Latest News

বাংলার হেঁশেল- চুনো মাছের দুই পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন কিনা জানি না! বহুকাল ধরেই রুই, কাতলা, মাগুর, পোলট্রির একইরকম স্বাদ ! কাদা কাদা। অথবা ছিবড়ে। অনেকক্ষণ ধরে দাঁতে পেষার পরেও মোলায়েম হয়ে মুখে মিলিয়ে যায় না। চেবানো সজনে ডাঁটার মতো মুখের একপাশে জড়ো হয়। মাছ খাওয়ার আহ্লাদটুকু মাখনের মতো মিলিয়ে যায় না ব’লেই অতীতের মাছ কেনা আর খাওয়ার স্মৃতিটুকুই আজকাল সম্বল হয়ে থাকে।
কাজ থেকে ফেরার পথে ইয়া বড় মাছ হাতে ঝুলিয়ে বাবার বাড়িতে ঢোকা, জালে কেজি তিনেকের কালবোস ধরা পড়লে সেই জ্যান্ত মাছ বাড়ি বয়ে দিয়ে যাওয়া জেলেপাড়ার স্বপন মন্ডলের মুখ, বর্ষায় ছেঁড়া মশারিতে করে চুনো মাছ ধরা… এগুলো এখন যেন স্বপ্নের মতো। স্থানীয় ছোটো ছোটো বাজারগুলোয় তখন দেশি মাছের রমরমা। মাছ বিক্রেতাদের গামলায় পুকুর এবং নদীর মাছের খলবলানি। ক্রেতাদের উৎসাহের সঙ্গে হন্যে চিংড়ি, গুঁতেল মাছ আর তেজালো কইয়ের তিড়িংবিড়িং নাচ। “এহ্ হে ধর… ধর… পালালো যে!” শঙ্করের আনা বিশাল শোল হাত পিছলে সাত হাত দূরে গুগলি বিক্রি করতে বসা বাগদিবৌয়ের কোলে। কী কাণ্ড! এখন মাছের বাজারে তেমন কোনও কাণ্ড হতে দেখি না। কেমিক্যালে চোবানো চকচকে মাছগুলো রক্তশূন্যতায় ভোগা রুগীর মতো নিস্তেজ। বাইরের রাজ্য থেকে আমদানি করা মাছের লাশের গলা কেটে ওপর থেকে রক্ত ছড়িয়ে টাটকা দেখানোর অক্ষম প্রচেষ্টা। ওদিকে, একটু আড়ালে একটা বড় গামলায় হলুদ জলে চুবিয়ে রং ধরানোর চেষ্টা চলছে পচা তপসে মাছে। বড় চারকোণা ধাতব পাত্রে মুরগির নাড়িভুঁড়ি খেয়ে গতর তৈরি করা রাক্ষুসে হাইব্রিড মাগুর চোখ লাল করে ক্রেতাদের যেন বলছে কাছে এলেই হুল ফোটাবো। এই তো ছিরি এখন মাছ বাজারের! আনন্দ নেই। নতুনত্ব নেই।তবে মাঝেমাঝে মৌরলা, ডিমভরা পুঁটি, বেলে, চাঁদা, গঁচি, চাপিলা, খোরশুলা মাছ এলে মৎস্যপ্রেমীরা উথলে ওঠেন। যাঁরা একটু বেশি উৎসাহী তারা আগেপিছে কিছু না ভেবে কিনে ফেলেন ৫০০ গ্রাম পাঁচমিশালি কুচো মাছ। বাড়িতে মুখঝামটা এবং দাঁত খিঁচুনি খেতে হবে জেনেও ছোটো মাছের ঝালচচ্চড়ি খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন না। চাঁদা মাছ কিনলে অল্প পাকা তেঁতুলও কিনে ফ্যালেন। বাড়িতে খোঁটা দেবে, তাও! কোনও কোনওদিন ছোটো মাছগুলো পুরুষদের বীরপুরুষ করে তোলে।
সব বাজারে ছোটো মাছ কেটে নেবার সুবিধে থাকে না বলে অনেকেই বীরাঙ্গনা বা বীরপুরুষ হতে পারেন না। তাছাড়া ছোটো মাছ কাটা বাছা ধোওয়া অনেকটা সময়সাপেক্ষ। আগেকার দিনে এইসব মাছ আনলে বাড়ির মহিলারা তেমন রাগারাগি বা হুলুস্থূল করতেন না। চাকরি করতেন না, আর তখন ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ না থাকার জন্য কাটা বাছা আর রান্নাবান্নার মধ্যেই তাঁরা সময় অতিবাহিত করতেন।তবে মাঝেমধ্যে ছোটো চুনোচানা মাছ খাওয়া ভালো। স্বাদের জন্য, শরীরের জন্যেও। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন বেশি বৃষ্টিতে নদী পুকুর ভেড়ি থেকে মাছ ভেসে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিছু মাছ ধানের জমির জমা জলে আশ্রয় নেয়। ডিম পাড়ে। ধানের ভুঁয়ে মাছের মেলা বসে তখন। ময়া, খোলসে, বুজুরি ট্যাংরা, উল্কো মাছেরা ধানের পাতা কুটুস কুটুস করে চিবোয়। ধানগাছের ডগায় বসে লাল ফড়িং এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে স্থির হয়ে যায়। একটা কাদাখোঁচা বকের ঠোঁট ফসকে পড়ে যায় তেলাপিয়ার বাচ্চা। তাই দেখে কলমিফুল হেসে ওঠে। চোখ বুজে এই মনোরম দৃশ্য কল্পনা করুন। আপনাদের কল্পনার জগতে গরম ভাতের সঙ্গে আমি ছোটো মাছের দুটো দারুণ পদ বেড়ে দিই ।

