Latest News

প্রেম ছিল, আর পাত পেড়ে সরস্বতী পুজোর ভোগ ছিল

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

এখন ভাবলে কেমন অদ্ভুত লাগে। অথচ ওটাই স্বাভাবিক ছিল। স্টুডেন্ট এই পরিচয়টাই তখন প্রাধান্য পেত বলে মুসলিম ছেলেমেয়েদের সরস্বতী পুজোয় অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে জাত আর ধর্মীয় সংকীর্ণতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। দীর্ঘদিন পাশাপাশি বাস করার ফলে সংখ্যাগুরুদের অনেক কিছুই সংখ্যালঘুদেরকে প্রভাবিত করেছিল। আম্মি হয়ে উঠেছিলেন মা। পানি হয়েছিল জল। ভাষা বদলে যাওয়ার পেছনে যার হাত ছিল, তা হল নিজেকে মূলস্রোতে মিশিয়ে দেবার ইচ্ছে। ভালোবেসে এই শব্দগুলোকে মুসলমানরা আপন করে নিয়েছিলেন। আপন করে নিয়েছিলেন দেবী সরস্বতী এবং লক্ষ্মীকেও। তবে সকলে নন।
বই-এ পা লেগে গেলে মুসলমানরা কপালে হাত ঠেকিয়ে সালাম বা প্রণামের ভঙ্গি করতেন। ভাত বা ভাতজাতীয় কোনও খাদ্যদ্রব্য ফেলতে বা ছড়াতে দেখলে মুসলিম গৃহিণীরা বলতেন ভাত হল লক্ষ্মী। খাবার নষ্ট করলে লক্ষ্মী রুষ্ট হন। … এই ভাবনাও হিন্দু মুসলিম পাশাপাশি থাকার ফল।
কারও কারও মধ্যে যে চূড়ান্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না, তা কিন্তু নয়। মূল স্রোত থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখার মানুষ, ‘মিলাবে-মিলিবে’কে অগ্রাহ্য করার মানুষ তখনও ছিল। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল। কিন্তু মেলানোর আনন্দে জীবন কাটানো মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। তাই বিভেদের সুরটি ‘মিলমিশ’-এর তলায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকত।
মুসলিম মেয়েদের কাছে স্কুলে পড়াকালীন সরস্বতী পুজোর স্মৃতি মধ্য বা অন্তিম বয়সে এসেও বিশেষ স্মৃতি। সেরা স্মৃতি। তৎকালীন মুসলিম সমাজকে আজকের দিন দিয়ে বিচার করলে হবে না। আমাদের সময়ের কথা যদি বলি সেই ৩১ বছর আগে যখন আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই, তখন স্কুলে মুসলিম মেয়ে হাতে গোনা। কোনও ক্লাসে দুজন বা তিনজন। কোনও ক্লাসে শূন্য। ক্লাস এইটে পড়তে পড়তে বেশিরভাগ মুসলিম মেয়েরই বিয়ে হয়ে যেত।
স্কুল যাওয়া আসাটুকু বাদ দিলে মেয়েদের আর কোথাও বেরোনোর সুযোগ ছিল না। গরমের ছুটি আর পুজোর লম্বা ছুটি তাই তাদের ভীষণ অপছন্দের। কারণ বাড়িতে বন্দিনী হয়ে থাকতে হত। মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজে বাধ্যতামূলক হাত লাগাতে হত। স্কুলের সরস্বতী পুজো ওই ক’টা মুসলিম মেয়েদের কাছে উৎসব হয়ে উঠত। শাড়ি পরা, অঞ্জলি দেওয়া,পুজোর ফল কাটা, দেবীর আরাধনার জায়গাটা সাজানো, আলপনা দেওয়া, মালা গাঁথা … ধর্মের সঙ্গে উৎসবের এই লেপটে থাকা ব্যাপারটা মুসলিম কিশোরীর চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলো। বাড়িতে কুলগাছ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম মেয়েরা সরস্বতী পুজোর আগে কুল ছুঁয়ে দেখত না। কিছু কিছু সংস্কার, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত ক’রে কীভাবে উৎসব সবাইকে তার নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে- এটা তার দুর্দান্ত উদাহরণ।
সেসময় বাড়ির লোক এসব দেখে কুকথা বলেননি, বরং প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছেন।মুসলিম কিশোরীদের জীবনে প্রথম ভালো লাগা, ভালোবাসা- এসেছে সরস্বতী পুজোর দিনগুলোতেই। এই পুজোর অবকাশে সব চেয়ে জবরদস্ত যে কাণ্ডটি ঘটত সেটা হল মুসলিম মেয়ের সঙ্গে হিন্দু ছেলের মন দেওয়া নেওয়া। এবং হিন্দু কিশোরীর মুসলিম ছেলের প্রেমে পড়া। অস্থির প্রেম ভালোবাসা কবেই বা জাত ধর্ম গরিব বড়লোক দেখেছে! সে তো শুধু দুজনের চোখাচোখি আর ব্যকুলতা দেখেছে। সাক্ষী থেকেছেন সরস্বতী। গোবিন্দসুন্দরী বিদ্যাপীঠের দশম শ্রেণীর ছাত্ররা ক্যাসেটে গান চালিয়েছে- ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’…
বুঝে নিয়েছে নাজমা। বোঝাতে সক্ষম হয়েছে চ্যাটার্জি পাড়ার হলুদ পাঞ্জাবি পরা ছেলেটি।
