারিতে ঝাল বেশি দিয়েছিলাম বলে মুখ করেছিলে! বাবা তুলে কথা বলেছিলে! কতদিন ধরে বলছি মাথাটা সবসময় ঘুরছে, ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো। তোমার আর সময় হল না!”
“তুমিও কি কম! আমার মাকে ওভাবে সবার সামনে ছোট না করলে চলছিল না! কোনওদিন ভেবেছো অফিসে কত চাপের মধ্যে আমাকে কাজ করতে হয়!”– দুপক্ষের এই অনুচ্চারিত কথাগুলো মিলনকে কঠিন আর কষ্টদায়ক করে তোলে। সংসারের লেনদেনে আমরা আর প্রেম খুঁজে পাই না।
অভ্যাস এবং সংসারের যাঁতাকলে প্রেমের তখন নাভিশ্বাস উঠেছে। হতাশাগ্রস্থ প্রেমকুমার তখন সংসার থেকে বেরিয়ে উঠোনের বাতাবিলেবু গাছে হেলান দিয়ে বসা। কাঁধে একটা ঝোলা। সেই ঝোলায় কয়েকটা শুকনো গোলাপ, একটা জুঁইয়ের মালা, একটা চকোলেট, একটা জেন্টস ঘড়ি, দুটো চেকচেক রুমাল, চারখানা চিঠি, তিনটে কবিতার বই। সে অপেক্ষা করে আছে দাম্পত্য আকচাআকচি শেষ হলে আবার বারান্দার গ্রিল খুলে ঘরে ঢুকবে। কিন্তু যেখানে এত অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস আর অযত্ন, সেখানে প্রেম থাকবেই বা কি করে! সম্ভব?এখন তো দিনক্ষণ দেখে সাড়ম্বরে প্রেমের উৎসব উদযাপিত হয়। তবু সেই প্রেমে হৃদয়ের আনুগত্য কোথায়? বেশিরভাগটাই দেখনদারি, ছলনায় ভরা,মস্তিষ্ক দ্বারা চালিত। Love-এ লাভ খোঁজার প্রবৃত্তি। মন দেওয়া নেওয়ায় যদি মনকে গৌণ করে শুধু মাথার কথা শুনি, তবে সেখানে প্রেম কতটা থাকে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায়!
সেই যে বাতাবিলেবু গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে ছিল প্রেম, দেখছিল, ফাল্গুনকে সার্থক করার জন্য প্রকৃতিতে কতরকম আয়োজন! রাস্তার ধারের জঙ্গলে অজস্র ভাট বা ঘেঁটু ফুলের ঝোপ। তাতে কতরঙের প্রজাপতির আনাগোনা। বাতাবিলেবু ফুলের কাছে আবার মৌমাছিদের ভিড়। লালচে রঙের কচি নিমপাতা বসন্তের বাতাসে দোল খাচ্ছে। জগাইয়ের ঠাকমা কোত্থেকে একটা এত্ত বড় বাঁশের লগি জোগাড় করে কচি নিমপাতা পাড়ছে। ঘরের বুড়োটার মুখে সোয়াদ নেই। কচি নিমপাতা ভেজে ভাতের সঙ্গে দেবে। বিল্টুদের বাগানে একটা হলুদ রঙের হুলো সাদা মেনিটার গা চেটে দিচ্ছে। আরামে চোখ বুজে আছে সাদা মেনি। বিল্টুদের আমবাগান থেকে ভেসে আসা আমের মুকুলের গন্ধে গোটা চত্বরটা ম ম করছে। এসব তো প্রেমেরই ছবি!
কিন্তু সংসারের গ্লানি ধুয়ে দেবার দুর্বার ক্ষমতা মনে হয় প্রকৃতির নেই! আগে ফুলের কাছে গেলে, সাগরের কাছে গেলে, পাহাড়ের কাছে গেলে ক্ষণিকের জন্য হলেও মনটা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠত। প্রেমে ভরে উঠত মন। পুরোনো সঙ্গীকে নতুন করে পাওয়ার ইচ্ছে জাগত। এই ইচ্ছে, এই চেষ্টা দুপক্ষের তরফ থেকেই থাকা উচিত। নইলে যা হওয়ার তা হয়। মধ্যবয়সে এসে মনের মলমের প্রয়োজন পড়ে। সংসারের বাইরে একটা অন্যরকম সংসার। যেখানে শাসন নেই, শোষণ নেই, পায়ের তলায় পিষে ফেলা নেই, অশ্রদ্ধা নেই, জমাখরচের হিসেব নেই। সম্পর্ককে নিজের সম্পত্তি ভাবার প্রশ্নই নেই। আরও অনেক কিছুই নেই। রান্নাঘর নেই, পাঁচফোড়নের গন্ধ নেই, বেডরুমের দেওয়ালে তার সঙ্গে একটা বাঁধানো ছবি নেই, যখন তখন মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। শেষের এই না-থাকাগুলোর জন্যেই তো এত আকর্ষণ! যে সম্পর্কের মধ্যে মনে মনে অনায়াস আসা যাওয়া, যেটুকু সময় পাশে পাওয়া, দুজন দুজনার কাছে অমূল্য রত্ন হয়ে ওঠা। জমে থাকা মনের কথা, ব্যথা হাট করে খুলে দেওয়া যায় যার কাছে, তারই নাম প্রেম। যেখানে ভণিতা করতে হয় না, না-বলা কথাগুলোও বুঝে নেয়।
সেইরকমের প্রেম জীবনে এলে তাকে হৃদয় দিয়ে বরণ করে নিতে হয়। জোর জবরদস্তি চলে না এই সম্পর্কে। প্রয়োজনই পড়ে না। যেতে চাইলে ছেড়ে দিতে হয়। এই জন্যই প্রেমে বিরহ থাকে। সংসারে যন্ত্রণা।
খুব ভালো থাকুন সবাই। প্রেম এলে তাকে হৃদয়ের সিংহাসনে বসান। আদর করে চিংড়ি দিয়ে কাঁচকলার খোসা বাটা খাওয়ান। সিংহাসন খালি করে মনে দুঃখ দিয়ে প্রেমাস্পদ চলে গেলে কুমড়োর হৃদয় চটকিয়ে বড়া ভেজে গরম ভাতের সঙ্গে খেয়ে বিরহকে মধুর করে তুলুন। জেনে রাখুন মনের সিংহাসন কক্ষনো খালি থাকে না।
যতদিন হৃদয়-সিংহাসনে মনের মত কেউ না বসছে, ততদিন শেরওয়ানি পরা শাহরুখ খানকেই ‘দিলওয়ালে’ ভেবে নিন।