মৌরলার চচ্চড়ি
উপকরণ: ৩০০ গ্রাম মৌরলা মাছ, ২ টো পেঁয়াজ ঝিরি ঝিরি করে কাটা,কাঁচালংকা অনেক কটা, আধ চা চামচ আদা বাটা, ১ চা চামচ জিরে বাটা, হলুদ গুঁড়ো, লংকার গুঁড়ো, আধ চা চামচ কালোজিরে বাটা, পরিমাণমতো নুন ও সর্ষের তেল।প্রণালী: মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে নুন, হলুদ আর লংকাগুঁড়ো দিয়ে মেখে রাখতে হবে। এবার কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে কাটা পেঁয়াজ তেলে ছাড়তে হবে। দুটো চেরা কাঁচালংকা দিতে হবে। আদাবাটা, হলুদ গুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, নুন দিয়ে একটু নেড়েচেড়ে মাছগুলো কড়াইতে দিতে হবে। ছোটো মাছ না ভেজে রান্না করলে টেস্ট ভালো হয়, মাছের গুণাবলীও অনেকটা অক্ষুণ্ণ থাকে। মাছগুলো দেওয়ার পর কড়াই ঢেকে অল্প আঁচে রান্না হতে দিতে হবে। জল দেওয়ার প্রয়োজন হলে ১ কাপ গরম জল দিতে হবে। মাখোমাখো হয়ে এলে কালো জিরে বাটাটুকু অল্প জলে গুলে মাছে দিয়ে দিতে হবে। নামানোর আগে অনেকগুলো চেরা কাঁচা লঙ্কা ছড়িয়ে ঢাকনা এঁটে গ্যাস অফ করে দিতে হবে।

চাঁদা মাছের পেঁয়াজি
উপকরণ:  ২০০ গ্রাম চাঁদা মাছ, ২ টেবিল চামচ পেঁয়াজ বাটা, আদা রসুন বাটা ১ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কাবাটা ২ চা চামচ,ধনেপাতা বাটা ১ টেবিল চামচ,নুন,হলুদ, এক কাপ বেসন,আধ কাপ চালের গুঁড়ো,সর্ষের তেল।

প্রণালী: চাঁদা মাছ বেছে ধুয়ে ওতে সমস্ত বাটামশলা, নুন, হলুদ, বেসনগুঁড়ো, চালের গুঁড়ো দিয়ে টাইট করে মেখে চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা পেঁয়াজির মত গরম তেলে মুচমুচে করে ভেজে তুলতে হবে।চাঁদা মাছের টকও খুব উপাদেয়। তবে ভাত আর ঘন ডালের সঙ্গে চাঁদা মাছের পেঁয়াজির একটা আলাদাই মাহাত্ম্য।

You might also like