হরিমতি বালিকা বিদ্যালয়ের রাগী বড়দি গান বাজানোর অনুমতি দেননি। তাতে কী! শ্রীশচন্দ্র বিদ্যাপীঠ ফর বয়েজ-এ অনেক জমানো ব্যথা বেদনা শেষ হলে বেজে উঠেছে আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে, দোলাও দোলাও দোলাও আমার হৃদয়। ডুয়েট। পারাবত প্রিয়া। আর কী চাই! তখন ভালোবাসা প্রাণের ওপর দিয়ে বয়ে যেত। বসন্তের বাতাসের মতোন। দীর্ঘস্থায়ী হতো তার শিহরণ! তখন পূজার ফুল কী অনায়াসেই যে ভালোবাসা হয়ে যেত! সেই ক্ষণিক প্রেমের রেশটুকু আজীবনের সঙ্গী হয়ে রয়ে যাবে শেষ দিন পর্যন্ত…কে জানত!
সে রঙিন আলোর দীপ কোনদিনও নিভে যাবে না….
সত্যিই নেভেনা। জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যেসব ছেলেমেয়েরা তাদের ছাত্রজীবনে কোনও না কোনও সরস্বতী পুজোতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে- তাদের কাছে সেসব স্মৃতি অমলিন স্মৃতিসুধা। মধ্য বা শেষ বয়সে এসেও সরস্বতী পুজোর দিনগুলো, টুকরো ভালোবাসাবাসিগুলো বারবার পিছু ডাকে।
‘যে আলো হয়ে এসেছিলো কাছে মোর/ তারে আজ আলেয়া যে মনে হয়’…
শুধু কী প্রেম! সরস্বতী পুজোর খাওয়াদাওয়াটাও কী কম আকর্ষণীয় ছিল! পিকনিক নয়, অথচ পিকনিকের মতোই হাবভাব।সরস্বতী পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে সবচেয়ে উঁচু ক্লাসের দিদিরা খাতা পেন নিয়ে ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করত। সবাই যে খুশি মনে দিত তা নয়! অনেকে খাওয়ার দিন আসত না। তার মধ্যে গোঁড়া মুসলমান ফ্যামিলির মেয়ে যেমন ছিল, কনজারভেটিভ হিন্দু ফ্যামিলির মেয়েরাও ছিল। এইরকম মুসলিম বাড়ির লোকেরা পুজোর প্রসাদ, পুজো উপলক্ষ্যে খাওয়াদাওয়া- এইসব ব্যাপারগুলো গুনাহ্ ভাবতেন। আর কনজারভেটিভ হিন্দু ফ্যামিলির অভিভাবকরা সরস্বতীপুজোর দিনগুলোয় মেয়েদের বেরোতে দিতেন না কারণ মেয়েরা ‘লাভ’ করার সুযোগ পাবে এবং সেটা বিয়ে অব্দি গড়ালেই চিত্তির। আর এক শ্রেণী কোনও কারণ ছাড়াই চাঁদা দিত না, কিন্তু খাওয়াদাওয়ার দিন সবার আগে সেজেগুজে হাজির হত।
যাইহোক, প্রচুর ঝগড়া ঝামেলা মনোমালিন্য ভজাভজি পেরিয়ে চাঁদা তোলার পর্ব মিটলে কেনাকাটা শুরু হয়ে যেত। আমরা খাওয়াদাওয়ার আগেরদিন বিকেলে স্কুলে গিয়ে মটরশুঁটি ছাড়াতাম। চটের বস্তার গায়ে ঘষে ঘষে নতুন আলুর খোসা তুলতাম। মেনুতে বাঁধাকপির তরকারি থাকলে ঝিরি ঝিরি করে বাঁধাকপি কাটতে হত। অশিক্ষক কর্মচারী, দাদারা ক্লাস থেকে বেঞ্চগুলো বের করে প্রাইমারীর চারকোনা উঠোনে পরপর সাজিয়ে রাখতেন।
মেনুতে ফ্রায়েড রাইস থাকবেই। তবে ওটাকে ফ্রায়েড রাইস না বলে মিষ্টি পোলাও বলা উচিত। কাজু কিসমিস গাজর কুচি থাকত সেই রাইসে।
আলুর দম অথবা বাঁধাকপির তরকারি হত। একটা করে ছানাবড়া এবং একটা করে রসগোল্লা। রসগোল্লার রস দিয়ে বানানো অতিরিক্ত মিষ্টি টমেটো চাটনির দিওয়ানি ছিল সকলেই। শালপাতার ওপরে ফ্রায়েড রাইস, আলুর দম, চাটনি মিলেমিশে খিচুড়ি হয়ে যেত। আঙুল দিয়ে শালপাতার থালায় আঁকিবুকি কাটতে কাটতে মেয়েটা দেখত লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে মহুয়াদের পাঁচিলের গায়ে সাইকেলটা রেখে ছেলেটা এদিকে তাকিয়ে আছে। তখন মোবাইল ফোন কোথায়! তখন বসন্তের বাতাস দূত হয়ে মেয়েটার কথা পৌঁছে দিত ছেলেটির কাছে।
“কখন এলে?”… এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বসন্তের বাতাস লোহার গেট দিয়ে ঢুকে ফের মেয়েটির কাছে পৌঁছে যেত। “অনেকক্ষণ এসেছি। তুমি মিঠুর পাশে বসে আছো দেখতে পেয়েছি। খোলা চুলে দারুণ দেখাচ্ছে। টিপ পরোনি কেন?”
কয়েকদিন আগে গন্ধেশ্বরী টকিজে একটা সিনেমা দেখেছিল মেয়েটি। ‘দাদার কীর্তি’। অয়ন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় মায়ের সিঁদুরকৌটো থেকে লুকিয়ে একটু সিঁদুর নিয়ে কাগজে মুড়িয়ে বিনির জন্য নিয়ে এসেছে। কপালে সিঁদুরের টিপ পরলে বিনিকে কেমন দেখায় সেটা দেখার জন্য নায়কের বিস্তর পীড়াপীড়ি। সিনেমার সে দৃশ্য মনে পড়তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে মেয়েটি। ইস্!
সেইসব দিনগুলোর সুখস্মৃতি রোমন্থন করার ফাঁকে আজ পোলাও আর আলুর দমের রেসিপি দিলাম।