চিংড়ি দিয়ে কাঁচকলার খোসা বাটা

উপকরণ: খোলা ছাড়িয়ে পরিষ্কার করা এক কাপ কুচো চিংড়ি, দু কাপ ঝিরিঝিরি করে কাটা কাঁচকলার খোসা, রসুন, ১ টা বড় সাইজের পেঁয়াজ কুচি, ৩ টে শুকনো লংকা, নুন, হলুদ, কালোজিরে, সর্ষের তেল।প্রণালী: ঝিরিঝিরি করে কাটা কাঁচকলার খোসাগুলো ভাপিয়ে নিন। এমনভাবে ভাপাবেন যাতে জল শুকিয়ে যায়। এবার কড়াইতে অল্প সর্ষের তেল গরম করে শুকনো লংকাগুলো ভেজে তুলে নিন। ওই তেলেই পেঁয়াজ রসুন হালকা ভেজে নিন । চিংড়ি নুন হলুদ মাখিয়ে ওই তেলেই ভেজে তুলে রাখুন। সব শেষে ভাপানো কাঁচকলার খোসা তেলে একটু নেড়ে নিন। সব ঠান্ডা হলে পরিমাণ মতো নুন দিয়ে সব একসঙ্গে মিক্সিতে পিষে নিন।এবার কড়াইতে তিন চা চামচ সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ফোড়ন দিন। তারপর ওই কাঁচকলা আর চিংড়ি বাটার মিশ্রণটা তেলে ভালো করে নেড়ে নিন। ব্যাস! হয়ে গেল।

কুমড়োর হৃদয়ের বড়া

উপকরণ: কুমড়োর ভেতরের ফেলে দেওয়া অংশটুকু যাকে আমি কুমড়োর হৃদয় বলি, ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ, একটু বেশি পরিমাণে কাঁচালংকা কুচি, নুন, হলুদ, বেসন এককাপ, চালের গুঁড়ো আধ কাপ, কালোজিরে এক চা চামচ, ভাজার জন্য সর্ষের তেল। সর্ষের তেলে ভাজলেই বেশি ভালো লাগে। তবে চাইলে সাদা তেলও ব্যবহার করতে পারেন।প্রণালী: কুমড়োর হৃদয় থেকে বীজগুলো আলাদা করে নিন। হৃদয় হাত দিয়ে ছিঁড়ে নিন বা বঁটি দিয়ে একটু টুকরো টুকরো করে নিন। এবার ওর সঙ্গে পেঁয়াজ, লংকা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, বেসন, চালের গুঁড়ো, কালোজিরে মিশিয়ে নিন। অল্প জল দিয়ে মেখে গরম তেলে পেঁয়াজির শেপ দিয়ে ভাজুন।এটা এতোই মুখরোচক যে ভাত খাওয়া অব্দি অপেক্ষা করা যায় না। ভাজতে ভাজতেই সাবাড়।

 

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা

 

প্রেম ছিল, আর পাত পেড়ে সরস্বতী পুজোর ভোগ ছিল

You might also like