মিষ্টি পোলাওউপকরণ: গোবিন্দভোগ চাল এক বাটি, অল্প কাজু, কিসমিস,আদা বাটা ১ চা চামচ, কাঁচালংকা বাটা ১ চা চামচ, জাফরান হাফ চা চামচ, গরম মশলার গুঁড়ো হাফ চা চামচ, ছোট এলাচ ৪টে, লবঙ্গ ৪ টে, দারচিনির ২ টো স্টিক,তেজপাতা, নুন, চিনি, সাদা তেল,ঘি।

প্রণালী: চাল ধুয়ে কাপড়ে মেলে শুকিয়ে নিতে হবে। তারপর ওই চালে আদাবাটা ,কাঁচালংকা বাটা, নুন, গরম মশলার গুঁড়ো, জাফরান আর অল্প ঘি মাখিয়ে তিরিশ মিনিট রেখে দিন।
এবার একটা ডেগচিতে ঘি আর সাদা তেল মিশিয়ে গরম করুন। কাজু কিসমিস ভেজে তুলে রাখুন। তেজপাতা, গরম মশলা ফোড়ন দেওয়ার পর মশলা মাখানো চাল ভালো করে ভেজে নিন। ভাজা কাজু কিসমিস দিয়ে দিন। যে বাটিতে চালের মাপ নিয়েছিলেন,সেই বাটির মাপে দু’বাটি গরম জল ঢেলে ডেগচির ঢাকনা এঁটে দিন। জল শুকিয়ে এলে চিনি দিয়ে হালকা হাতে ভাত নেড়ে তাওয়ার ওপর ডেগচি রেখে ঢিমে আঁচে পাঁচমিনিট দমে বসান।

আলুর দমউপকরণ: ছোট সাইজের চন্দ্রমুখী আলু ১০টা, আদা+ কাজুবাদাম+ টমেটো একসঙ্গে বাটা , কাজুবাদাম না থাকলে চিনে বাদাম দেওয়া যাবে। ফোড়নের জন্য জিরে,শুকনো লঙ্কা,তেজপাতা,হিং,
টকদই আধ কাপ,কাঁচালঙ্কা , হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো,জিরে গুঁড়ো, এলাচের গুঁড়ো,নুন,চিনি,সাদা তেল , কাঁচা লঙ্কা।

প্রণালী: নুন দিয়ে আলুগুলো সেদ্ধ করে নিতে হবে। একটু শক্ত রাখতে হবে। সেদ্ধ করে আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলুগুলো কাঁটাচামচ দিয়ে একটু ফুটো ফুটো করে নিতে হবে । কড়াইতে সাদা তেল গরম করে হিং,জিরে,তেজপাতা,শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিতে হবে। তারপর আদা কাজু টমেটো বাটা ফ্যাটানো টক দই,নুন ,বাকি গুঁড়ো মশলাগুলো দিয়ে কষে নিতে হবে। মশলা ভালো করে কষানো হলে আলুগুলো দিয়ে আর একটু নেড়ে ইসদুষ্ণ জল দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। বেশ থকথকে মত হয়ে এলে একটু চিনি,এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে হবে। নামানোর আগে দু ‘ চারটে কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিতে হবে। ইচ্ছে করলে ধনেপাতা কুচিও দিতে পারেন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাঙালি মেয়ের প্রেমপত্র, পুণ্যাহ আর সহজ তিনটে পদ

You might also like